নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রুখে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের শীর্ষ নেতারা বলেছেন, নির্বাচন বানচাল করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে। চক্রান্তকারীরা নির্বাচিত সরকার হটিয়ে ভুতের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ জন্য বিএনপি, জামায়াত ও ওয়ান ইলেভেনের কুশিলবরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আন্দোলনের নামে তারা ফের নাশকতার পরিকল্পনা করছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে কেন্দ্রীয় ১৪ দল আয়োজিত বিএনপির অব্যাহত মিথ্যাচার ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে এক বিশাল কর্মী সমাবেশে নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন। ব্যাপক জনসমাগম ঘটায় সমাবেশটি রীতিমতো জনসমুদ্রে রূপ নেয়। হল রুমের বাইরেও ছিল হাজার হাজার মানুষের ভিড়।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু নির্বাচনকে সামনে রেখে আন্দোলনের নামে আবার নাশকতা হতে পারে বলে দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘আন্দোলনের নামে রেললাইন তুলে ফেলার চেষ্টা করবে, পাহাড়া দিতে হবে যেন তারা তা করতে না পারে। সন্ত্রাসী কার্যকলাপ যারা করবে তাদেরকে ধরিয়ে দিতে হবে, প্রতিহত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমস্ত ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ দেশে গণতান্ত্রিক সরকার কায়েম হবে। তাই ১৪ দলের নেতাকর্মীদেরকে প্রতিজ্ঞা-শপথ নিয়ে আগামীতে প্রস্তুতি নিতে হবে।’
আমির হোসেন আমু বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তারা যদি প্রমাণ করতে পারতো যে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে সুষ্ঠু হয় না, তাহলে আজকে তাদের কথায় যুক্তি থাকতো। তিনি বলেন, কোনো মানুষ যদি নদীতে পড়ে যায় সে বাঁচার জন্য খড়কুটা যা পায় তা ধরে বাঁচতে চায়। খালেদা জিয়ার ২০ দল ডুবে যাচ্ছে, ওই ‘খড়কুটা’ যুক্তফ্রন্ট-গণফ্রন্ট ওমুক ফ্রন্ট ধরে ধরে আজকে তারা অনেক বড় জোট করতে চায়। কিন্তু কোনো জোটে কাজ হবে না। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব মানুষ দেখতে চায়। তিনি আবার জয়যুক্ত হয়ে ফিরে আসুন-এটাই তারা কামনা করছে।
সভাপতির বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ওরা চেয়েছিল আজকের এই সমাবেশ ভন্ডুল করার জন্য। কিন্তু আওয়ামী লীগ, ১৪ দলের কর্মীরা বাঘের বাচ্চা। যত বাধা দিবে আমরা তত বেশি অগ্রসর হবো। আজকে কর্মীসভা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, চক্রান্ত শুরু হয়ে গেছে। শেখ হাসিনা, জনগণ, গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। একজন বিদেশে বসে আর দুইজন দেশে বসে চক্রান্ত করছে। এখন ১৪ দলের কর্মীদের, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কর্মীদের ঘরে বসে থাকার সময় নয়। ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিএনপি-জামায়াতের উদ্দেশে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এটা ২০১৪ সাল নয়, ২০১৮ সাল। তোমাদের মরণকাল এ বছরই হবে। বিএনপি-জামায়াত লোক ভাড়া করছে। পরিত্যক্ত, পলায়নকারীদের ভাড়া করছে। যাদের নীতি নাই, ঠিকানা নাই। পলায়ন করতে অভ্যস্ত, ওই নেতাদের ভাড়া করে লাভ হবে না। জোটের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আপনারা সাবধান থাকবেন। শেখ হাসিনা ও আমরা যখন ডাক দিব তখন কেউ ঘরে বসে থাকবেন না, ঘর থেকে বেরিয়ে আসবেন। ২০১৪ সালে জ্বালাও-পোড়াও করেছে, এবার হবে না। আমাদের ঐক্য দরকার। অবৈধ সরকারকে ক্ষমতায় আনার চক্রান্ত যারা করছেন তাদের কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে। বিএনপি-জামায়াতকে কোনো ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
মোহাম্মদ নাসিম আরো বলেন, ‘ওরা (২০ দল) বলেছে অক্টোবর মাস থেকে মাঠে থাকবে। অক্টোবর মাস তোমাদের জীবনে আসবে না। আগামী ডিসেম্বর মাসে নির্বাচনের আগে আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠ গরম করবো। আমরা দেখিয়ে দেব।’ ১৪ দলের মুখপাত্র এ সময় কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে বলেন, আগামী ৯ অক্টোবর রাজশাহী, ১০ অক্টোবর নাটোর ও ১৩ অক্টোবর খুলনায় মহাসমাবেশ করা হবে। একই মাসের যেকোনও দিন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ঢাকায় মহাসমাবেশ করা হবে। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণা দেন তিনি।
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন, যুক্তফ্রণ্ট চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সমালোচনা করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচন বানচালের জন্য তারা আবার ষড়যন্ত্রের পথে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা বানচাল করার জন্য তারা আবার মাঠে নেমেছে। ইনশাল্লাহ এই নির্বাচন হবে, ৫ বছর আগে নির্বাচন ঠেকাইতে পারেনি, এবারও পারবে না, এই নির্বাচন হবেই।’ ড. কামাল হোসেনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কথা আমরা সবাই জানি। তিনি আবার মাঠে নেমেছেন, কখন নেমেছেন? যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ওনাকে দেখা যায়নি। এক-এগারোর সময় যখন স্বৈরাচার ছিল তখন তাকে দেখা যায়নি। আজকে তিনি এসেছেন গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেবেন। আপনি ইলেকশনের আগের দিন পলায়া যান, আপনারে খুইজ্জা পাওন যায় না, লোড় পাড়েন। আর আপনি আসছেন গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য?’
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সমালোচনা করে মতিয়া বলেন, ‘‘বি. চৌধুরী সাহেব কে? আমার কথা না, জিয়াউর রহমান সাহেব মারা যাওয়ার পরে আপনারা তখনকার কাগজ খুইল্যা দেইখেন কী হেডিং ছিল। ‘ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেট বাবার বুক ঝাঝড়া করে দিল, তুমি কোথায় লুকিয়ে ছিলে বদু কাকা?’-এটা হলো তারেক রহমানের বিলাপ। ভুলে যায় নাই বাংলার মানুষ।” তিনি আরো বলেন, ‘এই দুই পলায়নপর নেতা, আরেক পলাতক নেতা তারেক রহমান, টাকা পাচারের দায়ে শাস্তি হইছে-এই তিন নেতার ঐক্য হইছে। সেই ঐক্য দিয়া তারা না কী বাংলাদেশকে উদ্ধার করবে। নির্বাচন বানচাল করবে। গণতন্ত্রের নামে এই দেশে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করবে।’
জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে না, তাদের মুখে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি মানায় না। নির্বাচন পক্ষ হলো, নাকি নিরপেক্ষ হলো সেটা তাদের বলার বিষয় নয়। এ ধরনের কথা দেশ-বিদেশের মানুষ গ্রহণ করবে না। তিনি বলেন, নির্বাচনের বিকল্প অনেক কিছু দেখেছি। তবে তা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। তাই নির্বাচনের বিকল্প হলো নির্বাচন। পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় কিংবা পূর্বে সামরিক, আধাসামরিক সরকারের সময় গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা বলতে গেলে ছিল না। তিনি বলেন, সরকারের ব্যবহার ও কার্যকলাপ যদি গণমুখী হয়, তাহলে যেসব সরকার গণমুখী নয় তাদের পক্ষে তারা (জনগণ) কখনো থাকে না।
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘সেই সেনা শাসন এক-এগারোর আইন উপদেষ্টা, সাংবিধানিক পরামর্শদাতা, মাইনাস-টু থিওরির প্রচারক, সেই তথাকথিত সংস্কারবাদীরা, যারা দল থেকে বাদ পড়েছে, বহিস্কৃত হয়েছে আজকে তারা যুক্ত হয়েছেন গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে।’ মেনন বলেন, ‘যারা ৯ বছরে ৯ দিনও আন্দোলন করতে পারেনি, অনুমতি ছাড়া রাস্তায় নামতে পারে না, তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের, ১৪ দলের কোনো পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির প্রয়োজন নেই। নির্বাচনকে বানচাল ও প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যর্থ করার জন্য একের পর এক চক্রান্ত চলছে। ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ জাসদ সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, তারা নতুন চেহারায় জাতীয় ঐক্য করার ঘোষণা দিয়েছেন। তারা সমাজের সুবিধাভোগী। তারা সমবেত হয়েছে সাংবিধানিক ধারাকে নসাত্ করার জন্য। জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বলেন, আজকে যখন বাংলাদেশের মানুষ বেগম খালেদা জিয়াকে ফেলে দিয়েছে তখন কামাল-বি চৌধুরী-মান্না গংরা তাকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন। এই চক্রের হাত থেকে দেশের মানুষ ও দেশকে রক্ষা করতে হবে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা অধ্যাপক নিম চন্দ্র ভৌমিক বলেন, সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা করছে। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির (জেপি) সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত্ হোসেন, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বাসদের আহ্বায়ক রেজাউর রশীদ খান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার, জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচ সালাহউদ্দিন মাহমুদ, মফিজুল হক বেবু, এজাজ আহমেদ মুক্তা, নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী, ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন রেনু, জামিরুল হক বকুল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, এম সালাহউদ্দিন আহমেদ, সহ-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, আমিনুল ইসলাম তপন, অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সাইদুর রহমান বকুল প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ।
ইত্তেফাক/নূহু
