বায়ান্নর ৪ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের সূত্রপাত 

ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৭:৫২

ভাষা আন্দোলন ’৪৭ থেকে শুরু হয়ে ১৯৫২ সালে এসে প্রচণ্ড দাবানলে রূপ নিতে থাকে। পাকিস্তান সরকারের বারবার বিশ্বাসভঙ্গ ছাত্রদের সামনে সর্বাত্মক আন্দোলন ভিন্ন আর কোনো পথ খোলা রাখেনি।

৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরের সব স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা এবং আরবি হরফে বাংলা ভাষার প্রচলনের চেষ্টার প্রতিবাদে ধর্মঘট পালন করে। বেলা ১১টা থেকেই শিক্ষার্থীরা মিছিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমায়েত হতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন গাজীউল হক। সভা শেষে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী মিছিল করে।

৪ঠা ফেব্রুয়ারির সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে প্রথম পৃষ্ঠায় ৩০ জানুয়ারির বিক্ষোভের বিবরণ ছিল পত্রিকা জুড়ে। রিপোর্টের শিরোনামগুলো দেওয়া হয় এভাবে: ‘নাজিমুদ্দিনের বিশ্বাস ভঙ্গে বিক্ষোভের বিসুবিয়স পূর্ববঙ্গ’, ‘রক্তের স্বাক্ষরে জঙ্গি জনতার শপথ’, ‘উদু‌র্ নয়—বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা করিতে হইবে’, ‘শোভাযাত্রা সংগঠনে রূপান্তরিত হইয়াছে’, ‘১৯৪৮ সালের পথই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রামের পথ’।

এদিনের এই ধর্মঘট ও বিক্ষোভ নিয়ে ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’-এ বেশ অনেকগুলো রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সেসব রিপোর্টের কিছু কিছু অংশ দেওয়া হলো: ‘৪ঠা ফেব্রুয়ারি হরতাল! হরতাল! সাধারণ হরতাল! সাধারণ ছাত্র হরতাল! সর্বত্র প্রস্ত্ততি। রাস্তায়, অলিতেগলিতে, বস্তিতে পোস্টার আর প্রচার। কোথাও বাধা নেই। এখানে সহানুভূতি, সমর্থন, সক্রিয় চেষ্টা। ১৯৪৮ সাল হইতে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সময়ের রূঢ় বাস্তবতা কল্পনাপ্রবণ চিন্তাধারাকে বিনাশ করিয়া আজ দেশবাসী বর্ণভাষা, শিক্ষা-সংস্কৃতির পথে ঐক্যবদ্ধ করিয়া তুলিয়াছে।’

২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে জনসভায় পাকিস্তানের গুণকীর্তন ও সরকার পূর্ব বাংলার জন্য কী কী করেছে তা বক্তৃতা করেন তিনি। শেষ পর্যায়ে তিনি ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। পাকিস্তানকে আমরা ইসলামি রাষ্ট্ররূপে গঠন করতে যাচ্ছি।’ কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর দোহাই দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রদেশের ভাষা কী হবে তা প্রদেশবাসীই স্হির করবেন, কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।

খাজা নাজিমুদ্দিনের এই মন্তব্যটুকুই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের দাবানল সৃষ্টির পক্ষে যথেষ্ট ছিল। এ প্রসঙ্গে ভাষা আন্দোলনের সময়ের অন্যতম নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা বলেছিলেন, ‘নাজিমুদ্দিন সাহেব ভাষার প্রশ্নে ঐ ধরনের বিবৃতি না দিলে বোধহয় ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা নাও ঘটতে পারত। নাজিমুদ্দিনের এ বক্তৃতার জন্য ভাষা আন্দোলন দ্রুত এগিয়ে গেছে।’

নাজিমুদ্দিনের এ বক্তৃতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ঢাকার অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রতিবাদে ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও ধর্মঘটের আহ্বান করা হয়। এছাড়া সেদিনের সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘটের আহ্বান জানানো হয়।

এদিকে, ৩১ জানুয়ারি বিকালে ঢাকার বার লাইব্রেরিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব। আর আব্দুল মতিন (ভাষা মতিন) ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক। এ সভায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের দুজন করে প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিটি হল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি উপস্হিত ছিলেন। এ সভায় ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি