গত মঙ্গলবার ৬ রজব ১৪৪৩ হিজরি সুলতানুল হিন্দ হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি আজমেরি (রাহ.)-এর ৮১০তম উরস মুবারক উদ্যাপিত হয়। ৬৩৩ হিজরি ৬ রজব/ ১৬ মার্চ ১২৩৬ খ্রি. তিনি ভারতের আজমির শহরে ইন্তেকাল করেন। তিনি যে কত বড় উচ্চমার্গের অলি ছিলেন তার নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছিল তার ওফাতের ঠিক পর মুহূর্তেই। উপমহাদেশের বিখ্যাত আলেমে দিন হজরত শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভি (রাহ.) তার আখবারুল আখিয়ার নামক সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, হজরত খাজা সাহেবের ললাটে তার ইন্তেকালের পর পরই ‘হাবিবুল্লাহ মাতা ফি হু্ববিল্লাহ’ (অর্থাত্ আল্লাহর হাবিব (প্রিয়তম) আল্লাহর প্রেমেই ইহধাম ত্যাগ করেছেন) শীর্ষক বাক্যটি ফুটে ওঠে। তিনি উপমহাদেশে এসেছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়াসাল্লামের নায়েব হিসেবে। এ কথা সত্য যে, তার আগমনের বহু আগেই ইসলাম ও মুসলমানদের ভারতবর্ষে আগমন ঘটে এবং অনেক সুফি সাধক ইসলাম প্রচারে নিজেদের নিয়োজিত করেন। কিন্তু হজরত খাজা সাহেবের আগমনে ইসলাম প্রচারে এক বিপ্লব ঘটে এবং তা একটি সামাজিক বিপ্লবেও রূপান্তরিত হয়। তার আবির্ভাবের পূর্বে বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। উঁচু বর্ণের হিন্দুসমাজ তাদের স্বধর্মের নিচু বর্ণের লোকদের অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখতে থাকে। সাধারণ মানুষ উচ্চ বর্ণের লোকদের দ্বারা কীভাবে নিগৃহীত হচ্ছিল তার বিবরণ আবু রায়হান আল-বিরুনির কিতাবুল হিন্দ নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক প্রফেসর খালীক আহমাদ নিযামী তার ‘তারীখে মাশায়েখে চিশ্ত’ নামক গ্রন্থে বিষয়টির উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন যে, আল্লাহ তাদেরকে মানুষ বানিয়েছিলেন, কিন্তু তার বান্দারা তাদেরকে, অর্থাত্ নিচু শ্রেণির লোকদেরকে জানোয়ারের জীবন যাপনে বাধ্য করছিল। আল-বিরুনি আরো বলেন যে, হিন্দুদের মধ্যে জাতিভেদ প্রকট থাকায় এবং মুসলমানদের মধ্যে কোরআনের আয়াত ‘ইন্না আকরামাকুম ইন্দাল্লাহি আতকাকুম’ (অর্থাৎ আল্লাহর কাছে সেই সম্মানিত যে আল্লাহকে অধিক ভয় করে)-এর মর্মার্থ অনুযায়ী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মানবীয় মর্যাদা-সম্পর্কিত সম্পূর্ণ ভিন্নতর দুটি চিন্তাধারা বিরাজমান ছিল।
হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রাহ.) সেই সময় এই সব জাতিভেদ এবং স্পৃশ্য-অস্পৃশ্যতার বেড়াজাল ছিন্ন করে তাওহিদের দর্শন প্রচার করেন। তার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দলে দলে লোক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়া শুরু করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রাহ.) ইরানের সিজিস্তান নামক স্থানে ৫৩৬/৫৩৭ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম খাজা গিয়াসুদ্দিন হাসান। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। খাজা সাহেব মাত্র ১৫ বছর বয়সে পিতৃহীন হন। পৈতৃক সূত্রে তিনি একটি ফলের বাগান লাভ করেছিলেন। ইব্রাহিম কান্দুজি নামক একজন মজ্জুব বুজুর্গের সংস্পর্শে এসে তার জীবনে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। তিনি তার ফলের বাগান অন্যদের দান করে দুনিয়াত্যাগী একজন সাধক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন। আল্লাহর রাস্তায় সফরকালীন নিশাপুরের কাছে হারুন বা হারভান নামক স্থানে চিশতিয়া তরিকার প্রখ্যাত শায়খ হজরত খাজা উসমান হানি [অনেকের মতে হারভানি] (রাহ.)-এর সাক্ষাৎ ঘটে এবং তার কাছে বায়আত গ্রহণ করেন।
আখবারুল আখিয়ার নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রাহ.)
