ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন জরুরি

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:০২

আমাদের দেশের খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এক সমস্যা। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে ঋণ গ্রহীতার কারণে যেমন কোনো একটি ঋণখেলাপি হয় তেমনি ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে ও কোনো ঋণখেলাপি হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে সব ধরনের খেলাপি ঋণের দায়ভার ঋণ গ্রহীতাকেই বহন করতে হয়। ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ঋণের মেয়াদ এবং পরিশোধিত কিস্তির পরিমাণ যেভাবে নির্ধারণ করা হয় তাও ত্রুটিপূর্ণ। 

বেশির ভাগ ঋণ গ্রহীতা অর্থের প্রয়োজন থাকায় ব্যাংক কর্তৃক আরোপিত সব শর্ত বিনা বাক্যে মেনে নেয় ঠিকই কিন্তু বাস্তবতার আলোকে ঋণ গ্রহীতা পরবর্তী সময়ে আর সেসব শর্ত পালন করতে পারেন না। যেমন কোনো কোম্পানিকে ৫০ কোটি ঋণ দিয়ে ৫/১০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে বলা হলে খুব কম সংখ্যক ব্যবসায়ীই এ ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হবেন। কেননা ব্যবসায়ীরা কখনোই এত বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়মমাফিক করে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন না। ব্যবসায়ীদের অর্থ সব সময় বিনিয়োগের মধ্যে থাকে। এ কারণে প্রদত্ত ঋণের মেয়াদ এবং কিস্তির পরিমাণ এমনভাবে নির্ণয় করতে হবে যাতে করে ঋণ গ্রহীতা সহজভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে খুব সহজভাবে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে এই ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করতে পারেন।

২০২১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, সেপ্টেম্বর/২২ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে ২০২১ সালে ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১২ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর ২২ শেষে ব্যাংক খাতে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৮.১২% খেলাপির খাতায় উঠেছে। ২০১৯ সালে দেশের ব্যাংক খাতের মোট খেলাপির পরিমাণ ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বর/২১ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৪ হাজার ১৬ কোটি টাকাই খেলাপি। বিতরণকৃত ঋণের ২০.০৭% খেলাপি। সেপ্টেম্বর/২২ এ বেসরকারি ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৯ লাখ ২৮ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫০ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা খেলাপি। যা বিতরণকৃত ঋণের ৫.৪৭% খেলাপি। তিনটি সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১১.৪৪%.। সেপ্টেম্বর/২১ মাসে বিদেশি ব্যাংকের খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। যা খেলাপি ঋণের ৪.১২%।

খেলাপি ঋণসংক্রান্ত অনিয়মগুলো বন্ধ করে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ সন্তোষজনকভাবে কমিয়ে আনতে হলে ব্যাংকিং খাতে ঋণ প্রদান এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। এগুলোকে আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে হবে। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, আমাদের দেশের খেলাপি ঋণ দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর ও অধিক সময় ধরে চলে আসা পুঞ্জীভূত সমস্যা। তাই রাতারাতি এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তদুপরি এটি একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কোনো একটি ব্যাংকের একার পক্ষে এখন আর তার খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান করা মোটেই সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সরকারের সক্রিয় সহযোগিতায় বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা।

খেলাপি ঋণ আদায়ে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বেশির ভাগ ব্যাংকার আইনি সহায়তায় ঋণ আদায় বুঝে থাকেন। দুই/একটি হলে পারা যায় কিন্তু দীর্ঘদিনের জমে থাকা বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ অর্থ আদালতের মাধ্যমে আদায় করা সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ হ্রাস না পেলে ব্যাংকের ঋণ প্রবাহের গতি বাধাগ্রস্ত হবে, ব্যাংকিং সেক্টর আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির চাকাও অচল হয়ে যাবে। তাছাড়া ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি।

—ব্যাংকার, কলামিস্ট

ইত্তেফাক/ আরাফাত