‘গোলাগুলির পর দেখি পাকিস্তানি ১১ সৈন্যের লাশ পড়ে আছে’ 

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ০৬:০২

“আমাদের আক্রমণের পর, ওরা পালটা প্রতিরোধ গড়ে তুলল। সেখান থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরেই ছিল মাসলিয়া বিওপি। সেখান থেকে রিইনফোর্সমেন্ট এলো। ওরা হেভি মর্টার শেল ছুড়তে শুরু করল। এরপর আর্টিলারি শেলিং শুরু করল। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহসিকতা নিয়ে লড়াই চালিয়ে গেল। আমাদের তো কোনো কাভারেজ ছিল না। আমরা ভোররাতে গিয়ে ধানখেতের মধ্যে শুয়েছিলাম। ভোররাতে চার-পাঁচটা অ্যান্টিপারসোনাল মাইন আমরা সেট করতে পেরেছিলাম, সেগুলো খুব কাজে লাগল। অ্যামবুশ সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিনিট স্থায়ী হয়। সেখানে ঘণ্টাখানেক আমাদের গোলাগুলি চলল। এক পর্যায়ে পাকিস্তানিরা পিছু হটতে বাধ্য হলো। তারপর ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দিয়ে আমরা যখন সার্চ করলাম, তখন ডেডবডি গুনে দেখলাম ১১ পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছে। আর আমাদের পক্ষে একজন মাত্র আহত হয়, তার হাতে গুলি লেগেছিল। সব মিলিয়ে এই সাফল্য তখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”

ইত্তেফাকের কাছে যুদ্ধসময়ের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে এভাবেই বলছিলেন মেজর (অব.) অলিক কুমার গুপ্ত, পিএসসি, বীরপ্রতীক। ১৯৭১ সালে অলিক কুমার গুপ্তের বয়স ছিল ২৩। ১৯৬৯ সালে রাজবাড়ী কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তত্কালীন ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতা ছিলেন। ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর রাজবাড়ীতে অসহযোগ আন্দোলন সংঘটিত করতে নেমে পড়লাম’—বলছিলেন এই মুক্তিযোদ্ধা। ‘২৫ মার্চ ঢাকায় নৃশংস গণহত্যা শুরু হলো। পরের দুটো সপ্তাহ ছিল ভয়াবহ। ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা মানুষের ঢল। তখন আমরা অসহায় মানুষের স্রোত সামলানোর চেষ্টা করলাম।

‘এর মধ্যে খবর এলো পাকিস্তান আর্মির ২২-বালুচ রেজিমেন্টের কয়েকটা কোম্পানি যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে কুষ্টিয়ায় ক্যাম্প করেছে। তখন চুয়াডাঙ্গায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের চতুর্থ উইংয়ের কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন ক্যাপ্টেন এ আর আজম চৌধুরী বীরবিক্রম। আবু ওসমান চৌধুরীরা তখন বিদ্রোহ করেছেন এবং তারা কুষ্টিয়া আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কুষ্টিয়া ঘিরে ফেলছেন। এ সময় রাজবাড়ী আর ফরিদপুর থেকে আর্মড আনসার সদস্যদের কুষ্টিয়া যুদ্ধের জন্য লজিস্টিকস আর খাওয়াদাওয়া দিয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১১৭ জনের মতো আর্মড আনসার আর আমাদের  মতো কিছু ভলান্টিয়ার মিলে আমরা কুষ্টিয়া গেলাম। মিলপাড়া, মোহিনী মিলের কাছে ভয়াবহ যুদ্ধ হলো পাকিস্তানিদের সঙ্গে। এই যুদ্ধে আমরা জয়ী হলাম। মেজর আবু ওসমান চৌধুরীদের বিদ্রোহ সফল হলো।

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলছিলেন, কদিন পর ৭ই মে হেঁটে হরিণাকুণ্ডু দিয়ে আমি বর্ডার ক্রস করে ভারতের করিমপুর গেলাম। সেখানেই প্রথম অস্ত্রশস্ত্র চালানোর একটা প্রাথমিক প্রশিক্ষণ পেলাম। এটা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ। সেখান থেকে ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী একদিন আমাকে কলকাতায় থিয়েটার রোডে পাঠালেন। আগে থেকে সেখানে ছিলেন তত্কালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য কাজী হেদায়েত হোসেন। ভাইবা দিতে গেলাম থিয়েটার রোডে। ইন্টারভিউ নিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার, তিনি তখন বিমানবাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন। সঙ্গে ভারতীয় দুজন অফিসার ছিলেন, আরো ছিলেন খন্দকার ওবায়েদুর রহমান। তিনি ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন, একসময় বঙ্গবন্ধুর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। ওবায়েদ ভাই আমাকে আগে থেকেই চিনতেন। আসলে নকশাল বা কমিউনিস্ট কি না—এসব যাচাইয়ের জন্য এমন পলিটিক্যাল ভেরিফিকেশন হতো মুক্তিযোদ্ধাদের। সেখানে আমরা ছয়-সাত জন ছিলাম। দীর্ঘ সাক্ষাত্কারের পর একসময় আমাদের নোটিশ বোর্ড দেখতে যেতে বলল। গিয়ে দেখি এক নম্বরে আমি আর দুই নম্বরে শেখ কামালের নাম। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালের সঙ্গে সেদিনই আমার প্রথম পরিচয় হলো। এভাবেই আমি সেনাবাহিনীতে মনোনীত হলাম।’

