নামিদামি ব্র্যান্ডের মোড়কে তৈরি হচ্ছে নকল প্রসাধনী-শিশুখাদ্য

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২০:২১

ঢাকার কেরানীগঞ্জের ১৭টি কারখানায় আন্তর্জাতিক কোম্পানির মোড়কে তৈরি হচ্ছে ভেজাল শিশুখাদ্য, নকল প্রসাধনী ও বৈদ্যুতিক সামগ্রী। হাসনাবাদ, শুভাঢ্যা, আব্দুল্লাহপুর, জিনজিরা, কালেন্দি ও রোহিতপুর এলাকার এমন ১৭টি কারখানায় বিশ্বের স্বনামধন্য ২৬ কোম্পানির নাম ও মোড়ক ব্যবহার করে ডুয়েট সেন্ট, কালারমি, হ্যাভাক, ফক্স, প্যানটিন-ডাভ-ক্লিয়ার শ্যাম্পু, পন্ডস স্নো, লোশনসহ বিভিন্ন প্রসাধনী তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি এখানে তৈরি হচ্ছে নিম্ন মানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, যা পরবর্তীতে পুরান ঢাকার নবাবপুর মার্কেটে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

বিদেশি মনে করে এসব ভেজাল ও নকল সামগ্রী দেশবাসী কিনে একদিকে যেমন প্রতারিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রসাধনী ব্যবহার করে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। ভোক্তা অধিকার রক্ষায় কোনো অভিযোগই আমলে নিচ্ছে না অসাধু ব্যবসায়ীরা। এলাকাবাসীদের অভিযোগ, ভেজাল সামগ্রী তৈরি কারখানাগুলো স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে নিয়মিত ঘুষ দিয়ে নকল ও ভেজাল প্রসাধনী তৈরি এবং বাজারজাত করে আসছে। তাছাড়া বিদ্যুতের সুইচ, সকেট, কাটআউট, অটোসার্কেট ব্রকাড ও তার কিনে বাসাবাড়ি ও কল কারখানায় ব্যবহার করায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা। ক্ষতি হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদের। 

নকল ও ভেজাল সামগ্রী তৈরিতে ঢাকার কেরানীগঞ্জকে বেছে নিয়েছে শতাধিক অসাধু ব্যবসায়ী। এ অঞ্চলের বিভিন্ন আবাসিক বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়েছে এসব কারখানা। গত তিন বছরে এসব এলাকায় র‌্যাবের (১০) অভিযান চালিয়ে ১৭টি কারখানাকে এক কোটি ১৫ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা ও ২৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। তাছাড়া কেরানীগঞ্জ মডেল থানা ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় র‌্যাব সদস্যরা বাদী হয়ে ৩৩টি মামলা দায়ের করেছেন।

র‌্যাব (১০) এর কোম্পানি কমান্ডার পিসি দুই এর দায়ীত্বরত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানায়, তাদের নিয়মিত অভিযানের কারণে এখন স্থান পরিবর্তন করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। শুধু বিদ্যুৎ ও প্রসাধনী সামগ্রীই নয়, তাদের কারখানায় তৈরি হচ্ছে শিশুখাদ্যও। 

এলাকাবাসীরা আরও অভিযোগ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার কাজিগাঁও এলাকায় বিশাল এক বিস্কুট কারখানায় ভারতীয় নামিদামি কোম্পানির হলোগ্রাম ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে সাফারি চকলেট, বিস্কুট, চুইংগাম ও জুস। ভেজাল খাদ্য খেয়ে মারাত্বক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। তাদের দাবি, এসব কারখানা বন্ধ করতে তারা কেরানীগঞ্জ মডেল থানা, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থাকা ও ঢাকা জেলা দক্ষিণ গোয়েন্দা শাখা ( ডিবিতে) একাধিক অভিযোগ করেও কোনো ফল পাননি।

সদ্য দায়িত্বে আসা কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান জানান, তিনি ভেজাল ও নকল খাদ্য ও প্রসাধনীর কারখানার তালিকা তৈরি করে মালিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন। নকল ও ভেজাল কারবারিরা দেশ ও জনগণের শত্রু। কোনোভাবেই তাদের ছাড় দেওয়া হবেনা। গত ২৪ জানুয়ারি তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এস এম সূচনা মেটাল, লিহিমা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, এমএস মেট্রো প্রডাক্টস ও মেহেদি কসমেটিকস ১৫ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা করেছেন। 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মোড়ক ব্যবহার করে সেন্ট, লোশনসহ বিভিন্ন প্রসাধনী তৈরি করে পুরান ঢাকার চকবাজারে পাইকারি দোকানের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মার্কেটে সরবরাহ করে আসছে এই ব্যবসায়ীরা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চকবাজারের ব্যবসায়ী মালিক সমিতির এক কর্মকার্তা বলেন, চীন থেকে বিশ্বের নামি কোম্পানির নকল হলোগ্রাম ও বিভিন্ন প্রসাধনীর মোড়ক অবৈধ উপায়ে দেশে আনে। সেগুলো দিয়েই নকল ও ভেজাল প্রসাধনীকে বিশ্বমানের পণ্যে রূপান্তরিত করা হয়। পুলিশ ও পোর্টের কাস্টম কর্মকর্তারা বিদেশ থেকে মোড়ক ও হলোগ্রাম আনা ও সরবরাহ বন্ধ করে দিলে নকল সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব হতোনা। 

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আবু ছালাম মিয়া জানান, নকল সামগ্রী প্রস্তুতকারীরা গোপনে ভেজাল ও নকল সামগ্রী তৈরি করে দেশবাসী প্রতারিত করছে। তাদের এসব অপতৎপরতা বন্ধ করতে বিভিন্ন অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ভেজাল সামগ্রী প্রস্তুত কারবারিদের জেল জরিমানাসহ তাদের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা দেওয়ায় বর্তমানে ভেজাল পণ্য ও প্রসাধনী তৈরি বন্ধ হয়ে গেছে।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি