‘আলাদিনের গ্রামে’ একদিন 

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৪:৫৩

কাঠামোগত দিক থেকে কবিতা নানারকম। যুগে যুগে কবিরা কবিতার বৈশিষ্ট্য ও কাঠামোতে পরিবর্তন এনেছেন বলে জানি। আর এও জানি যে, উত্তরাধুনিকতা আগের সবকিছুকে ভাঙতে চায়। সম্ভবত সমগ্রকে ভেঙে খণ্ডিতভাবে বিশ্লেষণ করতে চায় এই উত্তরাধুনিকতা। এবং সে কাঠামো চায় না, চায় সংস্কার। কেন তা? কারণ হিসেবে যুক্তি দেখানো হয়, কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভিতর থেকে প্রকৃত অর্থকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়, কেননা প্রকৃত অর্থ লুকিয়ে থাকে গহিনে। আর সেই অর্থকে খুঁজতে হলে কাঠামোকে ছাড়িয়ে যেতে হবে।

কিন্তু শূন্য দশকের কবি আলতাফ শাহনেওয়াজের ‘আলাদিনের গ্রামে’র কবিতা পড়ে মনে হয়েছে, সব সময় অর্থ পেতে কাঠামো ভাঙতে হয় না! তাঁর কবিতাগুলো শব্দ আর ভাবের এমন এক ব্যঞ্জনার মিশেল, যা প্রচলিত কাঠামো ভেঙে তৈরি করেছে ভিন্নতর নতুন এক কাঠামো। এখানেই এ কবির শক্তির প্রকাশ। আর কবিতা তো হচ্ছে আসলে একজন কবির উপলব্ধির বিশেষ রূপ। তাঁর কবিতাগুলোতে সেঁটে থাকে চমত্কারিত্ব—যার শুরুটা হয় হুটহাট, তবে তা গভীর কোনো কিছু বলতে চায়। যেমন

— ‘গুমোট মেঘের মতো চেনা ছদ্মবেশে
বিজনে বাড়ন্ত এই তেজপাতা গাছে
মৃতু্য বিঁধে আছে—নীল। তাকে দেখেছিলে
আরব্য রজনী খুঁড়ে। দর্পণ কাঁপিয়ে
এসেছে সে নিরিবিলি: ‘এক গ্লাস পানি
এ যুদ্ধে সমরপতি’—বিষণ্ণ কথাটি
বলেই মন্থর পায়ে চলে গেছে একা,
মরু-তরবারি নিয়ে আবার ফিরেছে।
তুমি তাকে বেশ চেনো। যে বোন মরেছে
তোমার চোখের পাশে, সেখানে দাঁড়িয়ে
কামরাঙা খেয়েছিল ওই উজবুক।
কেঁদেছ সেদিন খুব? নাকি অশ্রুক্লান্ত
ঘুমোয়নি বহুকাল। তোমাদের ঘরে
জগৎ-সংসার আজ কী লেখে বিকেলে?’

কবি আলতাফ শাহনেওয়াজ তাঁর কবিতায় প্রচলিত কাব্যভাষা ব্যবহার করেননি। খুব লক্ষ করলে বোঝা যায়, তিনি যেসব উপমা এবং চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন সেগুলোও বেশ চেনা। কিন্তু তাতে অচেনা গাম্ভীর্যের কোনো ঘাটতি নেই। তাঁর কবিতায় আঙ্গিকের রীতিসিদ্ধ বাধ্যবাধকতা থাকে না, থাকে অজস্র ছেঁড়া-ছেঁড়া চিত্রকল্প, যা সৃষ্টি করে এক অন্যরকম মায়াজাল।

এ কাব্যে অন্তরসুরের ভাষা বেশ সহজ, প্রকাশভঙ্গিতে বিশেষ একটা ঝনঝন শব্দ যেন ঘিরে থাকে। আর এসবই পাঠককে মোহগ্রস্ত করে রাখে। প্রায় প্রতিটি কবিতায় পাওয়া যায় বহুরৈখিকতার টান। কবি যা লিখেছেন, তাতে আছে ব্যাখ্যা ও যুক্তির অতীত সৌন্দর্য, যা আমাদের আন্দোলিত করে। তাঁর কবিতা কেবল নিছক কয়েকটা শব্দ কিংবা পঙ্কতি নয়, এগুলো কখনো কখনো কালের সারমর্ম হয়ে সামনে আসে। যেমন— 

‘দেহে আরো গিরিখাদ। গভীর পর্বতে
ভেতরে হারালে পথ, ও ভাস্কো দা গামা,
পর্তুগিজ এসেছিল। ম্যাপ হাতে তারা
দূরের মোকাম খোঁজে—সেই দেশ কোথা!
তোমামধ্যে সৌরবর্ষ। হেথা ঘোরে দীন,
আড়ালে ফুটিল দেহ...তরি ভেসে যা’

কবি আলতাফ শাহনেওয়াজ কিছুদিন আগে এক আলোচনাচক্রে জানিয়েছেন, ‘২০১২ বা ২০১৩ সালের দিকে এটি (আলাদিনের গ্রামে) লেখা। জীবনের বিমূর্ত সময়ে এই বইয়ের কবিতাগুলো আসে। আমার শুধু একটা জিনিসই মনে হচ্ছিল—এই নগর, এই শহর মানুষের যেটা কেড়ে নেয়, সেটা হচ্ছে তার মুখের ভাষা। আর এই জায়গাটি থেকে আমি আলাদিনকে দেখতে চেয়েছি।’ আসলে একজন কবি যখন তাঁর সর্বময় অন্তর্নিহিত চাওয়াকে কয়েকটি লাইন লিখে বোঝাতে সক্ষম হন, তখনই তা হয়ে ওঠে সার্থক শিল্প, আমরা যাকে আদর করে কবিতা নামে ডাকি। ‘আলাদিনের গ্রামে’র কবিতাগুলো এই তুলাদণ্ডে নিশ্চয়ই সার্থক—যা পাঠের পর পাঠকের মনে আসে বাঁধভাঙা জোয়ার।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি