মনোমুগ্ধকর নৈর্সগিক শোভায়

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ২২:২৬
পাহাড়-নদী-আকাশ-বৃক্ষরাজি-লতাগুল্ম-ফানজাইয়ের মনোমুগ্ধকর নৈর্সগিক শোভা ছুঁয়ে যায় মন-প্রাণ। বর্ষা মৌসুমে খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর ঘোলা জলই শুষ্ক মৌসুমে হয়ে ওঠে স্বচ্ছ। তলদেশের বালিতে সৌন্দর্যের সাতকাহন আঁকে সেই জল। এরকম বিচিত্র ও তাক লাগানো সৌন্দর্য গারো পাহাড়ের পাদদেশের পরতে পরতে।
 
ফুলপুর থেকে আধ ঘণ্টার বাসযাত্রা ছিল খানাখন্দে ভরা প্রায় অচল সড়কপথে। ঢাকার মহাখালি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে চার ঘণ্টার দূরত্ব, আর বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহ থেকে ঘণ্টা দেড়েকের। সেখান থেকে অটোতে পৌঁছাই উত্তর বাজার মোড়ে। উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ও ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের পাদদেশের বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা গোবরাকুড়া, কড়ইতলী ও পানিহাতায় দিনব্যাপী বেড়ানো। পাহাড়ে কোনো হোটেল-মোটেল নেই। রাতে আছে বুনো হাতিসহ নানা জীবজন্তুর ভয়, তাই সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হবে। উত্তর বাজার থেকে ভাড়ায় চালিত বাইকে রওনা হলাম। দৃষ্টিসীমায় ভেসে আসছে নজরকাড়া আকাশ-পাহাড়ের সৌন্দর্যের মিতালী। দেখতে দেখতে পনেরো মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাই সীমান্তে। যার এ-প্রান্তে বাংলাদেশের গোবরাকুড়া আর ও-প্রান্তে ভারতের মেঘালয়ের গাছুয়াপাড়া। মাঝখানে নোম্যান্সল্যান্ড এরিয়া। সেখানে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের স্থলবন্দর। চারদিকে আমদানিকৃত কয়লা-পাথর স্তূপ স্তূপ করে রাখা। তবু যেদিকে তাকাই, চোখে এসে নয়নাভিরাম গারো পাহাড় ধরা দেয়।
 
যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেটি বাংলাদেশ-ভারত সংযোগ সড়ক। সড়কের দুপাশে শরতের চিহ্ন হয়ে ফুটে আছে কাশফুল। দূরে আকাশ এসে মিশেছে পাহাড়ে। শুভ্র মেঘমালা সেই পাহাড়ের ছাদ। তার নিচে ভরদুপুরে কুয়াশার আচ্ছাদন।
 
নিস্তব্ধ দুপুর গড়িয়েছে। পাহাড়ি রাস্তা ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে বাইক পশ্চিম দিকে। এবার যাচ্ছি কড়ইতলী। শাপলা বাজারে পৌঁছাতেই পাহাড়ি ঝরনার হাতছানি। টি-টার্নে ঝরনা পিছনে ফেলে পৌঁছাই গন্তব্যে। এখানেও রয়েছে গোবরাকুড়ার মতো স্থলবন্দর। খুব কাছ থেকে গারো পাহাড়ের প্রকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। এখানে প্রকৃতির সাথে বাড়তি যোগ হয়েছে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে বিনোদন পার্ক।
 
আঁকাবাঁকা পাহাড়ি মেঠোপথে বাইকে এগিয়ে চলছি পশ্চিমকড়ইতলীর কোচপাড়ায়, মালটা ও আজওয়া খেজুর বাগানের দর্শনার্থী হয়ে। মনভোলানো প্রকৃতি দেখতে দেখতে দশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাই। ততক্ষণে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ফলচাষি মাজহারুল ইসলাম বৃষ্টির সময় আমাদের তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। জানালেন পাহাড়ি জনপদে এই মেঘ; এই বৃষ্টি। তবে বৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। তিনি বাড়িতে পাহাড়ি খাঁটি মধু দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। এখান থেকে বিদায় নিয়ে হালুয়াঘাট উপজেলার সীমানা অতিক্রম করে রংগমপাড়ায় নালিতাবাড়ী উপজেলায় গেলাম। ভারতীয় বুনো হাতির উপদ্রবপ্রবণ এলাকা। তাই বন বিভাগ রংগমপাড়া থেকে মায়াগাসি পর্যন্ত হাতি তাড়ানোর জন্য দুই কিলোমিটার এলাকায় বৈদ্যুতিক বেড়া নির্মাণ করেছে। ভারতীয় বুনো হাতির তাণ্ডবে সীমান্ত এলাকার মানুষ তটস্থ থাকে। দল বেঁধে হাতি এসে ফসল ও ঘর-বাড়ি নষ্ট করে। হাতি চলাচলের পথ ধরেই এগিয়ে চলল বাইক। কিন্তু মাটির রাস্তা বৃষ্টির পানিতে ভিজে পিচ্ছিল। নানা স্থানে গর্ত। হালুয়াঘাট অংশের রাস্তায় এই বেহাল অবস্থা বেশি মনে হলো। তাই পৌঁছাতে একটু দেরিই হয়ে গেল। এখানে এমন নিপুণভাবে সাজানো প্রকৃতি যে চোখ ফেরানো মুশকিল।
 
এরপর গারো পাহাড়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চললাম প্রকৃতির জংশন পানিহাতায়। দলিলে নামটি পানিহাটা হলেও প্রচলিত নাম পানিহাতা। পাহাড়, নদী, অরণ্যের মনোমুগ্ধকর নৈর্সগিক শোভায় ঋদ্ধ এ এলাকাটি। বেলায় বেলায় যার রূপ পাল্টে যায়। পানিহাতায় পাহাড়ে রয়েছে রয়েছে চার্চ অব বাংলাদেশ সাধু আন্দ্রিয়ের মিশন ও শান্তিধাম। চার্চে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও রয়েছে।
 
কী দেখা যায় পানিহাতায়? এক কথায় বলি ‘প্রকৃতি’। প্রকৃতি যেন তার সৌন্দর্যের ভাণ্ডার উপুড় করে দিয়েছে এখানে। সবুজ অরণ্য, পাহাড়, নদী, ঝরনা মিলে এ এক অন্য জগত্। সন্ধ্যা নামার আগেই এখানে নেমে আসে সন্ধ্যার নীরবতা।
 
লেখক :সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক
 
ইত্তেফাক/নূহু