মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ইতালির নাগরিক ফাদার মারিনো রিগনের মরদেহ আজ রবিবার দেশে আসছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অসুস্থ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সেবা প্রদানের পাশাপশি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য ফাদার রিগনের অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী মৃত্যুর এক বছর পর সরকারি ভাবে তাঁর মরদেহ ইতালি থেকে দেশের আনার পর দুপুরে বাগেরহাটের মোংলার শেলাবুনিয়ায় গার্ড অব অনার প্রদানের পর সেন্ট পল্স গীর্জার পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সূত্র জানায়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌছানোর পর আজ সকাল সাড়ে ৮টায় হেলিকপ্টার যোগে ফাদার রিগনের মরদেহ বাগেরহাটের মোংলায় পাঠানো হবে। সকাল সাড়ে ৯টায় তা আনা হবে উপজেলা পরিষদের মাঠে। সেখানে উপজেলা প্রাসনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধুকে সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুই ঘন্টা পর মরদেহ নেয়া হবে তার প্রতিষ্ঠিত সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয় এবং সেন্ট পল্স হাসপাতালে। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০৯ সালে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে Friends of Liberation War Honour পদকসহ বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়।
ইতালির নাগরিক ফাদার রিগন ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সেদেশের ভিচেঞ্চায় জন্মগ্রহন করেন। মাত্র ২৮ বছর বয়সে খৃষ্ট্রধর্ম প্রচারে জন্য ১৯৫৩ সালের ৭ জানুয়ারী তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় আসেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর গির্জায় ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাসহ অসুস্থ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সেবা প্রদানের পাশাপশি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেশ স্বাধীনের পর তিনি মোংলার শেলাবুনিয়ায় স্থায়ী আবাস গড়ে তোলেন। মোংলায় থাকা অবস্থায় হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলাচলের শক্তি হারিয়ে ফেলেন। এরপর ২০১৪ সালে তার ভাই মোংলায় এসে তাঁকে ইতালিতে নিয়ে যান। ইতালিতে মৃত্যু হলে তার লাশ মোংলার সেন্ট পল্স গীর্জার পাশে সমাহিত করতে হবে এই শর্তে তিঁনি ভাইয়ের সাথে যেতে রাজী হন। গত বছরের ২০ অক্টোবর স্বদেশে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
ফাদার রিগন দীর্ঘ সময়ে মোংলায় অবস্থানকালে ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেন রবীন্দ নাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলিসহ ৪০টি কাব্যগ্রন্থ, লালন সাঁইয়ের তিনশত পঞ্চাশটি গান, জসীম উদ্দীনের নক্সীকাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট ছাড়াও এদেশের খ্যাতিমান কবিদের অসংখ্য কবিতা। অন্যদিকে ফাদার রিগন বাগেরহাট জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয়, সেন্ট পল্স হাসপাতালসহ প্রতিষ্ঠা করেন ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন সেন্ট পল্স সেলাই শিক্ষা কেন্দ , যেখান থেকে মেয়েদেও সেলাই করা নক্সীকাঁথা রপ্তানি করা হতো বিদেশে।
মোংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, সেন্ট পল্স ক্যাথলিক চার্চে প্রবেশের প্রধান ফটকের বাম পাশে ফাদার নিজ হাতে পরম যত্নে লাগিয়ে ছিলেন ‘সোনা ঝুড়ি’ ফুল গাছ। একলা কথা বলতেন এ গাছের সাথে। আর এ গাছের নিচে যেন তাকে সমাহিত করা হয়, জীবদ্দশায় সেই ইচ্ছা পোষণ করে ছিলেন, যদিও তাকে সমাহিত করা হচ্ছে সেন্ট পল্স গীর্জার পাশে। এদিকে, রিগনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে গতকাল শনিবার। দুপুরে মোংলা সরকারী কলেজে তার মৃত্যুবার্ষিকী ও স্মরণ সভার আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। মোংলা সরকারি কলেজ, সেন্ট পলস ধর্মপল্লী, ফাদার রিগন শিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, সেন্ট পলস উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান পৃথকভাবে নানা কর্মসুচি পালন করেছে।
ইত্তেফাক/আরকেজি
