সরকারিভাবে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও এখনো বৈষম্যের শিকার হয়ে বিবর্ণ জীবন কাটাতে হচ্ছে হিজড়াদের। তাদের ব্যাপারে আজও বদলায়নি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, বদলায়নি তাদের ভাগ্য। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্র অপমান, উপহাস, তাচ্ছিল্য আর নিগ্রহের শিকার অধিকাংশ হিজড়ার দিন কাটে অনেক কষ্টে।
তবে এসবের মধ্যেও শত কষ্ট-নির্যাতন ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সুশিক্ষিত হয়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের জারা ও সারা। ইত্তেফাক কার্যালয়ে এসে তারা তাদের জীবনকাহিনী তুলে ধরেছেন সম্প্রতি। তারা বলেন, হিজড়ারা সমাজের বোঝা নয়, সম্পদ। যে কোনো পেশায় এবং কাজে তারা পারদর্শী। হিজড়ারা বুদ্ধিমান, কর্মঠ ও পরিশ্রমী। নির্যাতন না করে ও অপমান না করে সুযোগ সৃষ্টি করে করে দিলে হিজড়ারা দেশ ও সমাজে অবদান রাখতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানান জারা ও সারা।
১৯৯৮ সালের ২৪ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন তৃতীয় লিঙ্গের জারা রহমান। তার বয়স এখন ২২ বছর। বাড়ি জয়পুরহাট সদরে। এক ভাই ও দুই বোন। জন্মের পর কেউ জানত না সে তৃতীয় লিঙ্গের। পড়ালেখা চলছিল খুবই ভালোভাবে। যখন অষ্টম শ্রেণিতে উঠেন, তখন তার শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয়। মেয়েলিভাবটা প্রকট হতে থাকে। বিষয়টি তার বাবা-মা বুঝতে পারেন। কিন্তু মেনে নিতে পারছিলেন না। সব সময় বাবা-মা তাকে বকাঝকা করে বলতেন, তুই ছেলে, মেয়ে হবি কেন? তাকে মারধরও করত বাবা-মা। নানাভাবে নির্যাতন করা হতো। নানামুখী নির্যাতন সহ্য করে জয়পুরহাট থেকেই ২০১৩ সালে এসএসসি পাশ করেন। ২০১৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ২০২১ সালে বিবিএ পাশ করেন। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্র্যাকের সহযোগিতায় এমবিএ করছেন জারা। ২০২১ সাল পর্যন্ত বাবা-মা পড়ালেখায় সহযোগিতা করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করে অর্থ আয় করছেন জারা। তার মতো আরো অনেক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে নানাভাবে সহযোগিতা করছে ব্র্যাক। শুধু তা-ই নয়, ব্র্যাকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি করছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হিজড়া। জারা রহমান তার জীবনের গল্প তুলে ধরে ইত্তেফাককে আরো বলেন, কোনো বাবা-মা যেন তার হিজড়া সন্তানদের নির্যাতন না করে। হিজড়াদের কাজে লাগালে দেশ ও সমাজ উপকৃত হবে।
তৃতীয় লিঙ্গের আরেক জন হলেন সারা চৌধুরী। তার বয়স ২৩ বছর। দুই ভাই ও এক বোন। খুলনার খালিশপুরে তার বাড়ি। ছেলে হিসেবেই বড় হয় সারা। ইত্তেফাক কার্যালয়ে এসে সারা বলেন, হাই স্কুলে ওঠার পরই তার শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয়। আর তখন থেকেই শুরু হয় নির্যাতন ও অবহেলা। সব জায়গায় তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। ঘর থেকে বের হলেই এলাকার মানুষ ঢিল ছোড়ে, গোবর ছুড়ে মারত। চুল কেটে দেওয়া হয়। সব নির্যাতন সহ্য করে পড়ালেখা চালিয়ে যান সারা। খুলনা থেকে এসএসসিও পাশ করেন। এক পর্যায়ে নির্যতন সহ্য করতে না পেরে ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য হন। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শ্যামলীর এক হিজড়া গুরুর কাছে থাকেন তিনি। এ সময় তার পড়ালেখা বন্ধ ছিল। তাকে দিয়ে শ্যামলী ও এর আশাপাশ এলাকায় রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করানো হতো। সেখান থেকে টাকা জমিয়ে আবার খুলনায় চলে যান। পরে ২০১৯ সালে খুলনায় এইচএসএসিতে ভর্তি হন। এইচএসসিতে বাণিজ্যে গতকাল সারা উত্তীর্ণ হয়েছেন। তার জিপিএ ৪.৯২। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাকে টু্যরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের ওপর বিবিএ করার সুযোগ দেবে। পড়ালেখা পাশাপাশি বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির খুলনা শাখায় ইয়ুথ লিডার হিসেবে চাকরি করছেন সারা। গতকাল তার আরেকটি চাকরি হয়েছে খুলনা এলাকায়। সারা চৌধুরী বলেন, হিজড়াদের প্রতি কেউ যেন নির্যাতন না করে। হিজড়ারাও মানুষ। হিজড়ারা সমাজের বোঝা নয়, সম্পদ। যে কোনো কাজ হিজড়ারা করতে পারেন। শুধু সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
