হাতিরঝিল তুমি কার

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২২, ১৬:১০

রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন, পয়ঃনিষ্কাশন ও যানজট দূর করতে প্রায় ২ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৩ সালে চালু করা হয় দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিল প্রকল্প। অল্প সময়ে নগরবাসীর কাছে বিনোদনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে হাতিরঝিল। তবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সড়কবাতি না জ্বলা, সুয়ারেজ লাইন বন্ধ, যেখানে সেখানে আবর্জনা, ঝিলের কালচে দূষিত পানি ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এতে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য।

জানা গেছে, হাতিরঝিলের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এতদিন দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গেলো বছরের জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ প্রকল্প বুঝিয়ে দেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক)। রাজউক দায়িত্ব পাওয়ার পর বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা হাতিরঝিলের। এ অব্যবস্থাপনার কারণে প্রশ্ন উঠেছে, আদতে হাতিরঝিলের রক্ষণাবেক্ষণের দেখভাল করছে কে?

হাতিরঝিল। ছবি: আব্দুল গনি
সরজমিনে দেখা যায়, চরম অব্যবস্থাপনায় নাকাল রাজধানীর হাতিরঝিল। মধুবাগের বেগুনবাড়ি এলাকার ওয়াকওয়ের ওপর নির্মিত ড্রেনগুলোর গ্রিল চুরি হয়ে গেছে। বে-খেয়ালে চললে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন পথচারীরা। ঝিলের বিভিন্ন স্থানে উন্মুক্তভাবে মলমূত্র ত্যাগ করতেও দেখা গেছে অনেককে এবং বিভিন্ন স্থানে উপচে পড়ছে গৃহস্থালি ও দোকানের বর্জ্য। অরক্ষিত ওয়াকওয়ে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধও। প্রকল্প এলাকাজুড়ে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের বেশ কয়েকটি স্পেশাল সুয়ারেজ ডাইভারসন স্ট্রাকচার (এসএসডিএস) এরই মধ্যে ব্লক হয়ে গেছে।

আবর্জনায় সয়লাব হাতিরঝিল

হাতিরঝিলে ঘুরতে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে বিনোদনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল হাতিরঝিল। এখন আশপাশের এলাকার স্থানীয়রা যেখানে সেখানে ময়লা ফেলছে। ডাস্টবিন নেই, ওয়াকওয়ে ভাঙা, কোথাও কোথাও ড্রেনের ওপর স্লাব নেই, কোথাও কোথাও সড়কবাতিও নেই, নেই ফুলের বাগান। এমনকি লেকের পানিও দূষিত হয়ে গেছে।’

তাদের অভিযোগ যথাযথ রক্ষণা-বেক্ষণের অভাবে হাতিরঝিলের সৌন্দর্য দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। 

ভাঙা ওয়াকওয়ে, চুরি হয়ে গেছে ড্রেনের স্ল্যাব।

হাতিরঝিলের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (ইঞ্জিনিয়ার) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী (অব.) ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘হাতিরঝিলের বর্তমান অবস্থা কিছুটা খারাপ। মানুষ সচেতন না, তাই তারা হাতিরঝিলের যেখানে সেখানে ময়লা আর্বজনা ফেলছে। তবে রাজউক চেষ্টা করছে হাতিরঝিল প্রকল্পকে আগের রূপে ফেরাতে।’

এদিকে হাতিরঝিলের দায়িত্ব পেতে আগ্রহ দেখিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এখনও সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউক। তবে সায় না পেলেও তৎপর রয়েছেন ডিএনসিসি’র মেয়র।

মিটিংয়ে মেয়র আতিক

গত বছরের ২৫ এপ্রিল হাতিরঝিলে মহানগর আর্মি ক্যাম্পে হাতিরঝিল সংলগ্ন এলাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে করণীয় এক সভায় ডিএনসিসি’র মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘নান্দনিক হাতিরঝিলে আগের ভাবমূর্তি নেই। এটি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হাতিরঝিলের ভেতরে তরল বর্জ্যের যে ড্রেনগুলো আছে তার ৭০ ভাগই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টি হলে পানি নামতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাতিরঝিলের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে দরকার সঠিক ব্যবস্থাপনা। সেজন্য আমি বলেছি রাজউকের যদি সক্ষমতা না থাকে, এটিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে যেমন করে খাল দেওয়া হয়েছে সেরকম খালের পাশাপাশি এই লেকটিও যেন দিয়ে দেওয়া হয়। তাই যতদিন পর্যন্ত হাতিরঝিল আমাদের কাছে হস্তান্তর না হবে, ততদিন পর্যন্ত সকল দায়-দায়িত্ব (দুর্গন্ধ, সংশ্লিষ্ট এলাকার জলাবদ্ধতা) রাজউককে নিতে হবে।’

রাজউক ভবন

এ অবস্থায় গত বছরের ১৬ অক্টোবর রাজধানীর একটি হোটেলে এক অনুষ্ঠানে হাতিরঝিলের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘হাতিরঝিলের পানির যে অবস্থা দেখলাম, এভাবে চলতে পারে না। আমরা তা নিয়ে শিগগিরই বসবো। দায়িত্ব নিয়ে কাজ না করলে চলবে না। যে যে কাজের জন্য যোগ্য তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হবে।’

জানা গেছে, হাতিরঝিল প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণে বছরে প্রায় ১৮ কোটি টাকা প্রয়োজন। কিন্তু হাতিরঝিলের ভেতরে দোকানপাট বরাদ্দসহ অন্যান্য খাত থেকে আসে প্রায় ১০ কোটি টাকা। বাকি টাকার ঘাটতি টানতে গেলে বছরে অনেক টাকা বাড়তি গুণতে হয়। এ কারণে আলোচ্য প্রকল্পের বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন প্রস্তাবের বার্ষিক খরচ ১৭ কোটি ৭৮ লাখ ৩৫ হাজার ৫১৬ টাকা সরকারি কর্মসূচি ব্যয় হিসেবে সংগ্রহ করার লক্ষ্যে প্রকল্পের প্রস্তাব প্রস্তুত করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হলেও মন্ত্রণালয় থেকে এই টাকা দিতে অপারগতা জানানো হয়। এমনকি মন্ত্রণালয় থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় এই অর্থ রাজউককেই বহন করতে হবে। এমন অবস্থায় রাজউক এই অর্থ কোন খাত থেকে বহন করবে তা ঠিক করতে পারছে না। ফলে এ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা।

রাজউক চেয়ারম্যান এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী। ছবি: তানভীর আহমেদ

হাতিরঝিল প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণে বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) চেয়ারম্যান এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘হাতিরঝিল প্রকল্পে এত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বরাদ্দের অভাবে বিশেষ কিছু করা যাচ্ছে না। আর হাতিরঝিল প্রকল্প রাজউকের আওতাধীন থাকবে। প্রকল্পের আইনশৃঙ্খলা, চক্রাকার বাস সার্ভিস, বাগান পরিষ্কার ও জলাধার পরিষ্কারসহ সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।’

 

 

 

 

ইত্তেফাক/এসজেড