বিপন্ন বিস্ময়কর কবির লুকানো একটি ট্রাঙ্ক 

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:৫০

বেঁচে থাকতে জীবনানন্দ প্রকাশ করেছিলেন দুশোর একটু বেশি কবিতা, অথচ মৃত্যুর ষাট বছরে তাঁর একটি লুকানো ট্রাঙ্ক থেকে উদ্ধার হয় অসংখ্য অসূর্যম্পশ্যা কবিতা! রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি হলেন পঞ্চপাণ্ডবের অর্জুন। কিন্তু জীবদ্দশায় সমালোচনাকারীদের নির্মম কাঁটাছেঁড়ার যন্ত্রণা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর তাঁকেই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সইতে হয়েছে। 

জীবনানন্দের প্রথম কাব্য ‘ঝরাপালক’ প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। পরের বছরেই সজনীকান্ত তাঁর ‘শনিবারের চিঠি’র ‘সংবাদ সাহিত্য’ বিভাগে অশালীন ভাষায় জীবনানন্দের একের পর এক কবিতার উল্লেখ করে বিরূপ সমালোচনায় মেতে ওঠেন। সেখানেই শেষ নয়। সেই বছরেই ১৯২২ থেকে শুরু করে আসা সিটি কলেজের অধ্যাপনার চাকরিটিও চলে যায়। সেখানে সজনীকান্ত দাসের বিরূপ সমালোচনার সূত্রে কবির চাকরি থেকে বরখাস্তের কারণ হিসেবে তাঁর কবিতায় অশ্লীলতার অভিযোগটি চাউর হয়। অথচ জীবনানন্দ দাশের চাকরি চলে যাওয়ার মূলে ছিল সিটি কলেজের ছাত্রসংখ্যা কমে যাওয়া জনিত আর্থিক সংকট। সজনীকান্ত যেভাবে কবিকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন, তা শুধু তাঁর কবিতাকেই বিমুখতার সামনে ঠেলে দেয়নি, কবি-পরিচিতিকেও হুমকির মধ্যে ফেলেছিল। 

জীবনানন্দকে ছকবন্দি মূল্যায়নে আবদ্ধ করার প্রয়াসের মধ্যে তাঁর পরিচয় অবমূল্যায়নের শিকার হয়ে উঠেছিল। যদিও বুদ্ধদেব বসু, সঞ্জয় ভট্টাচার্য থেকে দীপ্তি ত্রিপাঠী প্রমুখের কিছু ইতিবাচক মূল্যায়ন ছিল। কিন্তু সব মিলিয়ে জীবনানন্দ দাশ এতটাই অন্তর্মুখী হয়ে পড়েন যে, তিনি যতটা লিখেছেন, প্রকাশ করেছেন তার খুব সামান্যই। আর এখানেই বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত হয়ে আছে জীবনানন্দের বিখ্যাত ট্রাঙ্ক। ট্রাঙ্ক তো নয়, যেন হীরের খনি! ১৯৪৬, ১৯৪৭ সালে যখন বরিশাল থেকে একেবারে স্হায়ীভাবে কলকাতা চলে আসেন কবি, অনেক অমূল্য জিনিসপত্র ফেলে আসতে হয়েছিল। কিন্তু সেই ট্রাঙ্কটি তিনি ছাড়েননি। জীবনানন্দ সম্পর্কিত বহু লেখায়, সাক্ষাত্কারে ঐ ট্রাঙ্কটির কথা পাওয়া যায়। 

