মা ও বর্ণমালা
জরিনা আখতার
মা ও বর্ণমালা যেন দুই অন্তরঙ্গ সহোদরা—
দুজনেই সর্বংসহা মৃত্তিকা ও বৃক্ষের মতো,
দুজনেই দৃঢ়চেতা যেন অটল পর্বত,
দুজনেই বেগবান যেন অবিরল ঝরনাধারা;
জন্মেই দেখেছি আমার মা
সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থেকেছেন,
জন্মেই দেখেছি আমার বর্ণমালা
বিরুদ্ধ বাতাসে বৃন্তচ্যুত হতে থেকেছে,
তবু বিনিদ্র রাত কাটিয়ে আমার মা
পবিত্র ভোরের প্রত্যাশা করেছেন,
তবু দুঃসহ সময় পেরিয়ে আমার বর্ণমালা
জন্মান্তরের প্রতীক্ষা করেছে,
না পারেনি কেউ আমার মায়ের চোখের
আরশিতে প্রতিবিম্বিত বর্ণমালাগুলো
হরণ করে নিতে,
না পারেনি কেউ প্রিয় বর্ণমালার বেষ্টনী
থেকে আমার মাকে অপসারিত করে দিতে,
নির্যাতন সয়ে সয়ে আমার মা আজ
মহীয়সী নারী,
নির্যাতন সয়ে সয়ে প্রিয় বর্ণমালা আজ
আমাদের চেতনার আকাশে
এক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র ।
গ্রেনেড
সোহরাব পাশা
বিষয় হতে পারে : মানুষ এবং ধান
চাষযোগ্য নিষ্কণ্টক একখণ্ড জমি
শকুনের ছায়াশূণ্য বিনয়ী আকাশ
প্রবল আহ্লাদে ফেটে-
পড়া-ভোরের ডালিমরোদ ভেজা বৃষ্টি
ওপাশের ছোট্ট জানালায় চোখের রঙিন হাসি
ঝরে পড়া অজস্র বকুল
কর্ষণে বর্ষণে কারো ভয় নেই
পেছনেই জ্বলজ্বলে অবাক সূর্যের
শহিদ মিনার
সুনিশ্চিত প্রতিরোধের ক্ষিপ্র গ্রেনেড—
তীব্র জ্বলে উঠবে
একটি দুপুর
অবিশ্বাস্য দুঃখী মানুষের শ্রেষ্ঠ কবিতা
সময়
আজাদুর রহমান
সময় তোমাকে কেটে
পার হয়ে যাচ্ছে।
সময়কে কাটাবার তুমি কেউ না!
সে কারো ধার ধারে না,
তুমি শুধু সহ্য করো
সময় তোমাকে কেটে যাক।
এই যে বৃষ্টিভেজা পোক্ত পেয়ারা,
ওর মনের দুঃখ কেউ বোঝেনি!
ভালোবাসা এমনই—
খণ্ড বিখণ্ড হবার
পরও কাতরাতে থাকে!
পৃথিবীতে আলাদা করে
ফাগুন বলে কিছু নাই
তুমি শুধু সহ্য করো
সময় তোমাকে কেটে যাক।
ছান্দসিক প্রবচন
শেলী সেনগুপ্তা
একুশটি গোলাপ হাতে কেউ বলেনি,
‘একুশেই ধরে রাখব তোকে,
দাঁড়িয়ে থাকব পঁচিশে,’
বলেনি,
শৈল্পিক দর্প শুধু তোকেই মানায়
আয়, কপালে এঁকে দিই চাঁদ-রঙা টিপ,
দেখেনি,
বালিয়ারিভাঁজ শাড়ির কুঁচি
লেপটানো কাজল, অবিন্যস্ত খোঁপা,
শুধুই দেখেছি
অঘোষিত ভালোবাসায় বর্ণিল প্রবাহ,
উত্সব শেষের চিহ্নে অমীমাংসিত ফিরে যাওয়া,
দেখেছি,
সমর্পণের সুখে নদীর বুকে শুয়ে থাকা
ফেনিল আর্তি...
সম্পাদিত ভাবনায়—
একুশেই দাঁড়িয়ে আছি আপন ঐশ্বর্যের আয়ুরেখার
ভরতনাট্যম ছন্দে...
একুশের প্রতীক্ষায়
নাজমুল লিপন
এখনো আকাশ ছড়ায়নি লাল,
শিমুলের পরাগে জমেনি শিশির,
পাতারা আড়মোড়া ভাঙেনি এখনো
অদম্য জোনাকিরা এখনো জ্বলছে
রাক্ষুসে চিতার মতো।
এলো কি একুশ?
নিঃশব্দে পাতি কান,
ফেব্রুয়ারির আবছায়া কুয়াশায়।
ভাইহারা বোনেরা কি এখনো তন্দ্রায়!
টইটম্বুর কুয়াশায় এখনো নেতিয়ে যায়নি আলো
স্বপ্নহীন তারকারা হাসছে মিটিমিটি।
ভেজা সর্ষের লেপ্টানো হলুদেরা এখনো গন্ধহীন।
শিয়রে হলুদ গাঁদা আর
কাপড়দানিতে কালো আলোয়ান
হাতে কবিতার খাতা,
প্রতীক্ষায় প্রভাতফেরির।
ডাক
দালান জাহান
পাতার আড়ালে মৃত ল্যাম্পপোস্ট
শহুরে রুটি নষ্ট করে নাম ধরে ডাকছে।
ট্রেন ছুটেছে ইন্দ্রিয়সুখ রেলের পাথর
নিষ্পাপ সুর দূরবর্তী বাড়িগুলো ডাকছে
লাল মেঘ মাখন বৃষ্টি বন্যহাতি
চিরুনি চিঁড়া কলাপাতা বেলকনিতে ঝড়
বনসাই! বনসাই নাম ধরে ডাকছে।
ঝাঁকড়া চুল ভূতের গলি
চিত্র সুখ মুদ্রণ মুখ ছাপাখানার পথ
শূন্যতা ছড়ানো হুদয় পুকুর
অন্ধকারের নিঃস্ব কুকুর
তর্জনী ডোবা ডুপ্লেক্স রাত
ফজরের আঙুল খসে খসে নাম ধরে ডাকছে।
