কাশফুল মেয়ে 

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:৩৩

আচানক ছবিটাতে তার চোখ আটকে যায়। পেজের ডানপাশে ভেসে উঠেছিল ছবিটা। ‘পিপল ইউ মে নো’—লেখাটার নিচে। সাদা কাশফুলের মাঝে তুলো মেঘ ভাসা আকাশের দিকে দুই হাত প্রসারিত করে আছে মেয়েটা। হাসছে। কী যে ভালো লাগল! সে মেয়েটার নাম দিল—কাশফুল মেয়ে। কাশফুল মেয়েটাকে সে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল।

তখনই একসেপ্ট। আর তখনই নিউজফিড-এ সেই ছবিটা। ৩০০০ লাইক। কত্তো কমেন্ট! স্বাভাবিক। এমন একটা ছবিতে কেন এত লাইক আসবে না? নারীর সৌন্দর্যে শুধু পুরুষ নয়, নারীও চিরকাল বিমোহিত। সেও লাইক দিল।

তারপর থেকে কাশফুল মেয়ের প্রতিটা ছবিতেই সে লাইক দেয়। কমেন্ট করে না কোনো। কী কমেন্ট করবে তা ভেবে পায় না যে। সে একসময় ভাবতে থাকে, একবার—শুধু একবার কাশফুল মেয়েটাকে সে ইনবক্সে নক করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনে সাহস আসে না। যদি কিছু মনে করে? 
কেটে যায় অনেকগুলো দিন। কয়েকটা বছর। তার শিক্ষাজীবন শেষ অসাধারণ সাফল্যের সঙ্গে। চাকরি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে। অনেক অনেক সুশ্রী মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করে সে। কিন্তু কাশফুল মেয়ের মোহ কাটে না তার। এদিকে বাবা-মা তার জন্য পাত্রী খুঁজছেন। সে আছে কাশফুল মেয়ের ঘোরের ভেতর।

একদিন। একদিন সে সত্যিই কাশফুল মেয়েটকে নক করল। লিখল: জানেন, আমাকে অ্যাড দেবার পর থেকে আপনার প্রতিটা ছবিতে আমি লাইক দিয়ে আসছি। সত্যি আপনি অনেক সুন্দর। আমি আপনার নাম দিয়েছি—কাশফুল মেয়ে।

কাশফুল মেয়ের কাছ থেকে কোনো প্রতিউত্তর এলো না। একটু পর নিউজফিডে কাশফুল মেয়ের একটা স্ট্যাটাস ভেসে এলো: ‘এইসব লুচ্চার দল ক্যামনে যে লিস্টে ঢুকে বুঝি না! ‘জানেন, আমাকে অ্যাড দেবার পর থেকে আপনার প্রতিটা ছবিতে আমি লাইক দিয়ে আসছি। সত্যি আপনি অনেক সুন্দর। আমি আপনার নাম দিয়েছি কাশফুল মেয়ে।’ এইগুলা ফেসবুকে আসছেই শুধু মাইয়া মানুষের ছবিতে লাইক দেওয়ার জন্য। আর মাইয়া মানুষের ইনবক্সে আতেলপনা করার জন্য।’
শুরু হয়ে গেল সেই স্ট্যাটাসে লাইকের বন্যা, কমেন্টের ঢল। কমেন্টগুলো এরকম—এই লুচ্চাটাকে কিক আউট করেন আপা। এইগুলার কোনো মান-সম্মান বইলা কিছু নাই। এইগুলা ফেসবুকে আসেই তো মাইয়া মাইনষের সাথে কথা কইতে। এইগুলার জন্য আমাগো সম্মান থাকে না। এইগুলা হইলো পুরুষ জাতির কলঙ্ক।...

তার তখন মনে হচ্ছিল, কে যেন হাজার জনতার মাঝে তার পিঠে সপাং সপাং করে চাবুক মারছে। আর তখনই নিউজফিডে ভেসে এলো কাশফুল মেয়ের আরেকটা ছবি। বৃষ্টি শেষে জাম আর জামরুলের পাতায় লেগে থাকা এক চিলতে রোদ্দুরের মতো হাসি লেগে আছে ঠোঁটের কোণে। চোখে একটু কাজল টেনেছে। চুলগুলো কিছুটা উদাস বাউল।

আবার শুরু হলো ছবিতে লাইকের বন্যা। পৃথিবীর তামাম ছেলে যেন তার ছবিতে লাইক দেওয়ার জন্য বসেই থাকে। 

