ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি উপেক্ষা করে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ অভিযান পরিচালনা করছেন। ইতিমধ্যে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে প্রবেশ করেছে রুশ সেনারা। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরেও চলছে তুমুল লড়াই। খুবই ভেবে-চিন্তে ইউক্রেনে সামরিক অভিযানে নেমেছেন পুতিন। এক্ষেত্রে সবার একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন কখনোই কোনো যুদ্ধে হারেননি।
গত দুই দশকে রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকাকালে পুতিন চেচনিয়া সংঘাত-পরবর্তী পরিস্হিতি, জর্জিয়া, সিরিয়া ও ক্রিমিয়ায় সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্যে সফল হয়েছেন। যা তার প্রতি রুশ জনগণের আস্হা বাড়িয়েছে এবং বিশ্ব সতর্ক দৃষ্টিতে দেখেছে। ইউক্রেনেও তার পদক্ষেপের ফল ভিন্ন হবে না।
গত কয়েক মাস ধরে ইউক্রেন সীমান্তে সেনা জড়ো করেছে রাশিয়া। পশ্চিমারা বারবার সতর্ক করে বলেছে, ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন আসন্ন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে কয়েক দশকের মধ্যে ইউরোপে স্হলযুদ্ধ শুরু করে রাশিয়া। যা অনেক ইউক্রেনীয় নাগরিকের জন্য হতবাক করার মতো বিষয়। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ইউক্রেনের কয়েকটি শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে রাশিয়া। রাজধানী কিয়েভ এখন পতনের মুখে। তার এই সামরিক অভিযান ইউরোপে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রুশ সামরিক আগ্রাসন ইউক্রেনে রাজনৈতিক সমঝোতার পথ উন্মুক্ত করবে। যার মাধ্যমে একটি রুশপম্হি সরকার ইউক্রেনের ক্ষমতায় বসবে। ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনস্কি রাশিয়াকে আলোচনায় বসার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তাতে সাড়া দিয়েছেন পুতিন। যদিও ইউক্রেনের ‘নিরপেক্ষতা’ শর্ত দিয়ে রেখেছে ক্রেমলিন। এর অর্থ ইউক্রেন সেনামুক্ত হবে এবং প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না। এই বৈঠক সফল হলে পুতিন হয়তো সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেবেন। তবে তখন এটি হবে পশ্চিমাদের জন্য একটি বড় অবমাননাকর ধাক্কা। এছাড়া পুতিনের এই সামরিক অভিযান সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত সেসব দেশের জন্য বড় সতর্কবার্তা হবে, যারা ন্যাটোতে যোগদানের আশা করছে।
মস্কোভিত্তিক পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক সাময়িকী গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের প্রধান সম্পাদক ফিওডোর লুকিয়ানভ বলেন, সোভিয়েত পরবর্তী পূর্ব ইউরোপের স্টাটাস কুও বা স্হিতিবস্হা পুতিন কখনোই মানতে পারেন না। এটি পুতিনকে কুরে কুরে খায়। তিনি মনে করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পশ্চিমারা রাশিয়ানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পুতিন ইউক্রেন দখল নয় বরং রুশপম্হি সরকার বসাতে চায়। বেলারুসের মতো ইউক্রেনেও একটি পুতুল সরকার চায় রাশিয়া। এর মাধ্যমে পুতিন রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে একটি নতুন নিরাপত্তা বিধান রচনা করতে চান। এখন সারা বিশ্বের নজর পুতিনের দিকে। যেমনটা সোভিয়েত আমলের সব সেক্রেটারি জেনারেল পেতেন।
সামরিক অভিযানের ঘোষণাকালে পুতিন বহির্বিশ্বকে সতর্ক করে বলেছেন, এক্ষেত্রে কেউ হস্তক্ষেপ করলে তাত্ক্ষণিক জবাব পাবে। যে জবাব তারা ইতিহাসে দেখেনি। রাশিয়া আবার লাইমলাইটে ফিরে এসেছে। তারা বিশ্বকে দেখাচ্ছে যে রাশিয়া এখনো বিশ্বের বড় সামরিক শক্তি। পুতিন আসলে চান যে, বিশ্বে সব সময় রাশিয়ার কমান্ডিং সম্মান বজায় থাকবে।
লুকিয়ানভের মতে, রাশিয়ার প্রতি কমান্ডিং সম্মান না থাকলে কমান্ডিং ভীতি থাকতে হবে। ন্যাটোর সাবেক ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল রোস গোটেমোয়েলার মতে, মিশন সফল হয়েছে। সেই মুহূর্ত আমি দেখতে পাচ্ছি।
পশ্চিমারা রাশিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। কিন্তু এসব নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা এখনো অস্পষ্ট। এই নিষেধাজ্ঞার তাত্ক্ষণিক প্রভাব এড়াতে পুতিন আগেই ব্যবস্হা নিয়ে রেখেছেন বলে মনে করা হয়। বর্তমানে রাশিয়ার কাছে ৬৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মুদ্রা রিজার্ভ রয়েছে। তেল ও গ্যাস থেকে প্রতি মাসে তারা ১৪ বিলিয়ন ডলার পাচ্ছে।
অথচ ২০ বছর আগে রুশ সেনাদের বেতন দিতে সরকারের ধঁুকতে হয়েছিল। সে বিপর্যয় এড়িয়ে শৃঙ্খলা এনেছেন পুতিন। তিনি চেচনিয়ার মুসলিম বিদ্রোহীদের দমন থেকে জর্জিয়াকে দুই ভাগ করেছেন সফলভাবে। ২০১৪ সালে সামরিক অভিযান চালিয়ে ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়াকে নিজের ভূখণ্ডে যুক্ত করেছেন। ইউক্রেনের দুইটি অঞ্চল দোনেত্স্ক ও লুহানস্ককে কয়েক দিন আগেই স্বাধীন ঘোষণা করেছেন। সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছে। বিদ্রোহী এমনকি জঙ্গিদের তহবিল দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে পুতিন রুশ সেনাদের পাঠিয়েছেন আসাদকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে। আসাদ এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছেন।
সামরিক শক্তির বিচারে রাশিয়ার কাছে টিকে থাকার কথা নয় ইউক্রেনের। পশ্চিমারা ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়ানোর সম্ভাবনা নেই। তাই এবারের যুদ্ধেও পুতিন জিতবেন সেটা সহজেই অনুমেয়।
