রাজধানীর গণপরিবহনের অবস্থা শোচনীয়

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ০২:১৯
ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া কোন যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া উচিত নয়। পাশাপাশি সকল মানদণ্ড পূরণের পরই একজন চালককে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের সুপারিশ করেছে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে গণপরিবহনগুলোর অবস্থা শোচনীয়। এটা শুধু ব্যক্তি মালিকানাধীনই নয় সরকারি মালিকানাধীন বিআরটিসি বাসও এর আওতায় পড়ে। বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ আগামী ১৪ নভেম্বর এই প্রতিবেদনসহ এ সংক্রান্ত মামলার রুলের উপর শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন।
 
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজিব হাসানের কোন দায় ছিল না। ওই দুর্ঘটনার জন্য প্রাথমিকভাবে স্বজন পরিবহনের চালকই দায়ী। তার বেপরোয়া যান চালনার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটে। হালকা যান চালানোর লাইসেন্স থাকার পরও ওই বাসের জন্য এ ধরনের চালককে নিয়োগের ফলে রাজিবের মৃত্যু ও দুর্ঘটনার মূল দায় মূলত স্বজন পরিবহনেরই। পাশাপাশি বিআরটিসির বাস যিনি চালাচ্ছিলেন সেই চালকেরও এ ধরনের ডাবল ডেকার বাস চালানোর লাইসেন্স ছিল না। ফলে এ ধরনের বাস চালানোর অনুমোদন দেওয়ার দায় কিছুটা বিআরটিসিরও। এছাড়া সরকারি এ পরিবহন সংস্থাটির বিদ্যমান লিজভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থাও অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
 
প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনার পর গুরুতর আহত রাজিবকে শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করে রাজিবের তাত্ক্ষণিক চিকিত্সা সেবা প্রদানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সময়ক্ষেপণ করেছে। এর দায় ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘গোল্ডেন আওয়ার রুলস’ অনুযায়ী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে সংকটাপন্ন রোগীর অস্ত্রোপচার করতে হয়। কারণ সংকটাপন্ন রোগীর জীবন-মরণ এই এক ঘণ্টার উপর অনেকটা নির্ভর করে।
 
সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার বিজ্ঞানসম্মত কোন গবেষণা হয় না বললেই চলে। সীমিত যোগান নিয়ে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) বিজ্ঞানসম্মতভাবে সড়ক দুর্ঘটনার গবেষণা, বিশ্লেষণ, তদন্তের কাজগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করে যাচ্ছে। এ ধরনের কাজে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিত্। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা তদন্তে পুলিশ, বিআরটিএ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, এআরআই, নিরাপদ সড়ক চাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি টেকনিক্যাল টিম থাকা দরকার। এই টিমের জন্য পর্যাপ্ত তহবিলের যোগান দিতে হবে। কোনো রকম বিলম্ব ছাড়া দুর্ঘটনাগ্রস্ত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিত্সা সেবা প্রদানের জন্য হাইকোর্টের নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলা দরকার।
 
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে চালক নিয়োগ করে গণপরিবহন চালানো সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এ কারণে দৈনিক বা ট্রিপ ভিত্তিতে চালক নিয়োগ দ্রুত নিষিদ্ধ করে মাসিক বেতনের ভিত্তিতে কোম্পানির অধীনে চালক নিয়োগ করতে হবে। অনুমোদিত চলাচলকারী গণপরিবহনগুলোকে একটি কোম্পানির অধীনে এনে ফ্রাঞ্চাইজি সিস্টেমে রুট পারমিট দেওয়া।
 
প্রসঙ্গত গত ৩ এপ্রিল বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের রেষারেষিতে তিতুমির কলেজের শিক্ষার্থী রাজিব হাসানের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান, সিভিল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান ও নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে দেন। কমিটি রবিবার হাইকোর্টে এই প্রতিবেদন দাখিল করে।
 
 
ইত্তেফাক/নূহু