মধ্য আশ্বিনে সিলেটে এখনো বেশ গরম অনুভূত হয়। তবে উত্তরের জনপদে সন্ধ্যার আকাশে কিছুটা কুয়াশা দেখা দেয়। সেই সঙ্গে কিছুটা শীতল হাওয়ায় রাত নামে। যখন ভোর হয় তখন পাহাড়ি পাদদেশের মাটি বা দূর্বা ঘাস হয়ে উঠে সিক্ত। বোধ হয় শীতের আগমনী বার্তা।
সিলেট অঞ্চলে বরাবরের শীত মৌসুম শুরুর আগেই খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশের হাওর বিলে নামতে থাকে নানা প্রজাতির দেশি পাখি। আর শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যোগ হয় অতিথি পাখি। তখন যেন পাখির মেলা বসে।
বর্তমানে সিলেটের জৈন্তা থেকে সুনামগঞ্জের টেকের ঘাট পর্যন্ত পাহাড় ঘেঁষা জনপদের নীল আকাশে সাদা বকের উড়াউড়ি সে এক নয়ন ভরা দৃশ্য। উঁচু গাছের মগ ডালে সাদা সাদা বক সেই সঙ্গে রয়েছে দেশীয় নানা জাতের পাখির কিচির মিচির।
আর শীত বাড়লে ঘন কুয়াশায় ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখির কলরবে হাওর এলাকার চিত্র অন্যরকম হয়ে উঠে। এই দিনগুলির অপেক্ষায় সারা বছর মুখিয়ে থাকেন পাখি প্রেমিকরা। কিন্তু এক শ্রেণীর পাখি শিকারিরা এখনই বেরিয়ে পড়েছে পাখি শিকারে। তারা নানা জাতের পাখি ধরে বাজারে বিক্রি করছে।
শিকারিরা মিহি জাল ফেলে, গাছে আঠা লাগিয়ে অথবা বিষ টোপ দিয়ে পাখি ধরে। সিলেট নগরীসহ বিভিন্ন বাজারে, মহাসড়কের পাশে এরা পাখি বিক্রি করে থাকে। পাখি শিকার বেআইনি। তারপরও থেমে নেই শিকারিরা।
IMG0
পাখিগুলোকে বেঁধে রাখা হয়েছে। ছবি ইত্তেফাক
‘পাখি ধরা যদিও আইনে নিষেধ। প্রশাসনও অনেক সময় আইনের কঠোরতা দেখায় না। ফলে প্রতি বছর অতিথি পাখি ধরা পরে, এতে পাখি কমে যাচ্ছে এই জনপদে, ’ মন্তব্য করে বেসরকারি সংগঠন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা ইত্তেফাককে বলেন, এ বিষয়ে সবাইতে সচেতন হতে হবে।’
সিলেটের জৈন্তাপুরের পান-সুপারি, স্বচ্ছ পানি, চা-বাগান, সারী নদীর সৌন্দর্য্য, তেল-গ্যাস, শ্রীপুর পাথর কোয়ারি, পিকনিক সেন্টার, গবেষণা কেন্দ্রগুলো পর্যটকদের মুগ্ধ করে।এখানে রয়েছে প্রাচীন রাজপরিবারের দর্শনীয় স্থান, হাওর ও বিল। এ উপজেলার ঐতিহ্যের পরিচিতি রয়েছে বিশ্বে। এখানের হাওর বিলে ভাদ্র মাস থেকে শীত মওসুমে পাখির আগমন শুরু হয়। শীত শুরুর আগেই জৈন্তাপুর গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাটের বিভিন্ন হাওর এলাকায় ফাঁদ পেতে মানুষের মধ্যে বন্য প্রাণী ও অতিথি পাখি শিকার উৎসব শুরু হয়। শিকারিরা পাখি শিকার করে বাজারে এনে চড়া দামে বিক্রি করে থাকে।
জৈন্তাপুর উপজেলা দরবস্ত, হরিপুর, চিকনাগুল, চতুল, গোয়াইনঘাট জেলার বিভিন্ন বাজারে অতিথি পাখিদের ধরে বিক্রি করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জনের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, প্রতিনিয়তই বিভিন্নভাবে তারা ফাঁদ পেতে, কিংবা ছোট মাছের মধ্যে পটাশ মিশিয়ে ঝোপ-জঙ্গলে রেখে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি শিকার করে।
এলাকাবাসী জানান, শহর থেকে শখের নেশায় পাখি শিকার করতে আসে অনেকেই। জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার বিলগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখিসহ আঞ্চলিক পাখি পাওয়া যায়।
জৈন্তাপুরের ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে জৈন্তাপুর উপজেলার দরবস্ত, হরিপুর ও জৈন্তাপুর ইউনিয়নে রয়েছে বেশ কয়েকটি হাওর। এগুলোর মধ্যে কেন্দ্রী হাওর, ডিবির হাওর, বেদু হাওর, বড় হাওর, বুজি হাওর, ডেঙ্গার হাওর, চাতলারপাড় হাওর, গোয়ালজুরি, পুটিজুরি, বড়জুরি, ফাবিজুরি, গাছজুরি হাওর উল্লেখযোগ্য। শীত শুরুর আগে থেকে এই হাওরগুলোতে আগমন ঘটে পাতিহাঁস, বালিহাঁস, ডাউক পাখি, অখা, সাদাবক ও কানাবকের।
হরিপুর, চিকনাগুল ও দরবস্তের বাসিন্দারা বলেন- আমাদের এলাকায় বিভিন্ন উৎসবে, বিয়ে সাদিতে, এমনকি ছোট খাটো অনুষ্ঠানে পাখি না খাওয়ালে যেন উৎসবের আনন্দের ঘাটতি থেকে যায়। তাই এ অঞ্চলে পাখির চাহিদা একটু বেশি। এসব বাজারে পাখির চাহিদা থাকায় শিকারিরা পাখিগুলো বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতে এবং চড়া দামে বিক্রির জন্য কিছু অসাধু ব্যবসায়ী শিকারিদের কাছ থেকে অল্প দামে পাখি সংগ্রহ করে এনে বাজারে বিক্রি করে।
এদিকে পরিবেশ আন্দোলনকারীরা পাখি শিকার বন্ধে এলাকার তরুণ ও যুবসমাজকে পাখি শিকার বন্ধ করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলার আহ্বান জানান।
IMG1
খাঁচায় করে নিয়ে আসা হয় পাখিগুলোকে। ছবি ইত্তেফাক
ইত্তেফাক/জেডএইচ
