অপরূপের সঙ্গে রূপশ্রীর প্রথম দেখাটা তাদের জীবনরেখার বাঁক পরিবর্তন করে দেয়। দু’জনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করলেও সেসময় তাদের মধ্যে পরিচয় হয়নি। পড়ালেখা শেষ হওয়ার পর একদিন টিএসসিতে একটি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় তাদের পরিচয় ঘটে উভয়েরই পরিচিত মাহজাবীনের মাধ্যমে, কাকতালীয়ভাবে। অপরূপ তখন একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি নিয়েছে মাত্র। রূপশ্রী তখনো চাকরির সন্ধানপ্রার্থী। অপরূপ তার ধারাবাহিক চেষ্টায় পায় সরকারি চাকরি, পোস্টিংও ঢাকায়ই। প্রায় একই সময়ে রূপশ্রীও ব্যাংকে চাকরি পায়। পোস্টিং কেরানীগঞ্জের কদমতলীতে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো তারা কাটায় একসঙ্গে। পৌষের এক সকালে তারা চলে যায় বোটানিক্যাল গার্ডেন, মিরপুরে। সেখানে গিয়ে সবুজের সমারোহে দুজন মুখোমুখি নির্বাক বসে থাকে অনেকক্ষণ। একে অন্যের মধ্যে যেন কী আবিষ্কার করছিল। নীরবতা ভাঙে রূপশ্রী, ‘জানো অপরূপ, আমাকে প্রায়ই এমন কিছু প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় তাতে হতবাক হওয়াই শুধু নয়, বিব্রতও হই। নিজেকে প্রশ্ন করি, আমার মতো কি এমন আরো আছে! কিন্তু এই ভাবনাটা প্রলম্বিত হতে দিই না।’ রূপশ্রী একটু থেমে বলে, ‘কী আশ্চর্য! অপরূপ, তুমি কিছু বলছ না যে!’
‘রূপশ্রী, আমি আর বলার সুযোগ পাচ্ছি কোথায়! আমি বলার চেয়ে শুনতেই পছন্দ করি। আর, তুমি যেভাবে বলছিলে তার উত্তরে আমার খুব কিছু বলার অবকাশও ছিল না। ভাবছিলাম কী এমন প্রশ্নের মুখে তোমাকে পড়তে হয়, যে কারণে হতবাক ও বিব্রত হও?’
‘অপরূপ, তোমার গভীরতা আজো আমি ঠিক যেন আবিষ্কার করতে পারছি না। তোমার অন্তদৃর্ষ্টি অত্যন্ত গভীর। তুমি সত্তায় নাড়া দেওয়ার মতো একজন মানুষ।’
‘রূপশ্রী, তোমার জীবন-ছক যে ছন্দময় আমার জীবন তার ঠিক বিপরীত। তোমাকে আমি প্রথম পরিচয়েই বলেছিলাম, এই শত ছিদ্রবিশিষ্ট জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে তুমি কতদূর যেতে পারবে, জানি না। আমরা বন্ধুত্ব দিয়ে সম্পর্কের সেতু নির্মাণ করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত তা গড়িয়ে গেল প্রণয়ে, আর এখন হয়তো যাচ্ছে ঘর বাঁধার দিকে। রূপশ্রী, আমার মনে মাঝেমধ্যে খুব সংশয় জাগে, আমি তোমার জীবনের সেই স্বপ্নের মানুষ হয়ে থাকতে পারব তো!’
‘অপরূপ, তোমাকে নিয়ে এত সমীকরণের ছক কষিনি কখনো। আমি শুধু বুঝেছিলাম জীবনে সবকিছু পূর্ণতা পাবে এমনটি ভাবার প্রয়োজনই নেই। তাতে অসুখী হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। আমি শুধু জীবনের জন্যই জীবন চাচ্ছিলাম এবং তা পেয়েছি। তোমার সংশয় আমাকে স্পর্শ করে না, তোমার সৃজন আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমার জন্য তো এইটুকুই যথেষ্ট। জানো তো চাওয়া যত কম হয় সুখ তত নিবিড় হয়।’
‘রূপশ্রী, তোমার ভাবনার আকাশ এত উদার! আমি তো সেভাবে ভাবিনি!’
‘অপরূপ, ভাবা কিংবা দেখায় তো অনেক পার্থক্য। মেনে নেওয়া ও মনে নেওয়ার মধ্যে পার্থক্যের মতো। তুমি হয়তো সেভাবে দেখনি।’
‘রূপশ্রী, তুমি দর্শন আর আমি অর্থনীতি বিষয়ে পড়েছি। এই দুইয়ের মধ্যেও তো বিষয়গত অনেক পার্থক্য। তবে এই সত্য আমার পক্ষে এড়ানো দুরূহ, তুমি আমার ভাবনার নতুন জানালা খুলে দিয়েছ। আমার পথরেখাও তুমিই নির্মাণ করেছ।’
‘অপরূপ, তুমি নিজে তো বড় মানুষ তাই অন্যকেও বড় করে দেখ। তোমার সারল্য আমার দর্শনের দর্শন। সারল্য খুব দামি, ওটা ধরে রেখো। আমি তোমাতে আমায় খুঁজে নিতে হয়তো পেরেছি তোমার সারল্যের জন্যই। এখানে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই, তোমার বড়ত্ব আমাকে টেনে নিয়েছে।’
‘রূপশ্রী, আচ্ছা বলো তো তুমি সময়কে জন্মাতে দেখেছ?’
‘অপরূপ, তুমিই আমাকে শিখিয়েছিলে সময়ের সংলগ্ন কিংবা কীভাবে সময়ের অংশীদার হয়ে থাকতে হয়। আমি তা ধারণ করেছি এবং এই প্রেক্ষাপটেই ক্ষণে ক্ষণে সময়ের জন্মবেদনা দেখছি। এ থেকে যা সঞ্চিত হচ্ছে তা জীবনের জন্য তো কম কিছু নয়।’
‘রূপশ্রী, যে কোনো সৃজনশীল মানুষের কাছেই নতুন কোনো কিছু নিয়ে আসার জন্মবেদনা কেবল তাঁরাই জানেন, যাঁরা এমন কিছুর স্রষ্টা। আর যদি এই জন্মদানে ব্যর্থতার ছাপ লাগে কিংবা সম্ভাবনার হয় অপমৃত্যু, তাহলে বেদনাও অনেক বেশি গভীর হয়। আচ্ছা বলো তো—সৃজনশীল মানুষ কেমন মানুষ? মানুষের সৃজনশীলতার প্রকাশ কী? উত্তর বোধ করি দীর্ঘ। কিন্তু সংক্ষেপ বলা যায়—সৃজনশীলতা একটি বিশেষ ব্যক্তিগত গুণ যা ব্যক্তিকে কার্যকরভাবে উদ্ভাবনী ক্রিয়ায় লিপ্ত হতে অনুপ্রাণিত করতেই থাকে। মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়, এই কথাটি একজন সৃষ্টিশীল-সৃজনশীলের ক্ষেত্রে খুব খাটে। সব স্বপ্ন হয়তো পূরণ হয় না, কিন্তু একজন সৃষ্টিশীল মানুষের স্বপ্ন কখনো ফুরায় না।’
‘অপরূপ, তোমার কাছে আমি বরাবরই দশ দিগন্তের নিশানা পাই। আমি আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে তোমাকে বলছি, কষ্ট পাওয়াই যার নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে স্বভাবতই কান্নাও ভুলে গেছে। এমন কয়েকজনকে চিনি-জানি। কষ্টগুলো তারা অন্তরে গেঁথে রেখেছেন আর মনে মনে ভাবেন এটাই তাদের নিয়তি! জীবনের সব গল্প জয় দিয়ে লেখা হয় না, আবার সব গল্পে মানুষ হেরেও যায় না! জীবনবৃত্তান্তের সঙ্গে জীবনীর পার্থক্য হলো, জীবনীতে ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিশ্লেষণ করা হয়, তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে গভীর আলোচনা করা হয়। কিন্তু জীবনী? ধুর, এসব বাদ দাও তো। ইদানীং খুব নস্টালজিয়া ভর করেছে। ‘লাভ ফর পাস্ট’ অর্থাৎ অতীতের জন্য ভালোবাসা। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে টের পাই অনেক ক্ষেত্রেই এই বয়সেই স্মৃতিহরণ ঘটছে। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য তা হয়তো ক্ষীয়মাণতাই বোঝায়।’
‘রূপশ্রী, ঐ যে তুমি বললে আমার কাছে তুমি দশ দিগন্তের নিশানা পাও, কিন্তু আমিও কি তোমার সঙ্গে থেকে কম সমৃদ্ধ হয়েছি! এই যে আমরা পরস্পরকে দেখি-জানি কিংবা অনেক কিছু নির্ণয়ের সূত্র পাই আলোচনায়-বোঝাপড়ায়, তা আমাদের জীবনে নিত্যনতুন জীবনরেখা টেনে দিচ্ছে। বলতে পার জীবনকে দেখার অন্য জানালা পেয়ে গেছি আমরা।’
‘অপরূপ, তুমি তো প্রায় সারাক্ষণই কখনো মান্না, কখনো হেমন্ত কিংবা আরো কত কত কিংবদন্তির গানগুলো গুনগুন করতে। কিন্তু এখন শুনি না কেন?’
‘রূপশ্রী, জীবনের যে স্রোত ছিল একসময় বহুরৈখিক, তা এখন একরৈখিক। অর্থাৎ তোমার-মুখী। সেখানে গান, কবিতা, শিল্প-সাহিত্য সবই বৃত্তাবদ্ধ রয়েছে। তাই এখন অনুচ্চারিত নীরবতায়ই অনেক কিছু উচ্চারিত। আচ্ছা, তুমিও তো খুব ভালো সরোদ বাজাতে, ছেড়ে দিলে কেন?’
‘অপরূপ, জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে গেছে যে জীবন-সরোদ, সেখানে যন্ত্র-সরোদ কি আর ধরে রাখতে পারে আমার মতো উদাসীকে? আমার উদাসীনতা, ছেলেমানুষি তোমার ছোঁয়ায় কখন কেটে গেছে—তাও তো বুঝতেই পারিনি। নিজেই নিজেকে একসময় হঠাৎ দেখলাম আমি যেন অন্যরকম হয়ে গেছি। তুমি আমার সর্বাঙ্গে টান দিয়েছ, তাই তোমাতেই আমি দিই ডুবসাঁতার। আমার ভাবনার জগতে তুমি নির্মল-উদার আকাশ কিংবা আরো কতকিছু—এর বর্ণনা দেওয়া আমার পক্ষে ভার।’
আপাতত এখানেই থেমে যায় যুগল সংলাপ। একজোড়া চোখ তখন অন্য জোড়া চোখের দিকে অপলক তাকানো। পৌষের রোদমাখা দুপুর-বিকেল গড়িয়ে কখন বোটানিক্যাল গার্ডেনের সবুজের মাঝে সন্ধ্যা নেমে আসে—ওরা কেউই টের পায়নি! দু জোড়া চোখে অতল স্বপ্নের চাষ। মাথার ওপর সীমাহীন আকাশ আর সামনে অদৃশ্য অনাবিল সুখের উল্লাস। চার বছরেরও বেশি সময় নানাভাবে তাদের সময় কেটে গেছে, কিন্তু কখনো এমন আলোয় স্পর্শিত হয়নি তারা। এ যে এক জীবনের মাঝেই আরেক জীবনের সন্ধান।
