ব্যাংকিং সিস্টেমের ইতিবৃত্তি

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৩:৩৪

স্বাধীনতার আগে অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে দেশের ব্যাংকব্যবস্থা কার্যত নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত হতো পাকিস্তানিদের দ্বারা। বাণিজ্যিক ব্যাংক বলেন, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেন, সেখানে বাঙালিদের কোনো উচ্চপদে আসীন হতে দেওয়া হতো না। নিচের দিকে কিছু বাঙালিকে নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু ব্যাংক ব্যবস্থা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করত পাকিস্তানিরা। প্রায় সবগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ছিল পাকিস্তানে। বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাংকগুলোর কিছু শাখা ছিল মাত্র। এই শাখাগুলোও নিয়ন্ত্রিত হতো পাকিস্তানিদের দ্বারা।

বাণিজ্যিক ব্যাংকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হচ্ছে ক্রেডিট ডিপার্টমেন্ট এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিপার্টমেন্ট। এই দুই ডিপার্টমেন্টে কোনো বাঙালিকে তারা নিয়োগ দিত না। অর্থাৎ ব্যাংকিং সিস্টেমটা পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণেই রেখে দিত। স্বাধীনতাযুদ্ধ যখন শুরু হলো তখন তারা ধীরে ধীরে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। আর শেষ দিকে এসে তারা যখন বুঝতে পারে যে, এ দেশে আর থাকতে পারবে না, অর্থাৎ যুদ্ধে তাদের পরাজয় অনিবার্য, তখন ব্যাংকিং সেক্টরের শীর্ষস্থানে থাকা দক্ষ লোকবল বাংলাদেশ ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যায়।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে আমরা এমন একটি ব্যাংকিং সেক্টর পেলাম, যেখানে অভিজ্ঞ লোকবল বলতে গেলে ছিল না। বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং সেন্ট্রাল ব্যাংক উভয় ক্ষেত্রেই একই অবস্থা বিরাজ করছিল। সেন্ট্রাল ব্যাংকের একটি ডেপুটি গভর্নরের অফিস ছিল বাংলাদেশে। এখন যেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ডেপুটি গভর্নরের অফিসের কাজ কিন্তু কোনো পলিসি মেকিং ছিল না। করাচি থেকে যে পলিসি মেকিং করা হতো, সেটাই তারা শুধু বাস্তবায়ন করত। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব শাখা অফিস আছে ঠিক তাদের মতোই ছিল তখন বাংলাদেশে অবস্থিত ডেপুটি গভর্নরের অফিসের কাজ। তারা কোনো পলিসি মেকিং প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল না। তারা শুধু হেড অফিসের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করত মাত্র। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ‘ব্যাংক অব বাংলাদেশ’ নামে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করে। কেউ বললেন, স্টেট ব্যাংক অব বাংলাদেশ নাম হলে ভালো হয়। কয়েক দিন চালান জমা হলো ‘ব্যাংক অব বাংলাদেশ’ নামে। ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরে বাংলাদেশ ব্যাংক (টেম্পোরারি) অর্ডার বের হলো। সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এভাবেই আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক পেয়ে গেলাম। পরবর্তী সময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরামর্শে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জারি করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১২৭। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩ কোটি টাকা, যার পুরোটাই সরকার কর্তৃক প্রদত্ত। তৎকালীন স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের বাংলাদেশ-সম্পর্কিত সব দায়িত্ব ও কর্মভার, সম্পদ ও দায়দেনা ইত্যাদি অধিগ্রহণ করে। এখন বৈদেশিক লেনদেনের জন্য বিদেশে নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন দেখা দিল। কিন্তু বাংলাদেশের কাছে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না। তখন ঋণ বাবদ ভারত সরকারের দেওয়া ৫০ হাজার পাউন্ড-স্টার্লিং দিয়ে ব্যাংক অব ইংলান্ডে নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। ভারত