বিশ্বের অন্যতম রোমান্টিক কবি জন কিটস। ২৩ ফেব্র‚য়ারি পেরিয়ে গেল তাঁর মৃতু্যর ২০১ বছর। আজো সৌন্দর্যে-প্রেমে চিরভাস্বর তাঁর কবিতা মানুষকে বিমোহিত করে; দেয় যন্ত্রণাময়তা থেকে মুক্তি। মাত্র ২৫ বছরের ক্ষুদ্র জীবন ছিল কিটসের, অথচ সেই ক্ষণজন্মা জীবনই তাঁর সৃজনগুণে সময়ের পরতে পরতে রেখেছে অমোচনীয় ছাপ! বায়রন-শেলিদের নামের সঙ্গে এক ব্র্যাকেটে উচ্চারিত হন তিনি। যদিও বেশির ভাগ পণ্ডিতের ভাষ্য, কিটসের কবিতায় শেক্সপিয়ার, মিলটন, স্পেনসার এমনকি জেমস টমসনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এরপরও তিনি যে স্বতন্ত্র—ভাবে, ভঙ্গিতে, ভাষায়—সে কথাও পেয়েছে সর্বজনের মান্যতা।
১৭৯৫ সালের ৩১ অক্টোবর কিটসের জন্ম, লন্ডনের অদূরে। শৈশবে, মাত্র ৯ বছর বয়সে হারান বাবাকে। মা পুনরায় বিয়ে করেন। ভাগ্যবিড়ম্বিত কিটসের বড় হয়ে ওঠা যেন যুদ্ধের সঙ্গে তুলনীয়। তবে বন্ধু চার্লস কাওডেন ক্লার্ক তাঁর তপ্ত জীবনে ছিলেন মেঘছায়ার মতো। চার্লসের সাহচর্য, এনফিল্ড স্কুলের সবুজ খোলা প্রাঙ্গণ—কিটসকে, বলা চলে, ‘অক্সিজেন’ যোগাত। চার্লসের মাধ্যমেই রেনেসাঁ যুগের লেখক টাসো, স্পেনসার প্রমুখের লেখার সঙ্গে মোলাকাত। ক্রমে প্রসারিত হতে থাকে তাঁর ‘মনের মহাকাশ’।
পাঠ্যবইয়েও তুখোড় ছিলেন কিটস। সেরা শিক্ষার্থী হিসেবে ১৮০৯ সালে পুরস্কৃত হন। সে বছরই মায়ের মৃতু্য। পরে ১৬ বছর বয়সে ওষুধ তৈরির পদ্ধতি শেখাসহ শল্যচিকিত্সকদের সহকারী হতে ভর্তি হন খ্যাতনামা গাইজ হাসপাতালে। কিন্তু রক্ত নাচে যাঁর সৃজনীশক্তিতে, হাসপাতালের আবহাওয়ায় তাঁর হাঁপ ধরে যাওয়ারই তো কথা। রচনা করলেন তাঁর প্রথম কবিতা ‘এন্ডিমিয়ন’, যা তাঁর রচিত সবচেয়ে দীর্ঘ কবিতাও বটে। ‘আ থিং অব বিউটি ইজ আ জয় ফর এভার’—কবিতার শুরুর বাক্যটি চিরকালীন এক সত্যভাষণই বটে, তাই বলে কি জীবনের অপূর্ণতা, ম্লানতা কিটসকে ছুঁয়ে যায়নি? ছোঁয়াছুঁয়ি নয় শুধু, জীবন তাঁর সামনে হাজির হয়েছিল যেন বেরহমি ব্যাধের বেশে। তিনি বিশ্বাস করতেন অপূর্ণতায় ভরা এ জীবন, যুক্তিবাদে মেলে না চিরায়ত সুখ।
‘এন্ডিমিয়ন’-এর পর একে একে লিখিত হতে থাকল আরো কবিতা। পাশাপাশি চলছিল পড়ালেখাও। কিন্তু বছর দুয়েক পর তাঁর শরীরে ধরা পড়ল যক্ষ্মা, যেন মৃতু্যদূতের সামনাসামনি হওয়া! সেই সময়ের দুনিয়ায় এ মারণব্যাধির যথাযথ চিকিত্সা ছিল না; যা-ও বা ছিল, তাও ছিল খুবই সীমিত পরিসরে। এরই মধ্যে তিনি গাইজ হাসপাতাল থেকে সনদ পান স্বাধীনভাবে কাজ করার। তবে সাহিত্যের সঙ্গেই থাকবেন পাকাপাকিভাবে, সিদ্ধান্ত নেন। এই সুবাদে লন্ডন ও এর আশপাশে ছড়াতে থাকে কবির পরিচিতি, বাড়তে থাকে বন্ধু ও বন্ধুস্হানীয় মানুষের পরিধি। তাঁদের অনেকের দ্বারা অবশ্য কঠোর সমালোচিতও হন কিটস। রিচার্ড উডহাউস নামের একজন খ্যাতনামা আইনজীবী বুঝতে পারেন তাঁর কবিবন্ধুর কাব্যপ্রতিভা। তিনি কিটসের সব লেখা সযতনে সংরক্ষণ করতে থাকেন। পাশেও থাকেন লন্ডন ছেড়ে ইতালিতে পাড়ি দেওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত। কবির আরেক অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে ওঠেন লি হান্ট। তাঁর ‘থ্রি ইয়ং পোয়েটস’ প্রবন্ধটি যে তিনজন কবিকে নিয়ে লেখা তাঁদের একজন কিটস; বাকি দুজন শেলি ও রেনল্ডস।
তবে ‘ব্ল্যাকউডস এডিনবার্গ’ সাময়িকী সাঁড়াশি ভাষায় বিদ্ধ করে কিটসের ‘এন্ডিমিয়ন’কে, ১৮১৮ সালে; যা ভগ্নস্বাস্হে্যর কবিকে আরো ভঙ্গুর দশায় ঠেলে দেয়। সে বছরই ফ্যানি ব্রনের সঙ্গে পরিচয় এবং প্রণয়, যে প্রণয় গাঁটছড়া বাঁধার আগের পূর্বরাগে ঝিলমিল। কিন্তু সময় আরো বৈরী হয়, পরের বছর, ১৮১৯ সালে কিটসকে ঠাঁই নিতে হয় আরেক বন্ধু টার্লস আর্মিটেজ ব্রাউনের বাড়িতে। ‘ওয়েন্টওয়ার্থ প্লেস’ নামের সেই বাড়িটি এখন জাদুঘরে পরিণত।
গভীর দুঃখময়তার, একাকিত্বের সেই বছরেই যক্ষ্মার সঙ্গে যুঝতে থাকা কিটসের কলম থেকে বেরুল অসাধারণ কিছু কবিতা, যাকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বলতে তাঁর কঠোর সমালোচকরাও বাধ্য হলেন। ‘ইভ অব সেন্ট অ্যাগনেস’, ‘লামিয়া’, ‘লা বের্ল’ এবং একগুচ্ছ ওডস। তাঁর সৃজনশীলতার, কাব্যসত্তার সার্থক সমালোচনায় কিটসের খ্যাতি ছড়াল দিকে দিকে।
তবে যক্ষ্মায় ভাইয়ের মৃতু্যসহ নানা সংকট তাঁর পিছু ছাড়ল না। শেলি তাঁকে ইতালির পিসায় আসার অনুরোধ করলেন পত্র মারফত। কিন্তু নেপলস হয়ে বন্ধু জোসেফ সেভার্নের সঙ্গে গেলেন রোমে, ১৮২০ সালের সেপ্টেম্বরে। ডিসেম্বরে আবার যক্ষ্মার উপসর্গ দেখা দিল কবির শরীরে, অথচ ঐ বছরের গোড়ায় তাঁর রোগমুক্তির লক্ষণ Õপষ্ট হয়েছিল। রোমেই থেমে যায় ক্ষণজন্মা এক অতু্যজ্জ্বল কবিজীবনের পরিক্রমা।
কিটস তাঁর অত্যল্প-পরিসরের জীবনেও কবিতার নানা ধরন নিয়ে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। অমিত্রাক্ষর ছন্দের কবিতা থেকে দ্বিপদী, চার লাইনের স্তবক, স্পেনসরীয় কবিতা প্রভৃতি। ‘অন ফার্স্ট লুকিং ইনটু চ্যাপম্যানস হোমার’সহ তাঁর কবিতাসমগ্রে থাকা চতুর্দশপদী কবিতাগুলো ভাবনার গভীরতায় ও উত্কর্ষে অতুলনীয়। কিটসের সাহিত্যকীর্তির মধ্যে তাঁর লেখা চিঠিগুলোও বিশিষ্টভাবে উজ্জ্বল। প্রেমিকা ফানো, কবি শেলি ও বন্ধুদের লেখা তাঁর জীবনের শেষ ছয় বছরে লেখা চিঠিগুলোর উপজীব্য মূলত ইংরেজি সাহিত্যের উত্কর্ষ-ঔজ্জ্বল্য, বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিক (শেক্সপিয়ার প্রমুখ) নিয়ে তাঁর অসাধারণ মূল্যায়ন। আর প্রেম ও বন্ধুতার গভীর অনুভবে ঋদ্ধ চিঠিগুলো। সুখের কালে তো বটেই, দুঃখের মাঝেও জীবনকে ভালোবাসতে পারার, সুন্দরের সন্নিকট হওয়ার প্রয়াসই প্রধান কিটসের রচনায়—চিঠিগুলো তারই অম্লান বয়ান, প্রতিটি কবিতায় তার অমোঘ উচ্চারণ। সৌন্দর্যে চিরভাস্বর তাঁর কবিতা; সুন্দরের তীর্থযাত্রী তিনি। কিটস আজো আমাদের সকল অসুন্দরকে ঠেলে সুন্দরের পানে ধাবিত হওয়ার প্রেরণা জোগান।
