শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘আমাকে ফেলে যেয়ো না, সঙ্গে নিতে না পারলে মেরে যেয়ো’

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২২, ১৩:০২

‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ রেডিওতে শুনলাম পরের দিন। সেখানে দুটো লাইন আমার মনে দাগ কেটে গেল। সেটা ছিল—এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তখনই বুঝে গেলাম, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। তখন আমি পাকিস্তানের পেশোয়ার নৌঘাঁটিতে আছি। সিদ্ধান্ত নিলাম, দেশে ফিরে আসব। ছুটির দরখাস্ত দিলাম, কপাল এতই ভালো, ছুটি মঞ্জুর হয়ে গেল। ২২ মার্চ রাত ১২টার ফ্লাইটে উঠলাম। পরদিন ভোর ৬টায় ঢাকায় নামলাম। ধানমন্ডিতে চাচার বাসায় উঠলাম। পরদিন রিপোর্ট করতে গেলাম ইস্কাটনে ক্যাম্প অফিসে (নৌপ্রধানের সাবেক বাসভবন)। সেখান থেকে দুই মাসের ছুটি মঞ্জুর হলো। সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পর চাচা বললেন, দেশের অবস্থা ভালো নয়, গ্রামের বাড়ি চলে যাও। ঐদিন রাতেই ট্রেনেই ফেনীর পশুরামে গ্রামের বাড়ি চলে গেলাম। এর মধ্যে ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা শুনলাম। মনের মধ্যে কিছু একটা করার সুপ্ত বাসনা তৈরি হলো। সিদ্ধান্ত নিলাম কিছু একটা করতে হবে।’

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রেক্ষাপট বলতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) মো. ইসহাক। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে সম্মুখসারির এই যোদ্ধা বলছিলেন, ‘২৮ মার্চ পশুরাম স্থানীয় যুবকদের একত্র করলাম। তা ২৫-৩০ জন হবে। তাদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলাম। এর মধ্যে আমরা খবর পেলাম, একজন অবাঙালি ইপিআর সদস্য বিলোনিয়া রেল স্টেশনের কাছে মুহুরী নদীর দক্ষিণ পাড়ে তিনটি স্হায়ী বাংকারে অবস্হান নিয়েছে। তখন এই যুবকদের নিয়েই স্হানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সহযোগিতায় আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলাম। তখন একজন নায়েক সুবেদারকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত করে দিলেন আওয়ামী লীগ নেতারা। ৪ এপ্রিল আমি আর ঐ নায়েক সুবেদার বিলোনিয়ায় রেকি করে এলাম। পরদিন আমরা ক্রলিং করতে করতে বাংকারের দিকে এগোতে থাকলাম। একটা এলএমজি আর কিছু হাত বোমা ছিল আমাদের সঙ্গে। পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের উপস্হিতি বুঝতে পেরে ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। আমি পাশেই একটা পুকুরে পড়ে গেলাম। ওখানে একটা খড়ের ঘর ছিল, সেটাকেই প্রোটেকশন নিয়ে আমি এলএমজি দিয়ে ব্রাশ ফায়ার শুরু করলাম। সেখানে দুজন পাকিস্তানি সৈন্য মারা গেল, অন্যরা পালিয়ে গেল। ঐ লাশ দুটো আমরা নদীতে ফেলে দিলাম। পরে দুই কিলোমিটার হেঁটে একটা বাজারে পৌঁছলাম। তখন সারা শরীর রক্তে ভিজে গেছে। সেখানে একটা হোটেলে পান্তা ভাত, ডাল আর ভর্তা খেলাম। আমার কাছে কোনো টাকা ছিল না, ওরা টাকাও নিতে চায়নি। ওরা বুঝতে পেরেছিল আমি মুক্তিযুদ্ধ করছি।’

‘সফল ঐ অপারেশনের পর বাড়িতে ফিরে দুই দিন ঘুমিয়েছি। শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত ছিল’— বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক। তিনি বলেন, ‘তখন পশুরাম থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন খোকা মিয়া। তার সঙ্গে যোগাযোগ হলো। সেখানে এসেছিলেন ঐ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের দায়িত্বে থাকা লে. কর্নেল (অব.) জাফর ইমাম বীরবিক্রম। তাদের সঙ্গে আলোচনা হলো। তখন জাফর ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ১৩ জুন ফেনীর অদূরে মুন্সির হাটে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। আমরা ১০ দিন অর্থাত্ ২৩ জুন পর্যন্ত সেখানে লড়াই করি। এক পর্যায়ে গোলা বারুদ কমে আসায় কমান্ডারের নির্দেশে আমরা পিছু হটে আসি। আসলে ২২ বা ২৩ জুন জেনারেল ওসমানীর ওখানে আসার কথা ছিল। কীভাবে যেন পাকিস্তানিরা টের পেয়ে আগেই ওদের কমান্ডো বাহিনী হেলিকপ্টার নিয়ে ওখানে অবস্হান নেয়। এক পর্যায়ে আমরা সীমান্েত গিয়ে ভারতের মধ্যে চোত্তাখোলা ক্যাম্পে অবস্হান গ্রহণ করি। এই ক্যাম্পটা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্যে পড়েছে।’

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, আগস্টের প্রথম দিকে চোত্তাখোলা ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে অংশ নেওয়ার জন্য সামরিক বিমানে কলকাতা যান। ভারতীয় নৌবাহিনী হুগলী নৌঘাঁটিতে সবার প্রশিক্ষণ হয়। তখন ভারতীয় নৌবাহিনীর দুটি পুরোনো টাগবোট আমাদের দেওয়া হয়। দ্রুত ঐ দুটি বোট সংস্কার করে যুদ্ধের জন্য প্রস্ত্তত করা হয়। কলকাতার মেয়র প্রফুল্ল কুমার সেন গানবোট দুটিকে ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ নামে কমিশন করেন। বাংলাদেশের প্রথম যুদ্ধজাহাজ পলাশের ক্রু হিসেবে যুক্ত হন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। আলাপকালে তিনি বলছিলেন, সার্বিক প্রস্ত্ততি শেষে নভেম্বর মাসে গানবোট দুটি মংলা বন্দরে প্রবেশের মুখে আটটি গ্রাউন্ড মাইন স্হাপন করে। এতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ও পাকিস্তানি একটা গানবোট ধ্বংস হয়। সেখান থেকে এগোতেই পাকিস্তানি পতাকাবাহী একটি বৃটিশ জাহাজ সেন্ট আল ভেনাসকে তারা ধাওয়া করেন। কামানের গোলার মুখে টিকতে না পেরে সেই জাহাজ কলকাতা বন্দরে আশ্রয় নেয়।

মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক বলেন, ২১ নভেম্বর সেনা-নৌ-বিমান সদস্যদের সম্মিলিত যুদ্ধ শুরু হলে গানবোট দুটি হলদিয়া বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে ১০ ডিসেম্বর ডিসেম্বর ভোরে মংলা বন্দরে পৌঁছে। এ সময় ভারতের যুদ্ধ জাহাজ ‘পানভেল’ এবং বিএসএফের জাহাজ ‘চিত্রাঙ্গদা’ তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। প্রতিটা গানবোটে ৪০ জনের মতো ক্রু ছিলেন। ঐ দিনই নৌবহর খুলনার উপকণ্ঠ শিপইয়ার্ডের সামনে পৌঁছলে আকাশ থেকে বোমারু বিমান পদ্মা আর পলাশের ওপর গোলা নিক্ষেপ করে। ফলে জাহাজ দুটিতে আগুন ধরে যায়। জাহাজ দুটি অনেকেই শহিদ হন। অনেকে নদীতে সাঁতার কেটে তীরে উঠেন।

তিনি বলেন, আমার সঙ্গে ছিলেন গোলাম মওলা। দু-জনে যখন তীরে পৌঁছাই, দেখি মওলার মুখমণ্ডল ঝলসে গেছে। তখন সে আমার কাছে আকুতি করে বলল, ‘আমাকে ফেলে যেও না, সঙ্গে নিতে না পারলে মেরে ফেলো।’ তখনই দুই রাজাকার আমাদের সামনে হাজির। একজনের হাতে বন্দুক, আরেক জনের হাতে লাঠি। ওটা ছিল খুলনার লবণচোরা এলাকা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন লাঠি দিয়ে পেছন থেকে পেটাতে শুরু করে। তখন আমি মুহূর্তের মধ্যেই বন্দুকটি কেড়ে নিয়ে ফাঁকা গুলি করি। দ্রুত ওরা দু-জন পালিয়ে গেল। তখন আমি একটা মাছ ধরার নৌকায় মওলাকে উঠিয়ে ভাটির দিতে যেতে থাকি। যেতে যেতে দেখি আমাদের গানবোটের আফজাল আর আজিজ পড়ে আছে। তাদেরও উঠিয়ে নিই। এছাড়া একজন বিএসএফ সদস্য ছিল আমাদের আমাদের নৌকায়। পরে আমরা নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাই। যেখানে আমাদের ওপর বোম্বিং হয়েছে, সেখানেই তীরে উঠার পর রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাকে মারা হয়। আমি আর রুহুল আমিন একই গানবোটে ছিলাম। দেশ স্বাধীনের পর আমি নৌবাহিনীতেই থেকে গেলাম। ১৯৭৩ সালে আমি কমিশন পাই। ১৯৯৭ সালে ক্যাপ্টেন হিসেবে কমিশন পান এই মুক্তিযোদ্ধা। ২০০০ সালে অবসর নেন।

ইত্তেফাক/এসজেড