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘৯ অক্টোবর আমাদের পাসিং আউট হলো। আমাকে যোগ দিতে বলা হলো মুক্তিযুদ্ধের ৮ নম্বর সেক্টরে। সেখানে আমি জয়েন করলাম ১৪ অক্টোবর। তিনটা ট্রাকের একটা কনভয় নিয়ে আমরা রওনা হলাম। বয়রা সীমান্েত পৌঁছে আমি সেক্টর কমান্ডার মেজর মঞ্জুরের সঙ্গে দেখা করলাম। উনি আমাকে সাবসেক্টর একের সহকারী কমান্ডার করলেন। আমার কমান্ডার ছিলেন মেজর নাজমুল হুদা। একদম সীমান্তবর্তী বলে এই অঞ্চলটার ভৌগোলিক অবস্থান কৌশলগতভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি কাশীপুরে থাকা শুরু করলাম। কাশীপুরে আমরা একটা ডিফেন্স পজিশনে ছিলাম। আমার নেতৃত্বে ইপিআরের ডেলটা কোম্পানির ২৫ থেকে ৩০ জন সৈনিক এবং স্থানীয় আরো বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা। এখান থেকে দুই মাইল পূর্ব দিকেই পাকিস্তানি মিলিটারির ক্যাম্প ছিল। কপোতাক্ষ নদের একেবারে পাড়ে পাকিস্তানিদের ৩৮ এফ এফ রেজিমেন্ট। এপারে মাঠের ৬০০-৭০০ মিটার দূরেই আমরা মুখোমুখি অবস্থানে ছিলাম। প্রায়ই আমাদের মধ্যে গুলি বিনিময় হতো। যশোরে চৌগাছার পর গরিবপুর থেকে ঝিকরগাছা পর্যন্ত প্রায় ১০-১২ মাইলের একটা মুক্তাঞ্চল ছিল। এই মুক্তাঞ্চলটাকে মুক্ত রাখার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। যাতে পাকিস্তানিরা এখানকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো ডিফেন্স পজিশনে যেতে না পারে।

‘১১ নভেম্বর একটা বড় লড়াই হয়েছিল চৌগাছায়। মাসলিয়া বিওপির কাছে। সেখানকার ছাতেরশা আখড়া নামের একটা জায়গায় পাকিস্তানিদের ৩৮ এফএফ রেজিমেন্টের খুবই স্ট্রং ডিফেন্স পজিশন ছিল। প্রায় এক কোম্পানি সৈন্য ছিল সেখানে। ওরা সেখানে নিয়মিত চার থেকে সাড়ে চার কিলোমিটারের একটা প্যাট্রল করত। মসলিয়া বিওপি থেকে গদাধরপুর, গয়রা গ্রাম হয়ে পশ্চিমের হিজলি বিওপি পর্যন্ত এই প্যাট্রল চলত। এই টহল দলটাকে আমি অ্যামবুশ করব বলে ঠিক করি। কৃষকের বেশে মাথায় মাথাল দিয়ে মাঠে জমি নিড়ানোর কাজ করতে করতে পরপর তিন দিন আমরা খুব কাছ থেকে ওদের মুভমেন্ট দেখি। আমার সঙ্গে ছিলেন আরো তিন জন ভ্যালিয়েন্ট মুক্তিযোদ্ধা হাবিলদার আরব আলী বীরবিক্রম, হাবিলদার আবুল আর ল্যান্সনায়ক জলিল বীরপ্রতীক। তিন দিনের পর্যবেক্ষণে অ্যামবুশের পরিকল্পনার জায়গা নির্বাচন সব শেষ করি। ১১ নভেম্বর ভোররাতে আমরা অ্যামবুশ সেটআপ শেষ করি। সেদিন দেখলাম ওরা সংখ্যায় আরো অনেক বেশি এবং ওরা টহলও শুরু করল দেরি করে। আমরা ভয়াবহ বিপদের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। গুনতে গুনতে দেখলাম ওরা ৩৪ জন। অথচ আগের তিন দিন ওরা সংখ্যায় ২৫ জনের বেশি ছিল না। আমাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছিল। আমাদের কাভারেজ এরিয়া ছাড়িয়ে যাচ্ছিল ওরা। তাই আর দেরি না করে আমরা আক্রমণ শুরু করে দিলাম। ওরা পালটা প্রতিরোধ গড়ে তুলল। সেখানে ঘণ্টাখানেক আমাদের গোলাগুলি চলল। এক পর্যায়ে আমরা সফল হলাম। সেখানেই ১১ জন পাকিস্তানি সৈন্যের লাশ পেয়েছি।’

এভাবেই ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে আসেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

রাজবাড়ীর মহেন্দ্রপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মুক্তিযোদ্ধা উনসত্তরের গণ-অভু্যত্থান এবং সত্তরের প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে প্রচারাভিযান পরিচালনা করেছেন। রণাঙ্গনে সম্মুখসমরের এই যোদ্ধা ১৯৮৩ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। এরপর পল্লী বিদু্যতের জিএম হিসেবে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। একটি হাসপাতালেও বেশ কিছু দিন দায়িত্ব পালনের পর করোনা মহামারির শুরু হলে চাকরি হারান তিনি। তখন থেকেই অবসর সময় কাটাচ্ছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। 

ইত্তেফাক/কেকে