খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে সেমুতাং দক্ষিণ-১ গ্যাস ফিল্ডে ড্রিলিংয়ের (কূপ খনন) কাজ প্রায় শেষের পথে। খুব শিগগির এখানে শুরু হবে গ্যাস উত্তোলন। সেমুতাংয়ের নতুন এ কূপে কাঙ্ক্ষিত গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আজারবাইজানের যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি সোকার-একিউএস ইতালি ও ইন্দোনেশিয়া থেকে রিগসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এনে গত জুনের শেষার্ধে এখানে কূপ খননের কাজ শুরু করে।
খনন কাজে নিয়োজিত প্রকৌশলীরা জানান, ৩০০০ মিটার গভীর কূপ খননের টার্গেট তাদের। ইতিমধ্যে প্রায় ২০৩০ মিটার খনন কাজ শেষ হয়েছে। আর কয়েকদিনের মধ্যে অবশিষ্ট খনন কাজ সম্পন্ন হবে। একটি রিগ মেশিনের মাধ্যমে ৪০ জন বিদেশি প্রকৌশলীসহ প্রায় ১৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারি দিনরাত কাজ করছেন ফিল্ডে। ড্রিলিং কাজে নিয়োজিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিদেশি প্রকৌশলী জানান, এখানে গ্যাসের যে চাপ তাতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি গ্যাস পাওয়া যাবে।
জানা যায়, মানিকছড়ির কালাপানি ইউনিয়নের সাপমারা এলাকায় ২০১৬ সালে নতুন গ্যাস ক্ষেত্রটি আবিষ্কৃত হয়। ষাটের দশকে মানিকছড়ির যোগ্যাছলায় আবিষ্কৃত সেমুতাং গ্যাস ফিল্ড হতে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে সাপমারা এলাকায় সেমুতাং দক্ষিণ-১ গ্যাস ফিল্ডের অবস্থান। অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্প-২ এর আওতায় আজারবাইজানের যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি সোকার-একিউএস এর সঙ্গে গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশনের (বাপেক্স) চুক্তি হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী সেমুতাং দক্ষিণ-১ ও অপর দুটি গ্যাস কূপ খনন করার কথা। এরপর থেকেই সোকারের বিদেশি প্রকৌশলীরা ড্রিলিংয়ের প্রাক প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন করে এবং গত ২৬ জুন কূপ খননের কাজ শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেমুতাংসহ অপর দুটি ফিল্ডে ড্রিলিং কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
সেমুতাং দক্ষিণ-১ গ্যাস ফিল্ডের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মোঃ জহিরুল ইসলাম বলেন, কিছুদিনের মধ্যে ড্রিলিংয়ের কাজ শেষ হবে। বর্তমানে অয়েল লাইন লগিং, কেসিং ইত্যাদির কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলে পুনরায় ড্রিলিংয়ের কাজ শুরু করা হবে। ড্রিলিং শেষে অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করার পরই গ্যাস উত্তোলন শুরু করা হবে। তিনি বলেন, আগামী নভেম্বর মাসে গ্যাস উত্তোলন শুরু করার আশা আছে। প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে পুরাতন সেমুতাং ফিল্ডের প্রসেসিং প্ল্যান্টের সঙ্গে নতুন কূপের পাইপলাইন সংযুক্ত করে উত্তোলিত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। তিনি বলেন, যাতায়াতের রাস্তাটি খারাপ হওয়ায় এবং বৃষ্টির কারণে ইন্দোনেশিয়া ও ইতালি থেকে আনা রিগসহ প্রয়োজনীয় ভারী মেশিনপত্র চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গ্যাস ফিল্ডে আনতে অনেক সময় লেগে যায়। ফলে ড্রিলিংয়ের কাজ শুরু করতেও কিছুটা বিলম্ব হয়। গ্যাসের মজুদ সম্পর্কে তিনি বলেন, ড্রিলিং শেষ হওয়ার পরই এটা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। প্রকল্প পরিচালক আরো বলেন, সেনাবাহিনী গ্যাস ফিল্ডের নিরাপত্তা দিচ্ছে। এছাড়া আনসার ও পুলিশ সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত আছে। নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো ধরনের সমস্যা না থাকায় নির্বিঘ্নে কাজ করছেন বিদেশি প্রকৌশলীসহ সবাই। প্রায় পাঁচ একর জায়গা নিয়ে এ গ্যাস ক্ষেত্রটির চারিদিকে শক্ত সীমানা বেড়া রয়েছে।
ষাটের দশকে আবিষ্কৃত মানিকছড়ির যোগ্যাছলার সেমুতাং গ্যাস ফিল্ডে দুটি কূপের মধ্যে বর্তমানে একটি কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন অব্যাহত আছে। ১৯৬৭ সালে বৃটিশ কোম্পানি শেল এ গ্যাস ফিল্ডে চারটি কূপ খনন করার পর গ্যাস উত্তোলনের আগেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আশির দশকে পুনরায় ড্রিলিংয়ের কাজ শুরু করা হলেও চারজন বিদেশি প্রকৌশলীকে অপহরণের ঘটনায় শেল সবকিছু গুটিয়ে চলে যায়। জানা যায়, ১৯৯৭ সালে কেয়ার্ন এনার্জি নামে আরেকটি বিদেশি কোম্পানি ৫ নম্বর কূপ খনন করার পর গ্যাস উত্তোলন না করেই কূপটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে চলে যায়। পরে বাপেক্স ২০১০ সালে পরিত্যক্ত ঘোষিত ৫ নম্বর কূপটিতে ২৪৭৫ মিটার গভীরে পুনর্খনন করে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সফলতার সঙ্গে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে। শুরুতে প্রায় ১২ মিলিয়ন ঘন ফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয় এ কূপ থেকে। বর্তমানে এ কূপ থেকেই গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে ঐ গ্যাস ফিল্ডে গ্যাজপ্রম নামে রাশিয়ার একটি কোম্পানি ৬ নম্বর কূপ খননের পর ২০১৪ সালের এপ্রিলে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে। সূত্র জানায়, অতিরিক্ত পানি ওঠার কারণে ২০১৫ সালের দিকে ৬ নম্বর কূপটি থেকে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ করে দেয়া হয়। সেমুতাং থেকে উত্তোলিত গ্যাস রিং লাইনের মাধ্যমে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রামে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
ইত্তেফাক/আরকেজি