অনুদান হিসেবে বাংলাদেশকে আরো ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিল। সেই অর্থ দিয়ে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মুম্বাই শাখায় দ্বিতীয় নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। ভারতের দেওয়া ১০ কোটি ভারতীয় রুপি দিয়ে হিসাব খোলা হলো রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার কলকাতা শাখায়। এভাবেই আমাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়। পাকিস্তান আমলে এক টাকা, পাঁচ টাকা, ১০ টাকা, ৫০ টাকা, ১০০ টাকা এবং ৫০০ টাকার নোট ছিল। পাকিস্তানি মুদ্রার নাম ছিল রুপি; কিন্তু আমরা রুপিকে টাকাই বলতাম। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে এসে আগস্ট মাসে পাকিস্তান ১০০ রুপি এবং ৫০০ রুপির নোট অচল ঘোষণা করে। আমাদের এখান থেকে কিছু কিছু মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে ভারতে চলে যায়। সেখানে তারা এই টাকা মুক্তিযোদ্ধাদের খরচের জন্য দিয়ে দেয়। সেই টাকা আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান গিয়ে কিছু টাকা বদল করে এনেছে। এই প্রবণতা বন্ধ করার জন্য পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ আগস্ট মাসে ১০০ ও ৫০০ রুপির নোট অচল করে দেয়। একই সময়ে বাংলাদেশের কিছু কিছু মানুষ সিল তৈরি করে নেয়, যাতে লেখা ছিল ‘বাংলা দেশ’। তখন ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি আলাদা করে লেখা হতো। এছাড়া কোনো কোনো নোটে জয়বাংলা লেখা সিল মারা হতো। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বাংলা দেশ এবং জয়বাংলা সিল দেওয়া নোট অচল ঘোষণা করে। মুক্তিযুদ্ধের পর আমাদের কাছে ছিল এক টাকা, পাঁচ টাকা, ১০ টাকা এবং ৫০ টাকার নোট। এই নোটগুলো বাজারে চালু থাকে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে ফিরে এলেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধু অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে বললেন, চলো তো দেখি ব্যবসায়-বাণিজ্য কীভাবে চলে? তারা বেরিয়ে ধানমন্ডির একটি দোকানে ঢুকলেন এবং একটি টুল টেনে বসলেন। একজন লোক এসে সেই দোকানে কিছু কাপড় কিনলেন এবং মূল্য বাবদ ভারতীয় নোট দিলেন। আর একজন ক্রেতা পাকিস্তানি নোট দিয়ে পণ্য ক্রয় করলেন। এই ঘটনা দেখে বঙ্গবন্ধু খুবই কষ্ট পান। তিনি ভাবলেন, এত কষ্ট করে দেশ স্বাধীন করলাম। আগে তো কেবল পাকিস্তানি নোট দিয়ে আমাদের অর্থনীতির ওপর চেপে বসেছিল। এখন দুটি নোট চেপে বসতে চলেছে। বাংলাদেশে তখনো সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস স্থাপিত হয়নি। তাই নিজস্ব টাকা বিদেশ থেকে ছেপে না আনা পর্যন্ত পাকিস্তানি রুপিই চালু ছিল। বাংলাদেশের মানচিত্রসংবলিত প্রথম এক টাকার নোট ছাপা হয় ভারত থেকে। ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ ভারতে মুদ্রিত এক টাকার নোট বাজারে আসে। একই সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠান থেকে মুদ্রিত ১০০ টাকার নোটও বাজারে আসে। স্বাধীনতা অর্জনের পর মাত্র ৭৯ দিনের মাথায়, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৫৪ দিন পর বিদেশ থেকে টাকা ছেপে এনে বাজারে ছেড়েছেন। ইতিহাসে এটা নজিরবিহীন ঘটনা। ভারতে মুদ্রিত নোট বাজারে ছেড়ে বঙ্গবন্ধু নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে ছিলেন না। তিনি জানতেন দ্রুত মুদ্রণের কারণে নোটে কোনো নিরাপত্তা সুতা বা জলছাপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই এই নোট যে কোনো সময় জাল হতে পারে। তাই বাজার থেকে খুব স্বল্পসময়ের মধ্যেই এই নোট প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফা নোট মুদ্রণ করা হয় ইংল্যান্ড থেকে। টাকা মুদ্রণের জন্য স্বর্ণ রিজার্ভ রাখতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে স্বর্ণ ছিল না। পরবর্তী সময়ে সরকার একটি গ্যারান্টি দেয়। সেই গ্যারান্টির বিপরীতে টাকা মুদ্রণ করা হয়। টাকার ডিজাইন করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে দেশের খ্যাতিমান কয়েক জন শিল্পী ও ডিজাইনার।

বাংলাদেশে কমার্শিয়াল ব্যাংকের যেসব শাখা ছিল তা পরিচালনা কীভাবে করা হবে তা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। কারণ দক্ষ লোকবলের অভাব ছিল। তখন বঙ্গবন্ধু বললেন, দেশে এত বেশি ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। তিনি ছয়টি ব্যাংকের অনুমোদন দিলেন। এই ছয়টি ব্যাংক হচ্ছে সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক। প্রত্যেকটি ব্যাংকের বাংলায় নামকরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের শুরুতে ১০০ টাকার নোট বাতিল করে দিলেন। এর মাধ্যমে দেশে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসে। এই সঙ্গে তিনি আরো একটি দুঃসাহসী কাজ করেছিলেন। পাউন্ড-স্টার্লিংয়ের বিনিময় হার ছিল ১৮.৯৬৭৭ টাকা। সেটা বৃদ্ধি করে ৩০ টাকা করা হয়। এর ফলে রপ্তানি কার্যক্রম প্রণোদিত হয়। রপ্তানি বৃদ্ধির একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়। এভাবে দেশে যখন আর্থিক এবং ব্যাবসায়িক কার্যক্রম বৃদ্ধি পেল তখন ১৯৮১ সালে সরকার চিন্তা করল, এখন আমরা ব্যক্তি খাতে ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি দিতে পারি। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের দুর্নীতি ও অদক্ষতাই মূলত এই চিন্তার পেছনে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো সাধারণ মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারছিল না। তখন আরব-বাংলাদেশ ব্যাংক নামে একটি ব্যাংক ব্যক্তিমালিকানায় স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর অতি দ্রুত ব্যক্তিমালিকানায় অনেকগুলো ব্যাংক স্হাপিত হয়েছে।

দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে, আমি এটা মনে করি না। কিন্তু ব্যাংকগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা একটি চ্যালেঞ্জ। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশের কিছু ব্যাংক এমন কিছু লোকের হাতে পড়ে গেছে যারা ব্যাংককে তার ব্যক্তিমালিকানায় একটি ব্যবসায় বলে মনে করেন। অথচ ব্যাংক ব্যবসায় সাধারণ আর দশটি ব্যবসায়ের মতো নয়। ব্যাংকের মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকলেও তার কল্যাণমূলক দিকটিও কোনোভাবে উপেক্ষা করা যায় না। ব্যাংকের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখা। যারা ব্যাংকের উদ্যোক্তা তারা মোট বিনিয়োগের ১০ শতাংশেরও কম নিজেরা জোগান দিয়ে থাকেন। অবশিষ্ট ৯০ শতাংশ অর্থই আসে আমানতকারীদের নিকট থেকে। কাজেই ব্যাংক ব্যবসাকে সাধারণ ব্যবসায়ের মতো মনে করার কোনো সুযোগ নেই। যারা ব্যাংকের উদ্যোক্তা বা মালিক তারা কার্যত জনগণের অর্থের পাহারাদার মাত্র। দেশে যদি ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হয় তাহলে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়। গ্রাহকরা ভালো সেবা পেতে পারে। যেমন, ভারতের যে কোনো ব্যাংকের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংকের সার্ভিস অনেক ভালো।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং নিশ্চিতভাবেই ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং। আমাদের এখানে যেসব ব্যাংক ব্যবসায় পরিচালনা করছেন তারা অনেকগুলো শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কোনো ব্যাংক নতুন শাখা খুলতে চাইলেই বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে ব্রাঞ্চ স্থাপনের অনুমতি প্রদান করে।

লেখক : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

ইত্তেফাক/ আরাফাত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন