রাতের আতঙ্ক ‘উড়ন্ত’ ছিনতাইকারীরা

* রাজধানীতে অধিকাংশ ছিনতাই পুলিশের খাতায় হয়ে যায় চুরি, প্রতিকার পান না ভুক্তভোগীরা

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৪:২৬

দিনের বেলা ট্রাফিক সিগন্যাল, যানজটে আটকে থাকা বাস অথবা প্রাইভেট কারের খোলা জানালা পেয়ে ছিনতাইকারী মোবাইল ফোন অথবা ভ্যানিটি ব্যাগ হেচকা টান দিয়ে দৌড় দেয়। ছিনতাইকারী বা চোরকে আর শনাক্ত করা যায় না। দিনের আলোতে এমন ধরনের ছিনতাই হরহামেশাই ঘটে থাকে। পুলিশের খাতায় এসব ঘটনাকে চুরি হিসাবে নথিভুক্ত করা হয়। কিন্তু রাত যত বাড়তে থাকে, বিশেষ করে গভীর রাতে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোর পাশাপাশি অলিগলির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ছিনতাইকারীদের হাতে।

চলন্ত প্রাইভেট কার বা সিএনজির যাত্রীদের ছিনতাই করতে সুবিধা হয় না বলে ছিনতাইকারীদের টার্গেট থাকে রিকশা যাত্রীরা। হয়তো প্রধান সড়ক থেকে বাড়ির গলি রাস্তায় প্রায়ই রিকশায় যাতায়াত করেন অনেকেই। ছিনতাইয়ের শিকার কোনদিনই হননি। প্রাইভেট কার অথবা মোটরসাইকেলে করে ছিনতাইকারীরা হঠাৎ রিকশার গতিরোধ করে। গাড়ি থেকে নেমে ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে সর্বস্ব লুট করে। বাধা দিলে ছুরির নিচে পড়তে হচ্ছে অসহায় পথচারী বা রিকশা যাত্রীদের। এরপরই ছিনতাইকারীরা মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কার নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মধ্যরাতের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে আড়ালে চলে যায়। এ ধরনের ছিনতাইকারীদের পুলিশ বলছে, ‘উড়ন্ত’ ছিনতাইকারী।

নিকটস্থ টহল পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মিলছে না। যদিও ঘটনাস্থলের আশপাশে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ থেকে এসব ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করতে পারে পুলিশ। ভুক্তভোগীরা জানান, বেশির ভাগ ঘটনায় মামলার পরিবর্তে পুলিশ জিডি গ্রহণে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনার কথা বললে তাদেরকে বসিয়ে রাখা হয়। এরপর টহল টিম ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে দিয়ে এর সত্যতা নিশ্চিত করতে হয়। ভুক্তভোগীরা আরো জানান, গভীর রাতে বা ভোরে ফাঁকা স্থানে ছিনতাইয়ের পর পুলিশ তদন্ত করে কীভাবে নিশ্চিত হবে যে ঘটনা ঘটেছে? এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা মামলা তো দূরের কথা জিডি পর্যন্ত করতে আগ্রহ পান না।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) ফারুক হোসেন বলেন, ‘ছিনতাইয়ের শিকার কোনো ভিকটিম থানায় মামলা করতে চাইলে অবশ্যই এ ব্যাপারে মামলা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ওসিদের। কেউ যদি ছিনতাইয়ের মামলা নিতে না চায়, তাহলে পুলিশ কমিশনার এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয় ১৪৫টি, ২০২০ সালে ১৭৬টি, ২০১৯ সালে ১৫৫টি, ২০১৮ সালে ২১৬টি, ২০১৭ সালে ১০৩টি, ২০১৬ সালে ১৩২টি, ২০১৫ সালে ২০৫টি ও ২০১৪ সালে ২৬৫টি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর ৫০টি থানায় ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে মাত্র পাঁচটি। অথচ অভিযোগ অনুযায়ী ছিনতাইয়ের ঘটনা রয়েছে শতাধিক। পুলিশের খাতায় এসব ছিনতাইয়ের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে মোবাইল ফোন খুইয়ে ফেলার কারণে ভিকটিম পরবর্তী সময়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়ারি করেন। ফলে ছিনতাইয়ের ঘটনাটি চাপা পড়ে যায়।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর কাওরান বাজারের সার্ক ফোয়ারা মোড় সংলগ্ন বীর-উত্তম সিআর দত্ত রোড এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে জনি দাস (২২) নামে এক দোকান কর্মচারী আহত হন। সুন্দরবন হোটেলের সামনে এই ঘটনা ঘটলেও ঘটনাস্থল থেকে কলাবাগান থানার দূরত্ব মাত্র ২০০ মিটার। এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। আহত জনি জানান, তিনি ফার্মগেটে একটি দোকানের কর্মচারী। রাত ১০টার দিকে দোকান থেকে হাতিরপুলে আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার সময়? সুন্দরবন হোটেলের সামনের মোড়ে চার-পাঁচ জন ছিনতাইকারী তার ফোন ছিনিয়ে নিতে চায়। বাধা দিলে ছুরিকাঘাত করে। এ ঘটনায় কলাবাগান থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে একটি জিডি গ্রহণ করে।

