পানির দরে সবকিছু! এ কথার দিন যেন শেষ হয়ে আসছে। পানির দরও এখন অনেক চড়া। ঢাকা ওয়াসা ১৩ বছরে ১৪ বার বাড়িয়েছে পানির দাম। এখন আবার ২০ শতাংশ পানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে তারা। শুধু ঢাকা ওয়াসাই নয়, দুই মাসের মধ্যে আবারও পানির দাম বাড়াতে চায় চট্টগ্রাম ওয়াসা। রাজশাহী ওয়াসাও পানির দাম তিন গুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার প্রতি বছরেই রাজস্ব আয় বাড়লেও পানির দাম বাড়ানো থেমে থাকেনি। ওয়াসার দাবি, পানি উত্পাদনে ভুর্তকি কমাতেই তারা প্রতি বছর পানির দাম বাড়াচ্ছে। বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানির মূল্য ওয়াসাকে দিতে হয় ১৫ দশমিক ১৮ টাকা করে। আর বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ইউনিট প্রতি ইউনিট পানির মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে ৪২ টাকা করে। এর সঙ্গে যেসব এলাকায় ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন রয়েছে সেখানকার গ্রাহকদের এর দ্বিগুণ মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে।
২০০৯ সালে ঢাকা ওয়াসা আবাসিক গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানির মূল্য নিয়েছে ৫ টাকা ৭৫ পয়সা। এরপর প্রতি বছরই ঢাকা ওয়াসা ৫ শতাংশ হারে পানির দাম বাড়িয়েছে। ঢাকা ওয়াসা ২০০৯ সালের পর গত ১৩ বছরে ১৪ বার পানির দাম বাড়িয়েছে। দাম বাড়ালেও বাড়েনি পানির মান। বেশির ভাগ এলাকায় পানি নিয়ে এখনো বহু অভিযোগ ভোক্তাদের।
পানি থেকে গন্ধ ও ময়লা আসায় ফুটিয়ে পান করতে হচ্ছে। ২০১৬ সালে দুই বার পানির দাম বাড়ায় ওয়াসা। ২০১৭ সালে আবাসিক গ্রাহকদের ১০ টাকা থেকে ১০ টাকা ৫০ পয়সা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৩২ টাকা থেকে ৩৩ টাকা ৬০ পয়সা করা হয়। ২০১৮ সালে আবাসিকে ১০ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১১ টাকা ২ পয়সা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৩৩ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ৩৫ টাকা ২৮ পয়সা করা হয়।
সবশেষ গত বছরের জুলাই থেকে আবাসিকে ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা ১৮ পয়সা করা হয় এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪২ টাকা করা হয়। এখন আবার ২০ শতাংশ বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে আবাসিক ব্যবহারের জন্য প্রতি হাজার লিটার পানির দাম ১৫ টাকা ১৮ পয়সা। ওয়াসার প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ২০ শতাংশ দাম বাড়লে তা হবে সোয়া ১৮ টাকা। বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি হাজার লিটার পানির দাম ৪২ টাকা, ওয়াসার প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ২০ শতাংশ দাম বাড়লে তা হবে ৫০ টাকা ৪ পয়সা।
অথচ ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছরই সংস্থাটি মুনাফা করেছে। গত পাঁচ বছরে পানির দাম কয়েক দফা বাড়ানোর ফলে পানি সেবা থেকে প্রতিষ্ঠানটির আয়ও বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় ছিল ১ হাজার ১৫৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা। মুনাফা হয়েছিল ২২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সবশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় ১ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। আর মুনাফা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে ঢাকা ওয়সার এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খানকে পাওয়া যায়নি।
তবে কিছুদিন আগে তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, পানি উৎপাদনে ভর্তুকি দিতে হয়। উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বিনিময় মূল্য কম। ভর্তুকি হ্রাস করার জন্য আমরা পানির মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব করেছি।
দুই মাসের ব্যবধানে দাম বাড়াতে চায় চট্টগ্রাম ওয়াসা :
এদিকে, দুই মাসের ব্যবধানে পানির দাম বাড়াতে চায় চট্টগ্রাম ওয়াসাও। তাদের দাবি, তা না হলে সামনে চরম আর্থিক সংকটে পড়তে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার কোনো ধরনের ভর্তুকি দেবে না বলে জানিয়েছে। ওয়াসা নিজস্ব ক্ষমতাবলে গত জানুয়ারি থেকে ৫ শতাংশ পানির দাম বাড়িয়েছে। ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তার সঙ্গে প্রতি ১ হাজার লিটারে আরো তিন টাকা বাড়াতে চায় কতৃর্পক্ষ।
ওয়াসা কর্মকর্তারা জানান, পানির উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে খরচ বেড়ে গেছে। পানি উৎপাদন খাতে প্রতি মাসে প্রায় ১২ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। শুধুমাত্র বিদ্যুৎ খাতে মাসে ৭ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। বর্তমানে ১ হাজার লিটারে উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ২৪ টাকা। আর আবাসিকে গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রি করা হয় প্রতি ১ হাজার লিটারে ১৩ টাকা ২ পয়সা এবং বাণিজ্যিকে ৩১ টাকা ৮২ পয়সা।
চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, এখন ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে না বলে এখন আর্থিক সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু আগামী জুলাই থেকে তিনটি প্রকল্পের ঋণের টাকা পরিশোধ শুরু করতে হবে। আয় বাড়ানো না গেলে ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। বর্তমানে জনসংখ্যা অনুপাতে নগরীতে পানি দৈনিক চাহিদা ৫০ কোটি লিটার। আর ওয়াসা সরবরাহ দিচ্ছে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার। ওয়াসা পরিচালনা বোর্ড নিজস্ব ক্ষমতাবলে বছরে ৫ শতাংশ পানির দাম বাড়াতে পারে। গত জানুয়ারি থেকে ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর বেশি বাড়াতে গেলে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন নিতে হয়। ফলে পানির দাম বাড়াতে প্রস্তাব দেবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।
তিনগুণ দাম বাড়াচ্ছে রাজশাহী ওয়াসা :
রাজশাহীতে এক লাফে তিনগুণ বাড়ানো হচ্ছে পানির দাম। বেশি দামে পানি বিক্রি করে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এক লাফে তিনগুণ দাম বৃদ্ধি নিয়ে নগরীর জনমনে দেখা দিয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া।
রাজশাহী ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি ১ হাজার লিটার পানি উত্তোলন, পরিশোধন ও সরবরাহে ওয়াসার খরচ হয় ৮ টাকা ৯০ পয়সা। এতদিন আবাসিক সংযোগে প্রতি ১ হাজার লিটার পানির দাম ধরা হতো ২ টাকা ২৭ পয়সা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হচ্ছে ৬ টাকা ৮১ পয়সা। বাণিজ্যিক সংযোগের ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি থেকে হাজার লিটার পানির মূল্য ধরা হবে ১৩ টাকা ৬২ পয়সা। এখনো এই পানির দাম ৪ টাকা ৫৪ পয়সা। আবাসিক এবং বাণিজ্যিক উভয়ের ক্ষেত্রেই পানির দাম পুরোপুরি তিনগুণ বাড়ানো হচ্ছে।
রাজশাহী নগরীতে পানির চাহিদা প্রতিদিন ১১ কোটি ৩২ লাখ লিটার। তবে ওয়াসা ৯ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করতে পারে। ৭১২ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে এ পানি নগরীতে সরবরাহ করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকীর হোসেন বলেন, রাজশাহী ওয়াসা বোর্ড এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন নিয়েই পানির মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি থেকেই নতুন মূল্য কার্যকর হবে। এক লাফে তিনগুণ মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টাকে আমরা সেভাবে দেখছি না। সর্বশেষ ২০১৪ সালে পানির মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
দেশের অন্যান্য স্থানে পানির মূল্য এর চেয়েও বেশি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সমন্বয় করেই আমাদের মূল্য বৃদ্ধি করতে হচ্ছে। সুপেয় পানি নিশ্চিত না করে দাম বাড়ানোর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
