‘হাতগুলো কেটে, ফেটে, থেঁতলে কড়া পড়ে গেছে, পুড়ে গেছে, একসময় সব সয়ে গেছে’— বলছিল এলুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল তৈরির কারখানায় কাজ করা ১৩ বছর বয়সী আলমগীর হোসেন। দেখে মনে হবে, কেউ হয়ত ছোট্ট আলমগীরের শরীরে কালি লেপে দিয়েছে। ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত করতে হয় কাজ। নেই ওভারটাইম। দিনের পুরোটাই কর্মঘণ্টা। সাপ্তাহিক মজুরি ৭০০ টাকা। অর্থাত্ রোজ পড়ে ১০০ টাকা। আর কাজের সময় সর্বনিম্ন ১০ ঘণ্টা। মাঝে সকালের নাস্তার জন্যে ৩০ মিনিট, দুপুরের খাবারের জন্যে ১ ঘণ্টা বিরতি। তাতেই খুশি আলমগীর। কাজ করছে ৭ মাস ধরে। আগে বাবার সঙ্গে সবজি বিক্রির কাজ করত। লেখাপড়া করতে মন চাইলেও পরিবারের সবার কথা ভেবে কাজে আসা ছাড়া কোনো উপায় নেই তার। একই কারখানায় শ্রমিক—মাহবুব, রতন, জুয়েল, নেয়ামুলসহ আরও অনেকে। সকলেই হাঁড়ি-পাতিল, কড়াই, সসপ্যান তৈরির কাজ করে। এসব তৈরিতে কয়েক ধাপে কাজ করতে হয় তাদের। মেশিনের কাজে ঝুঁকি বেশি বলে জানায় তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুশ্রম কমলেও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কমছে না এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে তা একেবারেই কমছে না। এর প্রধান কারণ মনিটরিং এর অভাব। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইসলামিক রিলিফ ওয়ার্ল্ডওয়াইড বাংলাদেশের বেইজ লাইন সার্ভের রিপোর্ট অনুয়ায়ী—কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ৪৬ ভাগ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের সঙ্গে জড়িত। যাদের বেশিরভাগেরই বয়স ৮ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। তারা বলছেন, ওই এলাকায় ২৭ ধরনের ছোট-বড় মোট ৬০৪টি কারখানা রয়েছে। যেখানে শিশুরা কাজ করছে। এখানে শিশুদের কাজের চাহিদার একটাই কারণ ‘কম মজুরি’। একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের মজুরির অর্ধেক দিয়ে একজন শিশুশ্রমিককে কাজ করানো যায়। ফলে মালিকপক্ষ শিশুদের কাজে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী। আইনে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধের কথা বলা হলেও; মনিটরিং না থাকায়, ওই শিশুদের কাজ থেকে ফিরিয়ে আনা একটা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
চলতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম ও তেরেদেস হোমস নেদারল্যান্ডের যৌথ আয়োজনে কামরাঙ্গীরচর এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ওই এলাকায় বিভিন্ন ধরনের অন্তত ৬০৪টি কারখানা রয়েছে । আর প্রতিটি কারখানায় রয়েছে শিশুশ্রমিক। সংস্থাটি জানায়, ৮-১৩ বছর বয়স্ক শিশু শ্রমিকদের মজুরি সপ্তাহে গড়ে ৮০০ টাকা এবং ১৪-১৮ বছর বয়স্ক শিশুদের গড় মজুরি ১২০০ টাকা। মূলত মজুরি কম হওয়ায় কারখানা মালিকরা শিশুদেরকে শ্রমিক হিসেবে এই সকল ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করছে। কর্মরত অবস্থায় কোনো শিশু দুর্ঘটনার শিকার হলে ক্ষতিপূরণ পায় মাত্র ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। মূলত স্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যস্থতায় এই ক্ষতিপূরণের বিষয়টি মীমাংসা হয়ে থাকে। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী শিশুটি কোনো রকমের আইনি সহায়তা পায় না। ফলে মালিকরা কারখানার নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরিতে কোনোরূপ আগ্রহ দেখায় না।
জাতীয় শিশু শ্রম জরিপ-২০১৩’ এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কোনো না কোনো শ্রমে নিয়োজিত। বর্তমানে দেশের ১৮টি খাতে ১৭ লাখের বেশি শিশু শ্রমিক বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ কর্মে নিয়োজিত এবং ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু অতি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। এসব শিশু হোটেল-রেস্তোরাঁ, ট্যানারি, শিপব্রেকিং, পরিবহন, কৃষি, গৃহকর্ম, নির্মাণ, ইটভাঙা, লোহা কাটাসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত।
চাইল্ড প্রোটেকশন প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট এহসানুল হক বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম কমলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম মোটেই কমছে না। বরং এ খাতে দিন দিন শিশুরা শ্রমে যুক্ত হচ্ছে। আর কামরাঙ্গীর চর শেষোক্ত শ্রেণির অংশ। তার মতে, ৩৭টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের ক্ষেত্রে মনিটরিংয়ের অভাবে শিশুশ্রম কমছে না। সরকারের উপাত্ত অনুয়ায়ী মোট শিশুশ্রম কমেছে কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কমেনি।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, আমাদের দেশে আইন আছে, নীতিমালা আছে। কিন্তু সবাই মানি না। আবার অনেকে আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে জানিই না। স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটলে সবাই বিরোধিতা করি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশ থেকে একেবারে শতভাগ শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব না। আবার উচিতও হবে না। কেননা সকল শিশুশ্রমকে আপনি শিশুশ্রম বলতে পারেন না। একটা শিশু তার কাঠমিস্ত্রি বাবাকে যখন সহযোগিতা করছে তখন তাকে শিশুশ্রমিক বলতে পারেন না। কারণ ওই শিশুটির অনেক দক্ষতা সেখান থেকে উন্নতি ঘটছে।
ইত্তেফাক/নূহু
