‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির...’ 

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৪:৪৫

প্রবাসে বিশেষভাবে আলোকিত মানুষ আব্দুল কুদ্দুসের ৮০তম জন্মদিনটি মহিমান্বিত করতে চেয়েছিলেন লন্ডনের ‘পূরবী বাঙালি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’-র সদস্যবৃন্দ। সংকলন করা হয় তাঁকে নিয়ে এই সম্মাননাগ্রন্থ। বইটি প্রকাশ হলো বটে, কিন্তু তা দেখার আগেই প্রিয় মানুষটি হয়ে ওঠেন অনন্তলোকের পাখি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে কৃষি অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন আব্দুল কুদ্দুস। ছাত্রজীবনেই জড়িয়ে পড়েন বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে। এরপর বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। যোগ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড যান ১৯৭২ সালে। লীডস বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরাল গবেষণা শুরু করেও অনেকটা আদর্শিক কারণেই তা ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু সেখানে থিতু হলেও নিজেকে কখনো শেকড়-বিচ্ছিন্ন করেননি। মনেপ্রাণে ধারণ করেছেন বাংলাদেশকে। জীবিকার জন্য যোগ দিয়েছেন লীডস সিটি কাউন্সিলে। লীডসে বাংলা স্কুল এবং হাই স্কুলগুলোতে বাংলা জিসিএসই আর এ-লেভেল চালু করার ব্যাপারে তিনি পালন করেন অগ্রণী ভূমিকা। অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুকিশোর, তরুণ-তরুণীদের পড়াশোনার সুযোগ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকে পিছিয়ে পড়া শ্বেতাঙ্গ জনগণের শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন আমরণ।

সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার-কণ্ঠ। তিনি মনে করতেন—সুস্হ সাংস্কৃতিকচর্চাই কেবল পারে মানুষের মন থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদকে সরিয়ে রাখতে। আর তাই গড়ে তোলেন ‘পূরবী বাঙালি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’, পালন করে গেছেন সভাপতির দায়িত্ব। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সংগঠন তাঁরই নেতৃত্বে গোটা ইংল্যান্ডে জনপ্রিয় করে তুলেছে বাংলা ভাষাকে, বাংলা সাহিত্যকে, বাংলা সংস্কৃতিকে। তিনি নিজেও কবিতা আবৃত্তি করেছেন, অভিনয় করেছেন নাটকে। মুখস্থ রাখতেন রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতা। অবলীলায় আবৃত্তি করতেন—‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,/জ্ঞান যেথা মুক্ত, সেথা গৃহের প্রাচীর...।’ তাঁর লক্ষ্য ছিল—ব্রিটেনে বড় হওয়া শিশুদের ভেতর ঐশ্বর্যময় বাংলা সংস্কৃতির বীজ বপন করে দেওয়া। 

এ বইতে স্ত্রী পারভীন আখতার রেশমা, কন্যা অর্চি কুদ্দুস (সুপ্তি) ও জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা অধ্যক্ষ মো. ফজলুল হকসহ অর্ধ শতাধিক মানুষ লিখেছেন তাঁকে নিয়ে। ভূষিত করেছেন ‘প্রকৃতিপ্রেমিক’, ‘ভ্রমণরসিক’, ‘জ্ঞানবুভুক্ষু’ নানা বিশেষণে।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক এবং ‘মুক্তির গান’-এর শিল্পী মাহমুদুর রহমান বেণু লিখেছেন, ‘আব্দুল কুদ্দুস প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশের যে কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সবসময় সংগঠিত হয়ে সেসব আন্দোলনে প্রতিবাদমুখর থেকেছেন এবং নৈতিক সমর্থন জুগিয়েছেন।’

নজরুলসংগীত-শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল লেখেন, ‘জীবনে এমন সজ্জন, সদালাপী ও বিনয়ী মানুষ খুব বেশি দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। কিন্তু মানুষটার নিখাঁদ ভদ্রতার আড়ালে রয়েছে অনড় নীতিবোধ, সততা এবং গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা।’ 

‘আলোকিত মানুষ আব্দুল কুদ্দুস’ সম্মাননাগ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন বিপ্রদাস রাজবংশী ও শওকত আহমেদ। প্রকাশ করেছে ঢাকার প্রকাশনা সংস্হা শিল্পৈষী। 

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি