সুলতানা জুয়েলার্স

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২২, ০৪:৪৯

কোনো ঠিকানা খুঁজে বের করা এত ঝামেলার, পুরান ঢাকার এই প্রিন্টিং হাউজ খুঁজতে বের না হলে শফিক জানত না। গুগল ম্যাপ-ট্যাপ কিছুই কাজে আসছে না। চিপা গলিতে নেটওয়ার্ক ভালো কাজ করে না, একে তাকে জিজ্ঞেস করে করে পথ চেনা। রিকশাওয়ালা খুবই ঠান্ডা মেজাজের মানুষ, এতবার ভুলভাল গলিতে ঢুকতে হয়েছে তাকে, বিরক্ত হননি, উলটো শফিক ধৈর্য হারালে বলেছে, ঘুরাঘুরিতে আনন্দ লাগে, প্যাঁচে মজা বেশি। শফিক কোনো আনন্দ বা মজা পাচ্ছে না, কারণ তার চিন্তা রিকশাভাড়া নিয়ে। বিশ মিনিটের রাস্তা চল্লিশ মিনিট ঘুরলে ভাড়া ডাবল দিতে হবে। অফিস তাকে এত টাকা দেয়নি। তার যাতায়াত বাবদ যে খরচ তার বেশি হলে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। অফিস তো আর বুঝতে চাইবে না, গলি কেমন ছিল, নেটওয়ার্ক ভালো ছিল কি না, গুগল ম্যাপ কাজ করল না কেন। এই প্যাঁচের গলি তাই শফিকের একদম ভালো লাগছে না। কিন্তু উপায় নেই, প্রিন্টিং হাউজটা এখানেই কোথাও। গলির দুপাশে দোতালা তিনতালা বাড়ি, বেশির ভাগই পুরনো। এগুলোর নিচতলায় অফিস, কারখানা বা দোকানপাট। বাড়ির নম্বর ধরেও খুঁজে পাওয়া কঠিন। সব শেষে যার কাছে ঠিকানা খোঁজার জন্য সাহাঘ্য চেয়েছে, সে বলেছে ‘সুলতানা জুয়েলার্স’ নামের স্বর্ণের দোকানের পাশেই এই হাউজ, আর কিছুটা গেলেই কাউকে বললে চিনিয়ে দিবে।

‘সুলতানা জুয়েলার্স’ নাকি অনেক পুরনো স্বর্ণের দোকান, এখানকার সবাই চেনে। অনেক ঘুরে অবশেষে দেখা মিলল কাঙ্ক্ষিত ঠিকানার। শফিক রিকশাভাড়া মিটিয়ে প্রিন্টিং হাউজে ঢুকে গেল। ঘণ্টাখানিক বাদে কাজ সেরে বেরিয়ে দেখে, যে রিকশা করে সে এসেছিল সেই রিকশাওয়ালা গামছা গলায় জড়িয়ে রিকশার পাদানিতে বসা। শফিককে দেখে হেসে দিয়ে বলে, স্যার এবার ফিরবেন? শফিক অবাক, একঘণ্টা ধরে কি উনি এখানেই রিকশা চালিয়েছেন? সেও হেসে বলল, ভালোই হলো, আপনার রিকশায়ই ফিরে যাই, চলেন।

রিকশায় বসে কিছুটা কৌতূহলবশেই জিজ্ঞেস করল, কী মামা, এই এক ঘণ্টা এখানেই খ্যাপ মারলেন?

রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, না, সুলতানার পাশে বইসা ছিলাম একটু। শফিকের মাথায় ঢুকছে না, সুলতানার পাশে মানে! রিকশাওয়ালা বলে, ‘ঐ যে স্বর্ণের দোকানের নাম ‘সুলতানা’ তার পাশে। সুলতানা আমার অনেক প্রিয় মানুষের নাম। মানুষ হারায়, তার নাম তো আর হারায় না, তাই না স্যার। আপনেরে নামানোর পর সেখানেই বইসা থাকতে মন চাইল।’

সুলতানা কে, শফিকের জানতে ইচ্ছে করল না। ওনার মা, স্ত্রী, প্রেমিকা, বোন, মেয়ে—কে হতে পারে? থাক না অজানা। সুলতানা তার প্রিয় কেউ, যে হারিয়ে গেছে জীবন থেকে, নামটুকু রেখে দিয়ে। চৈত্রের ক্লান্ত দুপুরে নগরীর ধুলো মাখা বাতাসে মিলিয়ে যেতে থাকে ‘প্রিয় মানুষ হারায়, তার নাম তো আর হারায় না’—‘প্রিয় মানুষ হারায়, তার নাম তো আর হারায় না’...।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি