ভয়াবহ মানবিক সংকটে ইউক্রেন 

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২২, ০৩:২১

ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসন ভয়াবহ মানবিক দুর্যোগ সৃষ্টি করেছে। কেবল ইউক্রেনে নয়, পুরো ইউরোপ জুড়েই মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। বিলাসবহুল বাড়ির বাসিন্দারাও এখন গৃহহীন হয়ে পড়েছে। আর গরীবদের কথা তো বাদই দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছে নারী ও শিশুরা। রাশিয়া যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে আবার সেটি নিজেরাই ভাঙছে।

 ইউক্রেন সরকার মস্কোর যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে নাটক বলে অভিহিত করেছে। এমনকি বেসামরিক নাগরিকরা কোন পথে দেশ ছাড়বে সেই পথও খুঁজে পাচ্ছে না। কারণ রাশিয়ার সৈন্যদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদেরকে। এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, নৃশংস এই হামলার জন্য ঈশ্বর পুতিনকে ক্ষমা করবে না।

আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্হা রেডক্রস জানিয়েছে, মারিউপোল থেকে বের হবার পথে মাইন বসানো রয়েছে। ফলে ভয়ে সেখান দিয়ে কেউ বের হতে পারছে না। এরই মধ্যে ওষুধ ও খাবার বিতরণ করতে গিয়ে রুশ সৈন্যদের গুলিতে একটি শহরের
মেয়র নিহত হয়েছেন।

মার্কিন গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, রাশিয়া সিরিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধাদের ইউক্রেনে লড়াইয়ে নিয়োগ দিচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ন্যাটো অঞ্চলের প্রতি ইঞ্চি মাটি রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিব্ধ যুক্তরাষ্ট্র।

মানবিক সংকট কতোটা গুরুতর

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্হা জানিয়েছে, প্রায় দুই লাখ বেসামরিক নাগরিক নিজ দেশেই শরণার্থী হয়ে পড়েছে। ১৫ লাখের বেশি মানুষ হাঙেরি, পোল্যান্ড এবং মলদোভাসহ কয়েকটি প্রতিবেশি দেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ ধারণা করছে, সাড়ে চার কোটির দেশ ইউক্রেনের ৭০ লাখ মানুষ দেশের মধ্যেই বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়বে এবং দেশ ছাড়তে পারে ৫০ লাখ মানুষ। ১৯৯০ সালের বলকান যুদ্ধের পর এতো বড় শরণার্থী সংকট দেখা যায়নি।

প্রায় চারশ’ বেসামরিক নাগরিকের প্রাণ গেছে রুশ সেনাদের গুলিতে। আহত হয়েছে সহস্রাধিক। জনবহুল অধুষ্যিত এলাকায় রাশিয়ার সেনারা বেশি করে হামলা চালাচ্ছে। ফলে সাবওয়ে স্টেশনে মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে। এসব স্টেশন যেন শরণার্থী ক্যাম্পে পরিণত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ পানি, বিদ্যুত এবং খাবার সংকটে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন, রাশিয়া আর্টিলারি, গোলা, রকেট এবং অন্যান্য অস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে। এসব অস্ত্র দিয়ে হামলার কারণে বেসামরিক নাগরিক অধু্যষিত এলাকার নাগরিকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে চেরনিহিভ, খারকিভ, কিয়েভ এবং মারিউপোলে বেশি হতাহত এবং মানুষের ঘর ছাড়ার ঘটনা ঘটছে। এরই মধ্যে আবার ইউক্রেনে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। দেশটির মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ দুই ডোজ টিকা নিয়েছে।

স্বাস্হ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন টিকা দেওয়াটা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়ার সৈন্যরা হাসপাতালেও হামলা চালাচ্ছে। ফলে স্বাস্হ্যব্যবস্হাও মহাসংকটে পড়েছে।

ইউরোপীয় দেশগুলো কীভাবে সাড়া দিচ্ছে?

ইউক্রেনের নাগরিকদের গ্রহণে দ্রুত সাড়া দিচ্ছে ইউরোপীয় দেশগুলো। পোল্যান্ড তো অনেক আগে থেকেই প্রস্ত্ততি নিয়ে রেখেছে। দেশটির সরকার আশা করছে, সেখানে ১৫ লাখ ইউক্রেনিয়ান আসতে পারে। ইতিমধ্যে ছয় লাখের বেশি আশ্রয় নিয়েছে। বাকি শরণার্থীরা বেলারুশ, হাঙ্গেরি, মলদোভা, রোমানিয়া এবং ইউরোপের আরো কিছু দেশে আশ্রয় নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউক্রেনে মানবিক সহায়তার জন্য ১০ বিলিয়ন ডলার এবং করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ২২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্রিটেনে একটি মানবিক সহায়তা তহবিল গঠন করা হয়েছে যেখানে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথও অর্থ সহায়তা করেছেন।

মানবিক সংকটে জাতিসংঘের সাড়া

রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের স্হায়ী সদস্য হলেও জাতিসংঘ মস্কোর ইউক্রেনে হামলার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নিরাপত্তা পরিষদে ১৫ সদস্যের মধ্যে ১১ সদস্যই যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেও ১৪১-৫ ভোটে নিন্দা প্রস্তাব পাশ হয় এবং ইউক্রেন থেকে রুশ সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। এরই মধ্যে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্হা মানবিক সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তেনিয় গুতেরেস দ্রুত দুর্যোগ বিষয়ক সমন্বয়ক নিয়োগ দেন। এছাড়া জাতিসংঘের সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সি রেসপন্স ফান্ডের মাধ্যমে ২০ মিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে শরণার্থী সংস্হা ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে। মানবিক সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য গতকাল নিরাপত্তা  পরিষদের বৈঠক করার কথা।

রাশিয়ার করিডোর প্রস্তাব পুরোপুরি অনৈতিক: ইউক্রেন

ইউক্রেন বলছে, মানবিক করিডোরের নামে শরণার্থীদের বেলারুশ অথবা রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার রুশ প্রস্তাব পুরোপুরি অনৈতিক। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদামির জেলেনস্কির একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইউক্রেনের বাসিন্দাদের তাদের বাড়িঘর ছেড়ে ইউক্রেনের ভূখণ্ডের ভেতর দিয়েই যাতায়াত করার সুযোগ থাকা উচিত। মানুষের দুর্দশাকে ব্যবহার করে টেলিভিশনের গল্প তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অফ দি রেড ক্রস (আইসিআরসি) পরিচালক (অপারেশন্স) ডোমিনিক স্টিলহার্ট জানান, দুই পক্ষের মধ্যে পরিষ্কার, কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট একটি সমঝোতা তৈরি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেছেন, রবিবার আইসিআরসির কিছু মারিউপোলের একটি পথ দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তারা বুঝতে পারেন, তারা যেদিকে যাচ্ছেন, সেখানে রাস্তায় মাইন পোতা রয়েছে। গতকালও মানবিক করিডোর তৈরি করে দিতে ইউক্রেনের চার শহরে সাময়িক যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করে রাশিয়া। যদিও একে আমল দিতে নারাজ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তার অভিযোগ, এর আগে দুইবার মারিউপোল ও ভলনোভাখা শহরে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে রাশিয়া প্রতিবারই সেটি ভেঙে হামলা চালিয়েছে।

রুশ সেনাদের গুলিতে মেয়র নিহত

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কাছের হোস্তোমেল শহরের মেয়র গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। শহর কর্তৃপক্ষ ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছে, মেয়র ইউরি ইলিচ প্রাইলিপকো খাবার ও ওষুধ বিতরণ করছিলেন। এ সময় অপর দুজনসহ তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। বাকি দু’জনের পরিচয় ফেসবুকে জানানো হয়নি।

ঈশ্বর ক্ষমা করবে না: জেলেনস্কি

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য ঈশ্বর রাশিয়া এবং এর প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ক্ষমা করবে না। জেলেনস্কি বলেন, আজ রবিবার ক্ষমার দিন। কিন্তু আমরা আমাদের ওপর নৃশংসতা চালানোর জন্য রাশিয়াকে ক্ষমা করবো। তিনি বরেন, ঈশ্বরও নন, আজ, কাল এবং কখনোই ঈশ্বর রাশিয়াকে ক্ষমা করবে না।

 

 

ইত্তেফাক/এসআর