হতভাগ্য প্রবীণ নারীর ঠাঁই এখন ট্রাক টার্মিনালে

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৮, ২০:৫৮
নাম জিজ্ঞেস করতেই হাত দিয়ে ইশারা করে খেতে চাইলেন ৭৫ বছর বয়সী রোগাক্রান্ত প্রবীণ এই নারী। রাতে কিছু খেয়েছে কিনা জানি না। তবে হাতের ইশারা দিয়ে বোঝাতে চান বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত কিছুই খাওয়া হয়নি তার। প্রবীণ এই নারী শারীরিক অসুস্থতার জন্য ভালোভাবে কথা বলতে পারেন না। হাতের ইশারায় সব কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেন তিনি। নাম পরিচয় ভালোভাবে বলতে পারেন না এমনি এক হতভাগ্য প্রবীণ নারীর অবশেষে ঠাঁই হল মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার আরিচা ঘাটের পুরাতন ট্রাক টার্মিনালের পরিত্যাক্ত ঘরের বারান্দায়।
 
ছানি পড়ায় চোখে কম দেখেন তিনি। মুখে ঘা! জ্বরসহ শরীরে নানা সমস্যা নিয়ে টার্মিনালে ঘরের বারান্দায় সাতদিন ধরে শুয়ে আছেন প্রবীণ এই নারী। কোথায় তার বাড়ি-ঘর? কোথায় তার ছেলে-মেয়ে? কোথায় তার স্বজন? কে রাখে তার খবর? মানুষের দেওয়া মশারির মধ্যে শুয়ে থাকা এই নারীর সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি কথা বলতে চান, কিন্ত  দুর্বলতার কারণে তার মুখ দিয়ে বের হওয়া শব্দ শোনা যায় না।
 
স্থানীয়রা জানায়, এক সপ্তাহ আগে কে বা কারা আরিচা পুরাতন ট্রাক টার্মিনালের দক্ষিণ পাশের ঘরের বারান্দায় ফেলে রেখে যায় এই প্রবীণকে। পায়খানা-প্রশ্রাব করে তার মধ্যেই শুয়ে থাকতেন তিনি। তিনি হাঁটতে পারেন না। কেউ না কেউ তাকে এখানে রেখে গেছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
 
এমতাবস্থায় নিহালপুর গ্রামের জবেদা বেগম নামের অপর এক নারীর মায়া হলে তিনি ওই প্রবীণকে রিক্সায় করে টার্মিনালের উত্তর পাশের ঘরের বারান্দায় নিয়ে যান। তাদের সাধ্য অনুযায়ী সেবা করছেন। একটি মশারি কিনে দিয়েছেন স্থানীয় একজন। কেউ দিলে তার ভাগ্যে খাবার জোটে, না দিলে না খেয়ে থাকতে হয় তাকে। তাও আবার একা হাত দিয়ে খেতে পারেন না।  দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছেন ওই প্রবীণ নারী। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে আরো রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছেন তিনি।
 
আরিচা পুরাতন ট্রাক টার্মিনালের সুইপার আব্দুর রহমান বলেন, ৭দিন আগে টার্মিনালে এসে  ওই প্রবীণ নারীকে ঘিরে লোকজনের ভিড় দেখতে পাই। কে বা কারা তাকে এখানে রেখে গেছে বলতে পারি না। আমি দুইদিন খাবারও দিয়েছি তাকে। তখন তিনি একটু একটু কথা বলতে পারতেন। কিন্ত হাঁটতে পারতেন না। তার নাকি ছেলে-মেয়ে সবই আছে।  
 
নিহালপুর গ্রামের জবেদা বেগম জানান, কয়েকদিন আগে টার্মিনালের দক্ষিণ পাশের ঘরের বারান্দায় নিজে পায়খানা-প্রশ্রাব করে তার মধ্যেই শুয়ে থাকতে দেখা যায় তাকে। এমতাবস্থায় তাকে দেখ-ভাল করার জন্য রিক্সায় করে টার্মিনালের উত্তর পাশের ঘরের বারান্দায় নিয়ে আসি আমি। ওই ঘরটি আমার বাড়ির কাছে। তাকে গোছল করিয়ে কাপড় পরিয়ে এখানে রাখা হয়। কাঁথা-বালিশের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। 
 
একই গ্রামের সুলতানা বেগম বলেন, আমি ওই প্রবীণের কাছ থেকে শুনেছি তার ১ ছেলে, নাম মসুর আলী, স্বামীর নাম মকছেদ আলী, বাড়ি শিবালয় উপজেলার জাফরগঞ্জ গ্রামে। কে তাকে এখানে রেখে গেছে জিজ্ঞেস করলে একবার ছেলের কথা বলেন আবার বলেন আমার কপাল। কোন কিছুই ভালোভাবে বলতে পারেন না তিনি। বর্তমানে তিনি অসুস্থ। তাকে চিকিৎসা করানো দরকার। আমরা গরিব মানুষ, যা খাই তা নয় দিলাম। কিন্ত চিকিৎসা করাবো কিভাবে? তাকে চিকিৎসা এবং সহযোগীতা করার  জন্য সংশ্লিষ্টসহ সমাজের হৃদয়বান ব্যাক্তিদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।  
 
এ ব্যাপারে শিবালয় মডেল ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ডের সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, যদিও নিহালপুর এলাকাটি তার এলাকার মধ্যে নয়। তারপরও মানবিক কারণে তার সাধ্য আনুযায়ী ওই প্রবীণকে সহযোগীতার করবো।
 
ইত্তেফাক/নূহু