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আপন পির ও মুর্শেদের খিদমতে থেকে উচ্চতর আধ্যাত্মিক মর্যাদা লাভ করেন। পির ও মুর্শিদ খাজা ওসমান হারুনি (রাহ.) তাকে খেলাফত প্রদান করেন এবং রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের রওযায় হাজির হয়ে নবিয়ে করিম (সা.)-এর নির্দেশমতো হেদায়েতের কাজে নিয়োজিত হওয়ার আদেশ প্রদান করেন। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের আদেশেই তিনি ভারতবর্ষে আগমন করেন এবং হজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম তাকে সুলতানুল হিন্দ উপাধিতে ভূষিত করেন বলে উল্লেখ রয়েছে। এজন্যই হজরত খাজা সাহেব নায়েবে নবি ও হিন্দাল অলি উপাধিতেও পরিচিতি লাভ করেন। ভারত আসার পথে তিনি লাহোরে প্রখ্যাত সুফি হজরত আলি উসমান হুজভিরি (দাতা গঞ্জে বখ্শ) রাহ.-এর মাজারে চিল্লাহ (চল্লিশ দিন অবস্থান) করেন এবং সেখান থেকে ভারতের আজমিরে পৌঁছান। সেখানকার রাজা ছিলেন পৃথ্বীরাজ। দিল্লিও তখন তার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পৃথ্বীরাজ ছিলেন মুসলিমবিদ্বেষী। নিচু বর্ণের হিন্দুরাও তার দ্বারা অত্যাচারিত হতো। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সময় উচ্চ বর্ণের লোকেরা কীভাবে সাধারণ মানুষের প্রতি নির্মম ব্যবহার করত। আজমিরে খাজা সাহেবের আগমনের ফলে দলে দলে লোক তার দরবারে আসা শুরু করে। এতে পৃথ্বীরাজ খাজা সাহেবের প্রতি অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তার মুরিদ ও ভক্তদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করেন।
খাজা সাহেব পৃথ্বীরাজের এই ব্যবহারে অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং তার পবিত্র জবান থেকে নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি বেরিয়ে আসে ‘পিথ্রা যিন্দাহ্ গেরেফতাম, ওয়া মুসালমানান দাদেম’ অর্থাত্ পৃথ্বীরাজকে জীবিত বন্দি করলাম এবং মুসলমানদের দান করলাম। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, খাজা সাহেবের এই বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছিল। আফগানিস্তানের অন্তর্গত ঘোর প্রদেশের সাধনকর্তা মইযুদ্দিন মুহাম্মদ বিন সাম, যিনি শাহাবুদ্দিন মুহাম্মদ ঘোরি নামে সমধিক পরিচিত, স্বপ্নযোগে হজরত খাজা সাহেবের নির্দেশ পেয়ে ভারত আক্রমণ করেন। দিল্লির সন্নিকটে উভয়ের মধ্যে চরম যুদ্ধ হয় এবং সেই যুদ্ধে দেড় শত ভারতীয় রাজন্যবর্গ পৃথ্বীরাজের পক্ষ অবলম্বন করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন; কিন্তু তাদের সব প্রতিরোধ চূর্ণ করে ঘোরি বিজয়ী হন এবং পৃথ্বীরাজকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করা হয় এবং সুলতানের নির্দেশে তিনি নিহত হন। এভাবে এই মহান সাধকের দোয়ায় এই অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সাধারণ মানুষ রেহাই পায়।
হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রাহ.)-এর দরবারে গরিব, ধনী সবাই সমানভাবে সমাদৃত হতেন। গরিব মিসকিনকে তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন। এজন্য তার অত্যন্ত বহুল প্রচলিত উপাধি হলো গরিবে নাওয়াজ। হজরত গরিবে নাওয়াজের রুহানি ফায়েজে এত বিপুলসংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন যে, ইতিহাসে আর কোনো মনীষীর হাতে এত অধিক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ নেই। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নেতা খাজা হাসান নিজামি বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রম্হ পর্যালোচনা করে তার প্রখ্যাত গ্রম্হ নিজামি বাঁশরিতে উল্লেখ করেন যে, হজরত গরিবে নাওয়াজের হাতে প্রায় ১ কোটি লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আর এভাবেই সারা ভারতবর্ষে ইসলামের ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। হজরত খাজা সাহেবের পরে তার খলিফাগণ ও তাদের খলিফাগণ এবং অন্যান্য সুফিয়ে কেরাম ও ধর্ম প্রচারকগণ ইসলাম প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখেন এবং বিপথগামী মানুষদের সুপথ প্রদর্শন করতে থাকেন।
অত্যাচারিত, অবহেলিত, মানবেতর জীবন যাপনে অতিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ইসলামের সাম্য মৈত্রীর সুমহান বাণী এবং এর বাস্তব চিত্র দেখতে পেয়ে দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় খোঁজেন। আজ এই উপমহাদেশে, ৭০ কোটির অধিক মুসলমানের বাস। এর মূল ভিত হজরত গরিবে নাওয়াজ স্থাপন করে গেছেন। তার শিক্ষার মূল বিষয় ছিল পরিপূর্ণভাবে তাওহিদে বিশ্বাস এবং আল্লাহর প্রতি সর্বাবস্থায় তাওয়াক্কুল রাখা। আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেম ও তার সৃষ্টির প্রতি গভীর ভালোবাসা। ঐশী প্রেমই তার কাছে মানবীয় শক্তি ও মর্যাদার সবচেয়ে বড় উত্স। যে আল্লাহকে ভালোবাসে সে কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করে না। আজ সমাজে যে অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ-বঞ্চনা, হিংসা-বিদ্বেষ বিরাজ করছে তা নিরসনে সবাইকে খাজা গরিবে নাওয়াজের প্রেমের দর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। আর তিনি শিক্ষা নিয়েছিলেন আল্লাহর হাবিব রাহমাতাল্লিল আল-আমিন হজরত রসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়াসাল্লামের জীবন দর্শন থেকে। নায়েবে নবি সুলতানুল হিন্দ হজরত গরিবে নাওয়াজের ৮১০তম উরসের দিনে প্রার্থনা ছিল, তার জীবনদর্শন অনুসরণের মাধ্যমে এই উপমহাদেশ তথা সমগ্র বিশ্বে শান্িত বিরাজ করুক। দূর হোক সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ এবং সবাই মহান আল্লাহর প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে তার সমগ্র সৃষ্টিকে ভালোবাসুক।
লেখক: সাজ্জাদাহনাশীন, খানকাহ্ আবুল উলাইয়া, কিশোরগঞ্জ ও প্রফেসর, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল
