পাঠক প্রতিক্রিয়া

রক্তে আঁকা ভোর: উপন্যাসের আশ্রয়ে ইতিহাস-পাঠ

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২২, ০৪:৫৩

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ নিয়ে আনিসুল হকের লেখা কৌতূহলী পাঠকের মনোযোগ কেড়েছে। এ কৌতূহল শুধু তাঁর জনপ্রিয়তার জন্য নয়, বরং যে দেশে, যে কালে তিনি লিখছেন তা আমাদের একান্তই নিজের বলেই মনোযোগ দেওয়া।

এখনকার পাঠকদের অনেকেই হয়তো একাত্তরে জন্মাননি। কিন্তু তবুও একাত্তর আমাদের অনেক চেনা নিজের না হোক—স্বজনের যাপন করা দুঃসহ কষ্ট, বিভীষিকা, মৃতু্য, যন্ত্রণা আর গৌরবের আরেক নাম একাত্তর। আমাদের অর্জিত একমাত্র বিজয়, স্বজনের রক্ত মাড়িয়ে হেঁটে আসা পথ, আর হাতের মুঠোয় ছুঁয়ে ছেনে দেখা স্বপ্ন—সেও তো একাত্তরই। একাত্তর নিয়ে একে একে বেরিয়েছে—যারা ভোর এনেছিল, উষার দুয়ারে, আলো-আঁধারের যাত্রী, এই পথে আলো জ্বেলে, এখানে থেমো না। এই তালিকার সর্বশেষ বই ‘রক্তে আঁকা ভোর’। লেখকের নিজের ভাষাতেই এখানে তিনি সংকলক, সংগ্রাহক এবং সম্পাদকের কাজ করেছেন একইসঙ্গে। চেনা ইতিহাস তাই খুঁজে পাওয়া সহজ। বেশি চেনা তাই আরো সহজ ভুলপথে যাওয়া। সেই পথ হারানোর ভয় থেকেই ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর মুখে তিনি তুলে নিয়েছেন স্বাধীনতার দলিলপত্র থেকে উদ্ধৃত ইতিহাস, যেন ভুল পথে পা না পড়ে! কল্পনাপ্রবণ পাঠক যদি ভেবে নেয়, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী আসলে চরমপত্রের এম আর আখ্তার মুকুলের ছায়ায় আঁকা চরিত্র, কী জানি ভুল হবে কি না। আলাদা করে ইতিহাস জানানোর দায় লেখকের ছিল না—এই ইতিহাস আমাদের সবার জানা। বাবা-মা’র মুখে, কখনো পাঠ্যবইয়ে, কখনো আপাত নিষিদ্ধ ইতিহাসে আমরা শুনেছি এ গল্প—কেউ কেউ তো যাপন করেছেন সে মহাকালের জীবনও। তিনি শুধু তাঁর মতো লিখেছেন।

আনিসুল হক যে ইতিহাসকে তুলে এনেছেন তা বাংলাদেশের মানুষ সবারই কম-বেশি জানা। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের আগ্রহী পাঠক তাঁরা জানেন আরো গভীরভাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, মুক্তিযুদ্ধের দিনপঞ্জি, বিদেশি রাজনীতি এসব নিয়েও প্রচুর বই আছে। কিন্তু আনিসুল হকের লেখায় সেই সময়টি যাদের ঘিরে ঘটনা আবর্তিত হচ্ছে সেই মানুষগুলো অনেক জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়। তারা পাঠকের কাছে রক্ত-মাংসের মানুষ। আমরা মূল ঘটনা জানি কিন্তু সেই ঘটনা কীভাবে ঘটেছে তা প্রত্যেক চরিত্রের মুখে ভাষা দিয়ে তিনি তুলে এনেছেন। সেই ভাষা আনিসুল হকের কল্পনায় ভর করে যেমন এসেছে কিন্তু সত্যকে সরিয়ে দিয়ে গল্প দিয়ে লেখক এড়িয়ে যেতে চাননি। বরং গবেষকের নিষ্ঠায় সত্যকে, ইতিহাসকে আশ্রয় করেই তিনি গল্পের আদল দিয়েছেন। তাই পাঠক যখন বইগুলো পড়েন তখন তিনি উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহর মধ্য দিয়ে যেমন এগিয়ে যান, একইসঙ্গে ইতিহাসের পথচলারও অভিজ্ঞতা লাভ করেন। এখানে আনিসুল হক অন্যান্য ঐতিহাসিক উপন্যাসিকের চাইতে আলাদা।

উপন্যাসের শুরু পঁচিশে মার্চের কালরাত্রি দিয়ে। আর শেষ হয় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে। মুজিবের অনিশ্চিত যাত্রা, বাঙালিরও। নেতা শেখ মুজিব, রাজনীতিবিদ শেখ মুজিব মুহূর্তে বাবা হয়ে নিজের হাত শোঁকেন—রাসেলকে এইমাত্র ফিডারে খাইয়ে আসা দুধের গন্ধ তাঁর হাতে লেগে। এ এক আশ্চর্য সময়যাত্রা—চেনা মানুষ, যাদের আমরা দেখিনি কখনো, যেন পাশাপাশি হেঁটে হেঁটে তাদের দেখছি, শুনতে পাচ্ছি কণ্ঠ। ইতিহাস, কিন্তু ইতিহাস নয়—চেনা মানুষ, চেনা সময়ের আশ্চর্য ভ্রমণ যেন!

মুজিব বন্দি হন, কিন্তু পেছনে রেখে যান তার প্রধান সেনাপতিকে। আমরা ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনকে তো চিনি, কিন্তু রিমি, সিমি বা সোহেলের পিতা তাজউদ্দিন, মুজিবভাইয়ের ছায়া তাজউদ্দিন তো পর্দার আড়ালেই থেকে গেছেন—নিজের জীবনে, ইতিহাসেও নয় কি! যে পিতা সন্তানের ফেলে আসা মুখ পলকে ভেবে নিয়েই ভাবতে পারেন ‘মুজিবভাই কেমন আছেন? বেঁচে আছেন তো? ঢাকাবাসীর কতজন বেঁচে আছে? কতজন মারা গেছে? কতজন আহত হয়েছে? কতজন গোঙাচ্ছে যন্ত্রণায়?’ জাতিকে পথ দেখানোর দায়িত্ব নিজেই তুলে নেন।

গৃহবধূ রেণু, রাজনীতিবিদ স্বামীকে তো ছেড়ে দিয়েছেন দেশের জন্য, সন্তানকে ছাড়বেন কী করে? তবু বলেছেন, যা, সাবধানে যাস। যুদ্ধে রওয়ানা হতে গিয়েও বড়ভাই কামাল অস্ত্র হাতে তুলে দেয় ছোট বোন রেহানাকে। বলেন, মারতে না পারলে মরিস, ধরা দিস না, ওরা মানুষ নয়, পশু। গা শিউরে ওঠে, ভয়ে চোখ বন্ধ করি যেন চোখ বুজলেই মুছে যাবে সুইপার ইন্সপেক্টর সাহেব আলির বর্ণনা—রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ! বুড়িগঙ্গায় ভেসে থাকা ফুলে গলে যাওয়া লাশের মিছিল। এ মিছিল দীর্ঘতর হয় প্রতিদিন। মানুষের ইতিহাসে বোধহয় দীর্ঘতম ছিল এ রাত—যে রাত শেষে ভোর আসতে লেগেছিল নয়টি মাস। পুরো বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ, প্রতিটা গাছ, প্রতিটা পাখি, প্রতিটা প্রাণী, নদীর ঢেউ, আকাশের তারা, প্রতিটা ধূলিকণা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে একটা মানুষের ভালো থাকার জন্য কায়মনোবাক্যে নিশিদিন প্রার্থনা করেছে। প্রতিমুহূর্তে তার নিরাপদ সুস্হ প্রত্যাবর্তনের জন্য দোয়া করেছে। সংগ্রাম করেছে। সেই আশা পূর্ণ হয় ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। শত্রু কারাগার থেকে মুজিব ফেরেন স্বাধীন দেশে। ব্রিটিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট দেশের মাটি ছোঁয়। রক্তস্নাত দেশে ভোরের আলো ফোটে। রক্তের পথ বেয়ে যে ভোর এসেছিল—সেই কাহিনিই বলেছেন আনিসুল হক।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি