মালির তদারকিতে গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ!

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১১:১১

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বাড়ি নির্মাণকাজ চলছে একজন মালির তদারকিতে। অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বশীল কোনও কর্মকর্তা না থাকায় এ সব ঘর নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম করা হচ্ছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় ১০০টি গৃহহীন পরিবারের বাড়ি নির্মাণের জন্য ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বাহাগিলি ইউনিয়নে ৩০টি এবং বড়ভিটা ইউনিয়নে ৭০টি ঘর নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী গৃহনির্মাণ কাজের লে-আউট প্রদান, ঘরের নিলটন ঢালাই, পলেস্তারকরণ এবং টয়লেটের রিং স্থাপনের সময় অবশ্যই উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা প্রকৌশলী, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এবং সম্ভব হলে পিআইসি কমিটির সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু ভূমিহীনদের ঘর নির্মাণকাজ চলমান থাকলেও প্রকল্প এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তাকে সরেজমিন চোখে পড়েনি।

সোমবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে বাহাগিলি ইউনিয়নের কারবলার ডাংগা গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় স্যানিটেশন টয়লেট নির্মাণে যে রিং গুলো তৈরি করে বসানো হচ্ছে তাও ভেঙ্গে যাচ্ছে। এ সময় সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থাপনের আগেই ভেঙ্গে যাওয়া রিং সরিয়ে নিচ্ছে কাজে নিযুক্ত শ্রমিকরা। এ ছাড়া সরকারিভাবে নিযুক্ত কোনও তদারকি কর্মকর্তা না থাকায় যেনতেনভাবে চলছে ঘরের পলেস্তারাসহ টয়লেটের রিং স্থাপনের কাজ।

স্থানীয়রা জানান, মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার গৃহহীনদের বাড়ি নির্মাণকাজ চলমান থাকলেও   সরকারিভাবে কোনও তদারকি কর্মকর্তা না থাকায় নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারসহ নিজের ইচ্ছেমত কাজ করছেন।

ঘর নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্নমানের সামগ্রী। ছবি: ইত্তেফাক
   
জানা যায়, এ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদটি শূন্য রয়েছে। এখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নীলফামারী সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন নাহারকে। তিনি নিজ কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকায় এই উপজেলায় নির্মিত ভূমিহীনদের ঘর তৈরি হচ্ছে উপজেলা পরিষদের মালি প্রতিদিন ৫০০ টাকা হাজিরায় অস্থায়ী নিয়োগকৃত মালি মাজেদুল ইসলাম চঞ্চলকে দিয়ে।
 
বড়ভিটা ইউনিয়নের বড়ভিটা মেলাবর গ্রাম এবং বড়ভিটা পাঠাগারার ডাঙ্গায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গৃহহীনদের ঘর নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। ঘরের নিলটন ঢালাই এবং পলেস্তারার কাজ চলছে। নিলটন ঢালাইয়ে নীতিমালা অনুযায়ী খোয়া,বালু এবং সিমেন্টের মিশ্রণের সময়ও একজন তদারকি কর্মকর্তা থাকার কথা, কিন্তু সেখানেও কোনও তদারকি কর্মকর্তা নেই। তদারকি কর্মকর্তা না থাকায় রাজমিস্ত্রিরা যেনতেনভাবে বালু, খোয়া ও সিমেন্টের মিশ্রণ দিয়ে ঘরের নিলটন ঢালাই এবং পলেস্তারার কাজ করছে।
 
প্রকল্প এলাকার রাজমিস্ত্রি রহমত মিয়া বলেন, ‘আমরা নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছি।’

তদারকি কর্মকর্তা না থাকায় কে কাজের দেখভাল করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে উপজেলা নির্বাহী অফিস থেকে নিযুক্ত মাজেদুল ইসলাম চঞ্চল নামে একজন এসে কাজ দেখাশুনা করেন। মাঝেমধ্যে উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি এসে কাজ দেখে যান।’
 
উপজেলা পরিষদের মালি মাজেদুল ইসলাম চঞ্চল মিয়া বলেন, ‘সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার নবীরুল ইসলামের নির্দেশে আমি গৃহহীনদের ঘর নির্মাণকাজের মালামাল সরবরাহসহ সার্বিক কাজ দেখাশুনা করছি। এর বাইরে আর কিছুই না।’

এদিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বাসভবনে গিয়ে দেখা যায়, গৃহহীনদের বাড়ি নির্মাণকাজের দরজা, জানালাসহ বিভিন্ন উপকরণ তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবু হাসনাত সরকারের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ঘর নির্মাণকাজে অবশ্যই একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী তদারকির দায়িত্বে থাকবেন।’
 
উপজেলা প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ঘর নির্মাণকাজে একজন সহকারী প্রকৌশলী নিযুক্ত রয়েছেন।’

প্রকল্প এলাকায় গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘কাজের সার্বিক দায়িত্বে রয়েছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার। ঢালাই, পলেস্তারাসহ অন্যান্য কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে না জানালে কেমন করে যাবে।’

টয়লেটের রিং স্থাপনের আগেই ভেঙ্গে যাওয়ার বিষয়ে বললে তিনি বলেন, ‘আমি লোক পাঠিয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছি।’
 
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জেসমিন নাহার বলেন, ‘গৃহহীনদের বাড়ি নির্মাণকাজের সার্বিক দায়িত্বে আমি রয়েছি। এ বিষয়ে কোনও অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে জানাবেন।’
 
নীলফামারী জেলা প্রশাসক খন্দকার ইয়াসিন আরেফিনের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘আমি এই জেলায় নতুন এসেছি। গৃহহীনদের বাড়ি নির্মাণকাজে কোনও অনিয়ম হয়ে থাকলে খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 
 
ইত্তেফাক/এসজেড