সে মনে মনে বলল—কাশফুল মেয়ে, তোমাকে আরো একটা লাইক দিলাম। এই নাও। 
তারপরই তার রক্তের মধ্যে অচেনা এক শক্তি ও সাহস জেগে ওঠে। সে ইনবক্সে গিয়ে বলে—কাশফুল মেয়ে, তোমার ফোন নাম্বারটা দাও দয়া করে। আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই।
—কেন?
—কথা বলে আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
—কেন?
—কারণ, আমি তোমাকে ভালোবাসি। সব বাধা পেরিয়ে তোমাকে পেতে চাই।

সে সত্যিকারে কাশফুল মেয়েকে ভালোবাসে কি না তা বোঝার আগেই বলে ফেলল কথাটা। কাশফুল মেয়ে বলল, ভালোবাসো! সেটা ভালো কথা। আমাকে পেতে চাও নাকি ফেসবুকে তোমাকে আমি যে অপমান করলাম তার প্রতিশোধ নিতে চাও?
—প্রতিশোধ শব্দটা আমার অভিধানে নেই। 
—কী করো তুমি?
—আমি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। 
—আচ্ছা আচ্ছা...এতক্ষণ তুমি করে বলেছি...একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে...!
—না না, তুমি করেই চলুক।
—বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াও, আমি তোমাকে সফল মানুষ বলে ধরে নিতে বাধ্য হচ্ছি। কিন্তু আমাকে পেতে হলে সাহস লাগবে! আছে তোমার সেই সাহস?
—আছে বলেই মনে হচ্ছে। 
—আমার তা মনে হয় না। 
—পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
—বেশ তবে...এই আমার ফোন নম্বর...।

তারপর থেকে কাশফুল মেয়ের সঙ্গে তার নিয়মিত কথা হয় ফোনে। মুগ্ধ কাশফুল মেয়ে কণ্ঠে। মুগ্ধ কাশফুল মেয়ের শব্দ চয়নে। সেই কণ্ঠ আর চয়িত শব্দগুলো শুনতে শুনতে তাকে দেখার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। জোর করে চেয়ে নেয় কাশফুলের মেয়ের ঠিকানা।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে সোজা ছুটে যায় কাশফুল মেয়ের ঠিকানায়। দরজায় বেল টিপে অপেক্ষা। মিনিট কয়েক পরে খুলে যায় দরজা। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাতে একটা বই নিয়ে সুদর্শন এক প্রবীণ সামনে দাঁড়িয়ে। গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, কাকে চাই?
কাকে চাই তা সে জানে। কিন্তু তার নাম তো জানে না। তার নিজের দেওয়া নামটিই বলল—কাশফুল মেয়েকে...।

—কাশফুল...! আপনি ভার্সিটিতে পড়ান? রেবা বলেছিল কেউ একজন আসবে। আসুন আসুন...।
ড্রইংরুমে অপেক্ষা। বুকের ভেতর এক রকমের কাঁপন। চা-নাস্তা এলো। রেবার মা এলেন। ছোটভাই এলো। কত কথা তাদের সঙ্গে। কিন্তু রেবা কোথায়?
অবশেষে এলো। প্রথমে পর্দা ঠেলে সেই মুখ। আহা! কী মোহনীয়। নারীর মুখ এত কারুকাজময় হয়? এই মুখের কাছে জীবনানন্দের বনলতা সেনের মুখ হার মানতে বাধ্য। 
তারপর হুইল চেয়ারসহ পুরো শরীর। বাবা বললেন, একটি দুর্ঘটনায়...!

দুর্ঘটনা ওর শরীরের সব সৌন্দর্য শুষে নিয়েছে। শুধু নিতে পারেনি মুখের সৌন্দর্যটা। হুইল চেয়ারে করেই সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছে। একটি এনজিওতে কর্মরত। 
কিন্তু আসল কথায় তো আসতে হবে। বাবা-মা সরে গেলে রেবা বলল, কী, সাহস আছে...?
—আছে। অবশ্যই আছে।
—যেটাকে তুমি সাহস ভাবছ ওটা সাহস নয়, ওটা আবেগ। ভেবে দেখো, একমাস সময় নাও। এখনই সিদ্ধান্ত নিয়ো না।
কাশফুল মেয়েটা হুইলচেয়ার চালিয়ে চলে গেল পর্দার আড়ালে। 

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি