বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আসন্ন নির্বাচনের মাঠ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে বলে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী অভিযোগ করেছেন। দূর থেকে তারা মোবাইল ফোনে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের মাঠে নামার নির্দেশনা দিচ্ছে।
রাজধানীতে দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে আনাগোনা বেড়ে গেছে। রাজধানীর বাড্ডা, খিলগাঁও, শাজাহানপুর, মতিঝিল, গুলশান, সবুজবাগ, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মহাখালী ও পল্লবী এলাকায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের দাপট বেড়ে গেছে। দুই একটি স্থানে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পোস্টারও টানানো হয়েছে। এলাকাবাসী ধারণা করছে, বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পরিচিতি বাড়ানো অথবা তাদের অবস্থান জানানোর জন্য নিজেদের ক্যাডার বাহিনী দিয়ে এসব পোস্টার টানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসার পর, অনেক স্থানের পোস্টার ছিঁড়েও ফেলা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনে কেউ যাতে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে না পারে বা অবৈধ বল প্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন করতে না পারে, সেজন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কাজ শুরু করেছে। যারা পেশাদার অস্ত্রবাজ বা সন্ত্রাসী তাদের আমরা ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছি। আরও যারা আছে, তাদের গ্রেফতার করার জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
রাজধানীর শাজাহানপুর, খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মতিঝিল এলাকার বিভিন্ন দেয়ালে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ল্যাংড়া খালেদের ছবিযুক্ত পোস্টার টানানো হয়েছে। ২০০২ সালে মালিবাগে সানরাইজ হোটেলে ডিবি পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান হত্যা করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে পোস্টারে। এ ছাড়া কাউসার হত্যা, পলাশ হত্যা, মগবাজারে রানা হত্যা, তমাল হত্যা ও খিলগাঁওয়ে বাবার সামনে ছেলেকে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে। সিংগাপুরের মেরিনা বে হোটেলের সুইমিং পুলে জিসান ও ল্যাংড়া খালেদের গোসল করা ছবি পোস্টারে দেওয়া হয়েছে।
অলিগলিতে পোস্টার টানানোর পর বিষয়টি মতিঝিল ও পল্টন থানা পুলিশের নজরে আসে। পুলিশ বেশ কয়েকটি স্থানের দেয়াল থেকে পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে।
একইভাবে বাড্ডা এলাকায় স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের মাঠে আনাগোনা বেড়ে গেছে। এক যুগের বেশি সময় ধরে আমেরিকায় অবস্থানকারী মেহেদী গুলশান, মহাখালী, বাড্ডা ও ভাটারা এলাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। গত ১০ বছরে মেহেদী গ্রুপের হাতে এ এলাকায় ১৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। মেহেদী গ্রুপের সঙ্গে মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী ডালিম-রবিন গ্রুপের সখ্য রয়েছে। এই ডালিম-রবিন গ্রুপের সঙ্গে বনানী ও মহাখালী এলাকার আত্মগোপনকারী শীর্ষ সন্ত্রাসী সুন্দরী সোহেল গ্রুপের ক্যাডার বাহিনীর আনাগোনা রয়েছে। বাড্ডা থানা পুলিশের কাছে মেহেদী ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকার এক নম্বর সন্ত্রাসী। বাড্ডা থানায় মেহেদী হাসানের নামে ফাইলে তার সহযোগীদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর বাড্ডার আরিফ, গোপীপাড়ার রমজান ও সাগর, পোস্ট অফিস গলির পুলক, সবজি গলির মান্নান, ছাত্রলীগের ইনসান ও যুবলীগের মহারাজ।
মোহাম্মদপুর এলাকা কারাবন্দী শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল নিয়ন্ত্রণ করছে। এ এলাকার একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেয়ার পরই পিচ্চি হেলালের ক্যাডার বাহিনীর আনাগোনা বেড়ে গেছে। এ ব্যাপারে এলাকাবাসী প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না।
মিরপুর এলাকায় শাহাদত বাহিনী দীর্ঘদিন পর আবারও নড়েচড়ে বসেছে। দুবাই থেকে শাহাদত মিরপুর এলাকায় তার ক্যাডার বাহিনী পরিচালনা করছে। পল্লবী ও কাফরুল এলাকায় কারাবন্দি কিলার আব্বাস ও ভারতে আত্মগোপনকারী সন্ত্রাসী মোক্তার তাদের চিহ্নিত সন্ত্রাসী বাহিনীকে মাঠে নামিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের কথা বলে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন বাড়ির মালিকের কাছে ইন্টারনেট ফোনে কল করে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পল্লবী থানায় ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে মৌখিক অভিযোগও দিয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, সম্ভাব্য প্রার্থীদের পক্ষে ইতোমধ্যেই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীরা কে কোথায় আছে খোঁজ নেওয়া শুরু হয়েছে। অনেকে জেলে থাকা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। তবে পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে অনেকগুলো উঠতি সন্ত্রাসী গ্রুপ। এরাই বিদেশে আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে এলাকায় ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। এসব উঠতি মাস্তান বাহিনীর একটি তালিকাও করা হচ্ছে।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, আত্মগোপন করা বা পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও মোবাইল ফোনে হুমকি দেয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে এরকম বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ইত্তেফাক/আরকেজি