অনেকেই বর্ণনা করেছেন একটি সাধারণ দৃশ্য—কবি ট্রাঙ্কটি খুলে বসে আছেন। কাগজ বার করে এক মনে কী যেন দেখে চলেছেন। কেউ এলেই মুহূর্তে সে-সব আড়াল করছেন। এমনকি স্ত্রীকে দেখেও লুকিয়ে ফেলছেন ট্রাঙ্কখানি। বহু নথি, লেখালেখি থেকে যেটুকু জানা যায়, তা হলো, প্রায় আড়াই হাজার কবিতার পাণ্ডুলিপি, একুশটি উপন্যাস, একশো আঠাশটি গল্প, আটাত্তরটি প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ব্যক্তিগত রচনা। প্রায় ছাপ্পান্নোটি খাতায় ঠাসা প্রায় সাড়ে চার হাজার পৃষ্ঠার ‘লিটারারি নোটস’ নামাঙ্কিত ডায়েরিধর্মী রচনা। চিঠি শ’য়েরও বেশি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সঙ্গে ট্রাঙ্কের পাণ্ডুলিপি মিলিয়ে গবেষকরা দেখেছেন—প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কবিতা অপ্রকাশিত! ট্রাঙ্কবন্দি ৪৮টি খাতার বাইরেও কবিতার পাণ্ডুলিপি আরো কোথাও নিশ্চয়ই থেকে গেছে! কারণ হিসেবে বলা হয়, প্রকাশিত অনেক কবিতার পাণ্ডুলিপি ঐ খাতাগুলোর মধ্যে নেই।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, কবিকন্যা মঞ্জুশ্রী দাশ অনেক খাতা হারিয়ে ফেলেছিলেন। এর পরেও তাঁর কাছে যাওবা ছিল, তা রক্ষা করেছেন কোনো এক সহৃদয় নারী। সেগুলো তিনি আবার কবির ভাই অশোকানন্দ দাশের পুত্র অমিতানন্দ দাশকে যথাসময়ে ফিরিয়েও দিয়েছিলেন। এজন্য আমরা দেখতে পাই, জীবিত কবির চেয়ে মরণোত্তর কবিই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালের মে-জুন মাসে তিনি লিখেছিলেন দুটি উপন্যাস ‘মাল্যবান’ ও ‘সুতীর্থ’। কিন্তু ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর তাঁর অকাল প্রয়াণের পর এ দুটি উপন্যাস প্রকাশনার আলোর মুখ দেখল। লেখার দু’বছরের মধ্যে এর একটি প্রকাশ পেলেও পেতে পারত, পায়নি। সেটা ১৯৫০ সালে ‘পূর্বাশা’ সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে লেখা একটা চিঠিতে ধরা পড়েছে। কবি লিখছেন—‘বেশি ঠেকে পড়েছি, সেজন্য বিরক্ত করতে হলো আপনাকে। এখুনি চার-পাঁচশো টাকার দরকার; দয়া করে ব্যবস্হা করুন। এইসঙ্গে পাঁচটি কবিতা পাঠাচ্ছি, পরে প্রবন্ধ ইত্যাদি (এখন কিছু লেখা নেই) পাঠাব। আমার একটি উপন্যাস (আমার নিজের নামে নয়—ছদ্মনামে) পূর্বাশায় ছাপতে পারেন; দরকার বোধ করলে পাঠিয়ে দিতে পারি, আমার জীবনস্মৃতি আশ্বিন কিংবা কার্তিক থেকে পূর্বাশায় মাসে মাসে লিখব। সবই ভবিষ্যতে, কিন্তু টাকা এক্ষুনি চাই—আমাদের মতো দু-চারজন বিপদগ্রস্ত সাহিত্যিকের এরকম দাবি গ্রাহ্য করবার মতো বিচার-বিবেচনা অনেক দিন থেকে আপনারা দেখিয়ে আসছেন—সেজন্য গভীর ধন্যবাদ।’

চিঠির ‘সবই ভবিষ্যতে’ কথাটা ব্যঞ্জনাময়। কত কিছুই যে লেখার পরিকল্পনা মাথায়, অথচ লেখা হয়ে গেছে এমন অজস্র কিছু সম্পর্কে কী নির্ভার! উদাসীন! তাঁর পাণ্ডুলিপির ছবি দেখলেই স্পষ্ট হয় তাঁর ঐ অপরূপ মরমি পঙ্ক্তিগুলো কত সচেতন কাটাকুটি পেরিয়ে, প্রায় সীতার মতো অগ্নিপরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে কবিতা-রূপ লাভ করেছে। জীবনানন্দ দাশের কবিজীবন পাঠ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়—প্রতিভা তো থাকতেই হবে, তারপরও কবি হওয়া কী ভয়াবহ কঠিন কাজ! 

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি