বইমেলা, লেখক ও প্রকাশক 

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ০৯:০০

আমাদের প্রকাশনা-জগৎ এখন বইমেলানির্ভর হয়ে গেছে। বেশির ভাগ প্রকাশকই সারা বছর কোনো বই প্রকাশ করেন না, পাণ্ডুলিপি জমিয়ে রাখেন। ফেব্রুয়ারির বইমেলার আগে আগে হুড়োহুড়ি করে বইগুলো প্রকাশ করেন।

ফলে প্রেসের ওপর যেমন চাপ পড়ে, তেমন চাপ পড়ে বাইন্ডারদের ওপর, প্রুফ রিডারদের ওপর, এমনকি লেখকের ওপরও। অনেক ক্ষেত্রে লেখক তার নিজের লেখা সংশোধন করারও সময় পান না। পশ্চিমবঙ্গের অবস্থাও অনেকটা এ রকম। কিন্তু পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বই প্রকাশের অবস্থা এ রকম নয়। সেসব দেশে সারা বছর ধরেই বই প্রকাশিত হয়।সারা বছর ধরেই বই কমবেশি বিক্রি হয়।

আমাদের দেশ এবং পশ্চিমবঙ্গেও অবস্থাটা একসময় ওরকমই ছিল। আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে। তার পর থেকে অনেকগুলো বছর পর্যন্ত সারা বছর ধরেই আমার বই প্রকাশিত হতো। একদিকে ঈদসংখ্যায় উপন্যাস লিখছি, অন্যদিকে ঈদের পরপরই সেই সব লেখাই বই হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কয়েক মাস পরপরই পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পগুলো নিয়ে বই হয়ে যেত। আর বইমেলা উপলক্ষে নতুন দু-চারটা বই তো প্রকাশিত হতোই।

সে অবস্থাটি এখন আর নেই। এখন সারা বছর ধরে যা লিখি, বইগুলো প্রকাশিত হয় মেলার সময়। পাঁচ-ছয়টা বই হয়ে যায়। সংকলনগ্রম্হ হয় বেশ কয়েকটা। এর ফলে আমার পাঠকদের ওপর ভালো রকম একটা চাপ পড়ে। সব বই তারা সংগ্রহ করতে পারেন না। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রকাশকদেরও যুক্তি আছে। তারা বলেন, বইমেলা ছাড়া এখন আর সেভাবে সৃজনশীল, মননশীল বই বিক্রি হয় না। বই বিক্রি হয় মেলার সময়। ফলে আমরা অনেকেই মেলানির্ভর প্রকাশক হয়ে উঠেছি।

কথাটি অনেকখানি সত্য। বইয়ের বিক্রি আগের অবস্থায় নেই। জনপ্রিয় লেখকদের বইও আগের মতো বিক্রি হয় না। যেটুকু হয় তা ঐ বইমেলায়ই। এ অবস্থায় বই ছেপে ছেপে গোডাউন ভর্তি করে রেখে, টাকা আটকে রেখে কোন প্রকাশক যাবেন সারা বছর ধরে বই প্রকাশনার দিকে? তার চেয়ে মেলার আগে আগে বই ছাপলে দ্রুত তার লগ্নি করা টাকাটা উঠে আসবে, বইও গোডাউনে পড়ে থাকবে না।

আমি আগেই বলেছি, এ অবস্থা কিন্তু সব প্রকাশকের ক্ষেত্রে নয়, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু প্রকাশনা সংস্থা আছে, যারা সারা বছর ধরেই বই প্রকাশ করছে। নানাভাবে বইয়ের বিপণন করছে। পাঠকের হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে একটা কথা খুব জরুরি, তা হলো—যদি ভালো বই হয়, মানসম্পন্ন হয়, প্রয়োজনীয় বই হয়, তাহলে সে বই অবশ্যই পাঠক সংগ্রহ করবেন। আমি মনে করি, এই দিকটা প্রত্যেক প্রকাশকেরই মাথায় রাখা উচিত।

আরেকটি বিষয়, কতগুলো বছর ধরে বইমেলায় ৪-৫ হাজার করে বই প্রকাশিত হয়। মানহীন বইয়ে বইমেলা ভরে যাচ্ছে। ফলে প্রতিভাবান লেখকদের লেখা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। প্রকাশকদের উচিত, ছাপার আগে পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা করা। বইটি ছাপার উপযুক্ত কি না, তা বিচার করা। খারাপ বই মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আর ভালো বই মানুষকে মানুষ হওয়ার পথ দেখায়। সঠিক মানুষ তৈরিতে লেখক, প্রকাশক দুজনেরই অনেক বড় ভূমিকা থাকে।

ইত্তেফাক/এএএম