অর্ধ-মাতাল অবস্থায় রাজনৈতিক নেতা আর ইন্সপেক্টর হাফিজের সংলাপ চলছে। হঠাৎ অশরীরী আত্মার মতো এসে উপস্থিত হয় মুর্দা ফকির। তবে মুর্দা ফকির ‘মুর্দা’ নয়, জীবিত। তারপরেও নেতা ও ইন্সপেক্টর হাফিজ দু'জনেই তাকে মনে মনে ভয় পায়। বলছিলাম মুনীর চৌধুরী রচিত 'কবর' নাটকের কথা।
রবিবার (০৬ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে আরণ্যক নাট্যদলের পরিবেশনায় এ নাটকটি মঞ্চায়িত হয়। ‘বিভূতির অবশেষ থেকে হোক নব উন্মেষ’ স্লোগানে জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার (অডিটোরিয়াম) আয়োজিত ছয় দিনব্যাপী নাট্য উৎসব শুরু হয়েছে। প্রথম দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) থেকে একটি র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে ক্যাফেটেরিয়া চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন তারা।
পরে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক রশীদ হারুন নাট্য উৎসবের উদ্বোধন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, আরণ্যক নাট্যদলের শারমিন হায়াত দীপা ও নাট্য উৎসবের আহ্বায়ক মাইনউদ্দীন বাবু প্রমুখ। এরপর আরণ্যক নাট্যদলের পরিবেশনায় 'কবর' নাটক মঞ্চায়িত হয়।
‘কবর’ নাটকের পুরো ঘটনাই গোরস্তানের ভেতর সংঘটিত হয়েছে। এ নাটকে মুর্দা ফকিরের কথার মধ্যে পাগলামির সংমিশ্রণ আছে যেটা নাটকের বহিরাঙ্গ। তবে মুর্দা ফকিরের প্রতিটি কথাই রূপকধর্মী। তার বুকের হাহাকারই যেন বিবেকের হাহাকার এবং দেশ ও জাতির কান্না।
নেতা ও ইন্সপেক্টর হাফিজের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে এসে মুর্দা ফকির বলেন, ‘গন্ধ! তোমাদের গায়ে মরা মানুষের গন্ধ! তোমরা এখানে কি করছো? যাও, তাড়াতাড়ি কবরে যাও। ফাঁকি দিয়ে ওদের পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরা বাইরে থেকে মজা লুটতে চাও, না? না, না আমার রাজ্যে এসব চলবে না।’
এখানে যারা জীবিত মূলত তারা প্রকৃত জীবিত নয়; তারা জীবন্ত লাশ মাত্র। আর যাদের তারা অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে তারাই জীবিত চির জাগরূক। তাই তো লাশগুলো কবরে ঢুকতে চায় না, বিদ্রোহ করে। ওরা ইন্সপেক্টর হাফিজের কথার প্রতিবাদ করে বলেন, ‘মিথ্যে কথা। আমরা মরিনি। আমরা মরতে চাইনি। আমাদের অন্যায়ভাবে মারা হয়েছে। আমরা মরব না।...কবরে যাব না।’
‘কবর’ নাটকের মুর্দা ফকির, মূর্তিদের (ভাষা আন্দোলনে শহীদেরা) হাহাকার ভাষা আন্দোলনে আবেগ-উচ্ছ্বাসে জড়িত। নাটকজুড়ে রাজনৈতিক অবস্থা, গোপন ছলনা ও বাঙালীর অস্তিত্বের সংগ্রাম নিহিত রয়েছে।
নাট্য উৎসবের দ্বিতীয় দিন নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের আয়োজনে 'জল পলকের গান', তৃতীয় দিন জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের আয়োজনে 'বিচারপতি ঘুমিয়ে গেছেন', চতুর্থ দিন প্রাচ্যনাটের আয়োজনে 'সার্কাস সার্কাস', পঞ্চম দিন জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের আয়োজনে 'মধ্য রাতের কবিতা ও গান' এবং শেষ দিন সংগঠনটির পূণর্মিলনী অনুষ্ঠিত হবে।
