মধুর আমার মায়ের হাসি

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২২, ১২:৪০

দুধ বেচতে গেছি পিঙ্গলাকাঠির বাজারে। সেখানে দুধের সের বারো টাকা। আধা সের ছয়। আধাসেরকে সে কালে আমরা আজ্জের বলি। প্রতি আজ্জের দুধে এক বা দুই টাকা লাভ। আমাদের বাজার কাছে। কাছের বাজারে দুধের দাম কম। সের আট বা দশ টাকা। তার চেয়ে নদীর পাড় ধরে ফুরফুরে হাওয়ায় মাইল দুই হেঁটে গেলেই পিঙ্গলাকাঠির বাজার। সেই বাজারে হরেক রকম মিষ্টির দোকান। দোকানের সংখ্যাও অনেক। দুধের চাহিদাও বেশি। ফলে দামও দু-চার টাকা বাড়তি। আমরা সেই বাড়তি দামের আশায় নদীর পাড় ধরে হেঁটে যাই। মাথায় জগ বা মাটির কলসভর্তি দুধ। হাঁটার তালে তালে যাতে হাঁড়ির দুধ ছলকে পড়ে না যায়, তাই হাঁড়ির ভেতর খেজুরপাতা ঠেসে দেওয়া হয়।

‘দুধে পানি দিছস?’

মিষ্টির দোকানির প্রশ্নে আমি চমকাই না। এমন প্রশ্ন আমাকে হররোজ শুনতে হয়। আমি দম নিয়ে বলি, ‘দুধে পানি দিলে গুনাহ হয়, মারাত্মক গুনাহ।’

‘আরে ছ্যামড়া, যারা দুধে পানি মিশায়, তারা সকলেই জানে গুনাহ হয়, তার পরও দেয়। কি, দেয় না?’

আমি মাথা নাড়ি, ‘হ্যাঁ দেয়।’

‘তাইলে? বল, পানি দিছিস?’

আমি বলি, ‘যারা পানি দেয়, তারা কি কখনো স্বীকার করে যে, দুধে পানি দেয়?’

‘না, তা করে না।’

‘তাইলে জিগান ক্যান?’

লোকটা খানিক কী ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘দেখি, কেউ কোনোদিন সত্য কথা বলে কি না? খুব ইচ্ছা, কেউ কোনো দিন মুখের ওপর সত্য কথাটা বলব। বলব যে—অভাবের সংসার, এই দুধ বেইচাই সংসার চলে। পানি না মিশাইলে খামু কী, কন? বাঁইচা থাকতে অসত্ হইছি। এই সত্য কথাখান কেউ একজন কোনো একদিন আইসা বলব। আর তার এই সত্য কথার জন্য তারে আমি পাঁচ সের দুধের দাম উপহার দিব।’

আমি মিষ্টির দোকানওয়ালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছোট্ট আমি। টিনটিনে ঠ্যাঙের হাফপ্যান্ট পরা আমি। আমার হঠাত্ কী যে হলো! আমি গলা উঁচু করে টানটান হয়ে বললাম, ‘যে এত বড় সত্য বলতে পারবে, সে যত অভাবীই হউক, কোনোদিন দুধে পানি দিতে পারব না। কোনোদিন না।’

মিষ্টির দোকানি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর সময় নিয়ে বললেন, ‘দুই টাকার জন্য যে এই এত পথ হাঁইটা আসিস, কষ্ট হয় না?’

আমি বললাম, ‘হয়।’

‘তাহলে আসিস কেন?’

‘আম্মার জন্য।’

‘আম্মার জন্য?’ দোকানি ভারি অবাক হন।

‘হ্যাঁ। আম্মারে যখন বাড়ি গিয়া বলি যে,—আম্মা, আজ দুধের সের আট টাকা না, বারো টাকায় বেচছি। আম্মায় যে তখন কী খুশি হয়, কী সুন্দর কইরা যে হাসে! আমার মায়ের ঐ সুন্দর হাসি দেখার জন্য এত দূর আসি।’

দোকানি অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। স্তব্ধ। তারপর ক্যাশবাক্স থেকে পাঁচ সের দুধের দাম এনে আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি বললেন, ‘অসুন্দর জিনিস আবিষ্কারের চাইতে সুন্দর জিনিস আবিষ্কারের আনন্দ অনেক বেশি। অনেক বেশি। যাহ্, বাড়ি যা।’

আমি বাড়ি গেলাম না। তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইলাম। মানুষটা জানেন না, এই টাকা নিয়ে আমি বাড়ি যেতে পারব না। আমার মা এই গল্প বিশ্বাস করবেন না। পৃথিবীর কিছু কিছু গল্প, পৃথিবীর চেয়েও সুন্দর। ফলে সেইসব গল্প কেউ বিশ্বাস করে না। সেইসব গল্প তাই হয়ে থাকে অপার্থিব অবিশ্বাস্য!

ইত্তেফাক/এএএম