বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘ফিরে দেখি, চার যোদ্ধার মাথার খুলি পড়ে আছে’

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২২, ০১:৫৪

‘১৯৭১ সালের শুরুতে আমি সিলেটের মদন মোহন কলেজে বিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ২৬ মার্চ ভোরবেলা প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ পেলাম। আমরা গেটের কাছে গিয়ে দেখি আর্মির গাড়ি আমাদের গলিতে ঢুকছে। আমিসহ পাঁচজন তখন একটা বাসায় লজিং থাকতাম। দ্রুত আমরা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলাম। সামনে দিয়ে আর্মিরা চলে গেল।

পরে জানলাম ওরা সামনে একটা ব্যাংক ছিল, ওটা লুট করতে গেছে। এভাবেই আতঙ্কের মধ্যে কয়েক দিন কেটে গেল। চার-পাঁচ দিনের মধ্যে সিলেট মুক্ত হয়ে গেল। আর্মিরা পিছু হটেছে। কিন্তু কয়েক দিন যেতেই আবার সংঘবদ্ধ হয়ে আর্মিরা আক্রমণ শুরু করল। তখন শহরে থাকাই মুশকিল হয়ে গেল। সবাই শহর ছেড়ে দিচ্ছেন। আমরা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা যেখানে থাকতাম সেখান থেকে দুটি পথ দুদিকে গেছে। একটি আমার গ্রামের বাড়ি বানিয়াচংয়ের দিকে, আরেকটা সুতারকান্দি বর্ডার দিয়ে ভারতের সীমান্তের দিকে। আমি বাড়ি না গিয়ে ভারত সীমান্তের দিকেই রওনা হলাম। ভারতে পৌঁছে আবুল কালাম আজাদ হাইস্কুলে উঠলাম। তিন-চার দিন পর আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী এমপি সেখানে এলেন। আমরা তাকে জানালাম, আমরা যুদ্ধে যেতে চাই। তখন উনি আমাদের নাম লেখাতে বললেন।’

ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতির কথা বলছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল (অব.) নিরঞ্জন ভট্টাচার্য্য। তিনি বলেন, ‘আমরা যে কয়েক জন ঐ দিন নাম লেখালাম, আমাদের করিমগঞ্জ নিয়ে গেল। সেখানে সাত দিনের প্রশিক্ষণ নিলাম। সেখানকার ইন্দ্রনগরে তিনটা ক্যাম্প করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল। মূলত অস্ত্র কীভাবে চালাতে হয়, কীভাবে রেডি করতে হয় সেইসব প্রশিক্ষণই দেওয়া হয়। ৯ মে আবারও প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো শিলচর শহরের অদূরে ইন্দ্রনগরে প্রতিষ্ঠিত ২ নম্বর ক্যাম্পে। এখানে ক্ষুদ্র অস্ত্র, গেরিলা যুদ্ধসহ নানা ধরনের যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণ শেষে তাদের কয়েক জনকে ৪ নম্বর সেক্টরের কুকিতল ক্যাম্পে পাঠানো হয়। এখানে কয়েকটি ছোট অপারেশনে অংশ নেওয়ার পর একদিন তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলো এইচএসসি পাস করা কে কে সেখানে আছে। তাদের উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ঐ রাতেই তাদের ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়। মাছিমপুর সেনানিবাসে নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা নেওয়া হয়। সব পরীক্ষার পর আমাদের ৬১ জনকে চূড়ান্ত করে। সাড়ে তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ৯ অক্টোবর আমাদের পাসিং আউট হলো। আমরাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্যাচ। প্রশিক্ষণ শেষে আমাকে আবার ৪ নম্বর সেক্টরেই পাঠানো হলো।’

এবার সরাসরি যুদ্ধে যাবার পালা। সম্মুখসারির এই যোদ্ধা বলছিলেন, ‘লেফটেন্যান্ট পদে যুক্ত হয়ে ৪ নম্বর সেক্টরে ফিরে দায়িত্ব পেলাম বারপুঞ্জি সাব সেক্টরে। তখন আমার কমান্ডার ক্যাপ্টেন এম এ রব। আমি আসার কয়েক দিন মধ্যেই সবকিছু আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন। তখন আমি কোম্পানি কমান্ডার। মূলত কমান্ডারের কাজই করতে হচ্ছিল। বারপুঞ্জিটা ছিল বিয়ানীবাজারের ঠিক উলটোদিকে। তখন প্রতিদিনই আমরা দেশে ঢুকতাম, ছোটখাটো কিছু অপারেশন করে আবার ফিরে যেতাম। মূলত গুলি করে, বোমা মেরে পাকিস্তানি সৈন্যদের ব্যস্ত রাখতাম। ১৪ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত এভাবেই চলেছে। এরপর নির্দেশ এলো এভাবে নয়, এবার সরাসরি অপারেশনে যেতে হবে। ততদিনে কমান্ডার এম এ রব ফিরে এসেছেন। তিনি ক্যাপ্টেন থেকে মেজর পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। সবকিছু গুটিয়ে বারপুঞ্জি থেকে জালালপুর যেতে হবে। সেখানে এম এ রব ছাড়া সেক্টর কমান্ডার সি আর দত্ত উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই ৪টি কোম্পানিকে একত্রিত করা হলো। ফলে আমরা বেশ শক্তিশালী হলাম। অপারেশনের জন্য প্রস্তুত আমরা।’

নিরঞ্জন ভট্টাচার্য্য বলছিলেন, ‘৮ নভেম্বর আমরা ১ হাজার ফোর্স নিয়ে দেশের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। আটগ্রামে যাওয়ার পথে গোটাগ্রামে আমার কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হলো অ্যামবুশ অপারেশনের। একদিকে ধানখেত, অন্যদিকে কিছু গাছ। এই গাছের আড়ালেই আমরা অবস্থান নিলাম। তখন দেখি, পাকিস্তানি আর্মির ৩০-৩৫ জনের একটা কনভয় এদিকে আসছে। তারা যখন খুব কাছাকাছি আমরা অপারেশন শুরু করি। ওরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগে সবাইকে গুলি করতে সক্ষম হই। এই খবর পাকিস্তানি আর্মির অন্যদের কাছে পৌঁছালে ঐ দিন তারা তিনটা অপারেশন চালায়। প্রতিটা অপারেশনেই আমরা তাদের সঙ্গে সরাসরি ফাইট করি। এই অপারেশনের নাম ছিল গোটা গ্রামের যুদ্ধ। রাতে নির্দেশ এলো জালালপুরে ফিরে যাওয়ার। ১০ নভেম্বর আমরা আবার ফিরে গেলাম। এরপর ২০ নভেম্বর ছিল ঈদের দিন। আমাদের কাছে সিদ্ধান্ত এলো ২১ নভেম্বর ভোরে অপারেশন শুরু করতে হবে। এর আর পিছু হটা নয়, পাকিস্তানি সৈন্যদের মেরে জায়গাও দখল করতে হবে। এখন শুধু এগিয়ে যাওয়ার পালা। আমার দায়িত্ব পড়ল কানাইঘাটের সালামের টিলা দখলের। সকালেই আমরা অপারেশন শুরু করলাম। এক ঘণ্টার মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ করে ওই টিলা দখলে নিলাম। এরপর আস্তে আস্তে লুবাছড়া চা-বাগান এলাকা দখলে নিলাম। তখন আমরা এলাকা ক্লিয়ার করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকলাম। তিন-চার দিন লাগল পুরো এলাকা ক্লিয়ার করতে।’

ফ্রন্টলাইনের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলছিলেন, ‘৩ ডিসেম্বর আমরা কানাইঘাট দখলে নিতে আক্রমণ শুরু করলাম। সারা রাত যুদ্ধ করে পরদিন আমরা কানাইঘাট ঢুকলাম। এই যুদ্ধে আমাদের ১১ জন শহিদ হন। আরো ২০ জন গুরুতর আহত হন। ৭ ডিসেম্বর আমরা সিলেটের উদ্দেশে রওনা করলাম। কিন্তু পথের মধ্যে হরিপুর গ্যাসফিল্ডে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শক্ত পাহারা ছিল। আমাদের সঙ্গে তখন মিত্রবাহিনীর ফোর্সও ছিল। আমাদের এই কনভয়ে গুরখা ইউনিট ছিল। হরিপুর থেকে কিছু দূরে মানিকগঞ্জেও আরেকটা শক্তিশালী ইউনিট ছিল ওদের। এই দুই ইউনিটের মধ্য দিয়ে আমাদের আমার ইউনিটটির রামেশ্বর গিয়ে ডিফেন্স নেওয়ার কথা। রাতের আঁধারেই আমাদের চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের গাইড ছিল মূলত পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষের লোক। সে সারা রাত আমাদের বিলে হাঁটুপানির মধ্যে ঘুরিয়ে মানিকগঞ্জে পাকিস্তানি ইউনিটটির সামনে হাজির করল। ওরাও প্রস্তুত ছিল না, ফলে সেখানে যুদ্ধ হয়নি। একদিন আমরা মুখোমুখি অবস্তান নিয়ে ছিলাম। এর মধ্যে আমার ইউনিটের একটা অংশ পথ হারিয়ে ফেলে। আমি তাদের খুঁজতে বের হই। ফিরে এসে দেখি, ওরা গোলা মেরেছে। দুটি মেশিনগান আর ৪ যোদ্ধার মাথার খুলি উড়ে গেছে। কমান্ডারের নির্দেশে রাতে আমরা ফিরে গ্রামের মধ্যে অবস্থান নেই। পরদিন আবার নতুন করে ইউনিট গুছিয়ে রামেশ্বরে অবস্থান নিই আমার সঙ্গে থাকা যোদ্ধারা। তখন হরিপুর গ্যাস ফিল্ডের একদিকে গুরখা ইউনিট, অন্যদিকে আমরা। ফলে ওরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। সেখানে আমরা একজন পাঞ্জাবি সৈন্যকে আটক করলাম। এরপর ১৩ ডিসেম্বর সকালে সিলেট আসার পথে ঘাটেরচটি এলাকায় ওদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়। সেখানে চার জন প্লাটুন কমান্ডার শহিদ হন। ওরা আমাদের সামনে ছিল। এভাবে কয়েক দফা যুদ্ধ করে আমরা সিলেট পৌঁছলাম। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় ওরা আত্মসমর্পণ করলেও সিলেটে আত্মসমর্পণ করে ১৭ ডিসেম্বর। এভাবেই আমাদের বিজয় রচিত হয়।’

 

 

 

 

 

 

 

ইত্তেফাক/ইউবি