দীর্ঘ ক্যারিয়ারের মঞ্চ, টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে নিজের সাবলীল অভিনয়ে দু্যতি ছড়িয়েছেন অভিনেতা মাসুম আজিজ। যার স্বীকৃতিস্বরূপ এবার একুশে পদকে ভূষিত হলেন তিনি। এমন সম্মান পাওয়ার অনুভূতি, অভিনয় নিয়ে স্বপ্নসহ ইন্ডাস্ট্রির নানা বিষয় নিয়ে তিনি কথা বললেন ইত্তেফাকের সঙ্গে।
একুশে পদক পাওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন। এমন একটি সম্মান পাওয়ার অনুভূতি কীভাবে ব্যক্ত করবেন?
এই অনুভূতি কী ভাষায় প্রকাশ করা যায়! খবরটি শোনার পর অনেকক্ষণ নাচলাম! একুশে পদক পাওয়ার পর থেকে মানুষের এত ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা পাচ্ছি যে, একজন অভিনেতার জীবনে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না। আসলে আমরা যারা অভিনয়ে সারাটা জীবন ব্যয় করেছি তাদের কাছে বেঁচে থাকতে এমন একটি সম্মান পাওয়া বা দেখে যাওয়া সত্যি অন্যরকম আনন্দের। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা। কারণ তিনি আমার কাজের মূল্যায়ন করলেন, সম্মাদ দিলেন। জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারলাম আমার কাজ সম্মান পাওয়ার যোগ্য।
আপনি জটিল একটি রোগ ক্যান্সারে আক্রান্ত। এখন শারীরিক অবস্থা কেমন?
এখন কেমোথেরাপি ও রেডিও থেরাপি নিচ্ছি। এরইমধ্যে ৩টি কেমোথেরাপি এবং ১৩টা রেডিও থেরাপি নিয়েছি। আরো ৫টি কেমোথেরাপি ও ১৭টা রেডিও থেরাপি নিতে হবে। জীবনে তো শুরু থেকেই যুদ্ধ করছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন যেন এই যুদ্ধেও জয় করতে পারি।
শুরু থেকেই স্ট্যাগল করে আজকের মাসুম আজিজ হয়েছেন। সেই সময়ের কথা যদি একটু বলতেন...
দেখুন, ১৯৭৬ সালে যখন ঢাকায় আসি তখন থাকার জায়গা পর্যন্ত ছিল না। তবে সেসময় চাকরির অনেক অফার ছিল। কিন্তু জেদ ছিল অভিনয় করব, তাই সেগুলো গ্রহণ করিনি। এই নাটক করতে গিয়ে বউ-বাচ্চা নিয়েও দীর্ঘদিন না খেয়ে থেকেছি। এমনও দিন গেছে, শুধু মুড়ি খেয়ে সারারাত সেট সাজিয়ে সকালে ৫ টাকার আধা কেজি চাল নিয়ে ঘরে ফিরেছি। তবে ১৯৯৪ সালে বেসরকারি খাতে নাটক ছেড়ে দেওয়ার পর অর্থের মুখ দেখেছি।
অভিনয় নিয়ে মাসুম আজিজের স্বপ্ন বা প্রত্যাশা কী?
আমরা চাইলেই তো মঞ্চ, টিভি বা চলচ্চিত্রে মনের মতো চরিত্রে কাজ করতে পারি না। কারণ তেমন চরিত্র তৈরি হয় না। আবার নিজের পরিচালনায় তেমন চরিত্র থাকলেও সেখানে কাজ করতে চাই না। অনেক চরিত্রের স্বপ্নই দেখি, যে চরিত্রে অভিনয় করে মনের খোরাকটা পেতে পারি, কিন্তু সেই চরিত্র কেউ লেখে না। যে কারণে টাকার জন্য যা পাই তাই করতে হয়।
অনেকেই অভিযোগ করেন,হিরো-হিরোইন নির্ভর ইন্ডাস্ট্রি আপনাদের মতো সিনিয়র এবং গুণী অভিনেতাদের অবমূল্যায়ন করা হয়। আপনি কী বলবেন?
হ্যাঁ, এটা সত্যি খুবই দুঃখজনক। এমনও হয় আমাদের মতো সিনিয়র শিল্পী বসে আসে দুপুর অবধি কিন্তু হিরো বা হিরোইন আসেনি। সবই তো এখন ব্যবসা। এটা হয়েছে মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে। সবকিছু এখন পণ্যের মতো বিক্রি হয়। আমার কান্না বিক্রি হয় ৫ টাকায়, আর মেহজাবীনের হাসি বিক্রি হয় ৩ লাখ টাকায়!
কিন্তু ওটিটি আসায় এই সমস্যা অনেকটাই সমাধান হবে বলে অনেকে মনে করছেন। আপনি কী মনে করছেন?
আমার কাছেও তাই মনে হচ্ছে। আমি এরইমধ্যে দুটি কাজ করেছি। এখানে যোগ্য সম্মানটা তারা আমাকে দিয়েছে। এই মাধ্যমটিতে হিরো-হিরোইন না, শিল্পী মাসুম আজিজের সম্মান আছে। যদি এই মাধ্যমটি ভালোভাবে দাঁড়ায় তাহলে আমাদের কাজের ক্ষেত্রটা প্রসারিত হবে।
নাটক, চলচ্চিত্রে গল্পের দিকে সবাই মনোযোগী হচ্ছেন। এই চর্চাকে কী ধারাবদল বলা যায়?
দেখুন, মানুষ তো সব ঘাটের জল খেয়ে দেখতে চায়। সেই জায়গায় এক সময় কাজ না জানা লোক নির্মাতা বনে গিয়ে বাইরের দেশের গল্পকে কপি করে কাজ করেছেন। দর্শকরা সেগুলো বর্জন করেছে। সবাই নিজের শিকড়ের গল্প দেখতে চায়। নিজের গল্প হলে দর্শক নিরাশ করে না।