রিয়াজ হাওলাদার (৩৮) ব্যবসার উদ্দেশ্যে ৮০ হাজার টাকা সঙ্গে নিয়ে গত ৭ ফেব্রুয়ারি কাওরান বাজার পুলিশ বক্স ও বোরাক টাওয়ারের সামনে বিকাল আনুমানিক সোয়া ৫টার দিকে একটি বাসে ওঠেন। অল্প সময়ের মধ্যেই দেখেন তার সঙ্গে থাকা ৮০ হাজার টাকা নেই। দুর্বৃত্তরা সেই টাকা নিয়ে গেছে দাবি করে তেজগাঁও থানায় একটি অভিযোগ দেন।

শুধু কাওরান বাজার নয়, রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে এ ধরনের ছিনতাইকারী গ্রুপ সক্রিয়। বিশেষ করে পান্থপথ, আড়ং ক্রসিং, আসাদ অ্যাভিনিউ, শ্যামলী, ধানমন্ডি-১৫, কলাবাগান, আগারগাঁও, ফার্মগেট, মিরপুর-১০, মিরপুর-২, কাজীপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া, পল্টন, মতিঝিল, মৌচাক, মগবাজার, কাকরাইল, যাত্রাবাড়ী, দয়াগঞ্জ, ওয়ারী, ফকিরাপুল, রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা জসীমউদ্দীন রোড এবং আব্দুল্লাহপুর এলাকায় এরা বেশি সক্রিয়।

সিসি ক্যামেরা অকার্যকর :গুলশান, বনানী, বারিধারা ও ধানমন্ডি এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সিসি ক্যামেরা রয়েছে। এসব সিসি ক্যামেরা ঐসব হাউজিং সোসাইটির পক্ষ থেকে স্থাপন করা হয়েছে। আবার প্রায় প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের প্রবেশ গেটের সামনে সিসি ক্যামেরা রয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, একটি চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনা শনাক্ত করতে গেলে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ প্রয়োজন হয়। অনেক অ্যাপার্টমেন্টের সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করতে গেলে দেখা যায় যে সেটি পূর্ব থেকে অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। এরকম ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) ফারুক হোসেন জানান, ‘সংশ্লিষ্ট থানা এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরা চেক করবেন থানার ওসি। প্রতিটি সিসি ক্যামেরা সচল থাকতে হবে। স্থানীয় কমিউনিটি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাড়া ও মহল্লার বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্টের সিসি ক্যামেরাগুলো পুলিশ পরীক্ষা করবে।’

ইত্তেফাক/এমআর