‘সিলেট বিমানবন্দরের সামনে ছিল চেঙ্গের খাল। এই বিমানবন্দর ঘিরে পাকিস্তানি সৈন্যদের শক্ত ডিফেন্স ছিল। এটা উঁচু জায়গায় হওয়ায় সেখানে অপারেশন অনেক কঠিন ছিল। এটা ডিসেম্বরের শুরুর দিকের ঘটনা। এক দিন রাতের আঁধারে আমি দেড় শ ফোর্স নিয়ে খালের পাশে আঙ্গারপুর গ্রামে ঘাঁটি গাড়লাম। তখনো ওরা বুঝতে পারেনি। কয়েকটি বাঙ্কার করে আমরা অবস্থান নিয়েছি। সকাল ১১টার দিকে লাল শাড়ি পরে একটি কিশোরী মেয়ে আমাদের বাঙ্কারের পাশ দিয়ে কলসি নিয়ে খালে পানি আনতে যাচ্ছিল। আমাদের একজন মেয়েটির কাছে খাবার পানি চাইল। তখন আমরা অনেক ক্লান্ত। মেয়েটি ফেরার সময় যখন কলসি থেকে পানি ঢেলে দিচ্ছিল, তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের অবস্থান বুঝতে পেরে ব্রাশফায়ার শুরু করে। গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে মুহূর্তেই মেয়েটি লুটিয়ে পড়ল। তখন আমরা পিছু হটেছি, কিন্তু মেয়েটির আর খোঁজ নেওয়া হয়নি। ইতিহাসের কোথাও হয়তো মেয়েটির নাম লেখা নেই। অথচ আমাদের জন্য তাকে জীবন দিতে হয়েছে। পরে ৬ ডিসেম্বর আমরা বিমানবন্দর দখল করে বাংলাদেশের পতাকা উড়াই।’ ইত্তেফাকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বর্ণণা দিতে গিয়ে এভাবেই বলছিলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) তাহের উদ্দিন আখন্জি।
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি জগন্নাথ কলেজে ডিগ্রি ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। থাকতাম জগন্নাথ হলে। ৭ মার্চ হল থেকে বিশাল মিছিল নিয়ে আমরা রেসকোর্স ময়দানে গেলাম। মঞ্চের একেবারে সামনের উত্তর-পূর্ব দিকে আমাদের জন্য নির্ধারিত জায়গা ছিল। এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করছিল। কারণ আমরা আগে থেকেই কানাঘুষা শুনতাম বঙ্গবন্ধু এদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে রাতে হলে ফেরার পর এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করছিল আমাদের মধ্যে। পরিস্হিতির অবনতি হওয়ায় পরদিনই মহাখালীতে এলাকার এক বড় ভাইয়ের বাসায় চলে গেলাম। পরিস্হিতি খারাপ হওয়ায় বাড়িও যেতে পারছি না। ২৫ মার্চ রাতে বিকট গোলাগুলির পর পরিস্হিতি বুঝতে ২৬ মার্চ ভোর ৫টার দিকে রাস্তায় বের হলাম। সুনসান নীরব রাস্তায় কোনো মানুষ নেই। দূরে একটি ভ্যান আসতে দেখলাম। কাছে গিয়ে দেখি বীভত্স একটা লাশ নিয়ে যাচ্ছে ঐ ভ্যানচালক। ভয়ে দ্রুত বাসায় ফিরি। ঐদিনই ঐ বড় ভাইসহ আরো কয়েক জন মিলে গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের বাহুবল থানার যাদবপুর গ্রামে।’
এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, গ্রামের বাড়ি ফিরে দেখি, ছাত্রনেতা মাহবুবুর রব সানি ভাই স্থানীয় যুবকদের কাঠের রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। আগে থেকে স্কাউটে যুক্ত থাকায় আমিও প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলাম। এপ্রিলের ৪/৫ তারিখের দিকে আমরা সাত/আট জন মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, এভাবে হবে না। আমরা যুদ্ধে যাব। স্থানীয় জান্টু ভাই তার জিপ দিলেন। ঐ জিপে আমরা দিলকুশা চা-বাগানের ক্যাম্পে যোগ দিলাম। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মানিক চৌধুরী এমপি ঐ ক্যাম্পটা চালাতেন। পরদিন সেখান থেকে ভারতের ইন্দ্রনগর পাঠিয়ে দেওয়া হলো। সেখানে ভারতের কয়েক জন অফিসারের সঙ্গে মেজর জামান আমাদের রিসিভ করলেন। সেখানে দেখি কয়েক শ মানুষ এসেছেন যুদ্ধে যোগ দিতে। সেখানে মূলত
শারীরিক, মানসিক, রণকৌশল এবং মোটিভেশন আমাদের শেখানো হতো। তারা আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন, তোমাদের দেশ শত্রু দ্বারা আক্রান্ত, তোমাদের যুদ্ধ করে দেশ শত্রুমুক্ত করতে হবে। ২১ দিনের ট্রেনিং শেষ হলো। সেখান থেকে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো সিলেটের কমলগঞ্জের বরপুঞ্জি ক্যাম্পে। এই ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন রব। সেখানে আমি ডেমুলেশন (বিস্ফোরক দিয়ে স্থাপনা উড়িয়ে দেওয়া) টিমের দায়িত্ব পেলাম।
এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘আমার প্রথম দায়িত্ব পড়ল একটি ব্রিজ উড়িয়ে দিতে হবে। সাত জন যোদ্ধাকে নিয়ে আমরা রওনা দিলাম ক্যাম্প থেকে তিন মাইল দূরে একটি ব্রিজ উড়িয়ে দিতে। এক্সপ্লোসিভের পাশাপাশি আমাদের স্টেনগান, রাইফেল আর গ্রেনেড দেওয়া হয়েছে। বিলের মধ্য দিয়ে গাইড আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন ব্রিজের কাছাকাছি তখন গাইড জানাল, রাজাকার আর মিলেশিয়ারা ব্রিজ পাহারা দিচ্ছে। আমরা পজিশন নিলাম। তখন আমাদের পাশ দিয়ে একটা কুকুর যাচ্ছিল। আমার সঙ্গে থাকা নিজাম (বীরবিক্রম) কুকুরটিকে রুটি খেতে দিল। এরপর কৌশলে সেটাকে বস্তায় ভরা হলো। এক্সপ্লোসিভ ঐ বস্তায় ভরে কুকুরটিকে রাজাকারদের দিকে ঠেলে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হলো কুকুরটিও মারা গেল। হামলা মনে করে, তখন রাজাকাররা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করল। আমরা চুপ করে অবস্থান করতে থাকলাম। ঘণ্টাখানেক গুলি চালানোর পর ওরা ভয় পেয়ে ওখান থেকে পালিয়ে গেল। একপর্যায়ে আমরা ব্রিজে বিস্ফোরক সেট করে উড়িয়ে দিলাম। সফলভাবে শেষ হলো প্রথম অপারেশন।’
এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, জুনের শেষ দিকে আমাদের ক্যাম্পে কর্নেল রব এলেন। শিক্ষিত যোদ্ধাদের তিনি লাইনে দাঁড় করালেন। সেখান থেকে ১২ জনকে বাছাই করে মাছিমপুরে পাঠানো হলো। পরীক্ষা দিয়ে আমরা পাঁচ জন টিকে গেলাম। ফাস্ট ওয়ারকোর্সে ৬১ জন অফিসারের একজন এই মুক্তিযোদ্ধা। ৯ অক্টোবর পাসিং আউটের পর তিনিসহ চার জনকে পাঠানো হলো ৫ নম্বর সেক্টরে। শিলংয়ে ছিল এর সদর দপ্তর। আর টেকনিক্যাল হেডকোয়ার্টার ছিল বাংলাদেশের সীমান্েতর মধ্যে বাঁশতলা। আমাকে সেখানে পাঠানো হলো। আমি পেলাম ভোলাগঞ্জ সাব সেক্টরের কমান্ডার অপারেশনের দায়িত্ব। দেশের মধ্যে তেলিখালী গ্রামে চেয়ারম্যান আতাউর রহমানের বাড়িতে ছিল রাজাকারদের ক্যাম্প। রাতে রাজাকাররা এটা পাহারা দিত, দিনে পাকিস্তানি সৈন্যরা আসত। এখানে সাধারণ মানুষকে নির্যাতন করা হতো। এই ক্যাম্পের কারণে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ভেতরে ঢুকতে পারত না। এই ক্যাম্প ধ্বংসের দায়িত্ব পেলাম আমি—বলছিলেন এই যোদ্ধা। এটা অক্টোবরের ২২/২৩ তারিখ হবে। অপারেশনের জন্য ৩৫ জনের একটা টিম তৈরি করলাম। কয়েকদিন রেকি করার পর এক দিন রাতের আঁধারে বেড়িয়ে পড়লাম। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আজান দিলেই অপারেশন শুরু হবে। ১২ জন ঐ বাড়ির সামনে, ১২ জন পেছনে অস্ত্র নিয়ে আর ১১ জন গ্রেনেড নিক্ষেপ করবে। ঐ বাড়ির সামনে পেছনে কয়েকটি বাংকার ছিল। সেখানে গ্রেনেড মারা হলো। শুরু হলো গোলাগুলি। এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে ওরা পালিয়ে গেল। আতাউর চেয়ারম্যানও গুলিবিদ্ধ হয়ে পালিয়ে গেলেন। অপারেশনের পর সেখানে আমরা তিন জন রাজাকারের লাশ পেলাম।
এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলছিলেন, আমাদের ভোলাগঞ্জ সাব সেক্টরের দায়িত্ব ছিল সিলেট বিমানবন্দর থেকে ছাতক পর্যন্ত। এবার আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল বর্ণী গ্রামে ক্যাম্প করতে হবে। দুই কোম্পানির প্রায় ৩০০ যোদ্ধা নিয়ে ৫ নভেম্বর নৌকায়-হেঁটে রওনা দিলাম। আমাদের কাছে খবর ছিল, ঐ গ্রাম ফাঁকা। আমরা যখন গ্রামের খুব কাছে, তখন আমাদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু হলো। অপ্রস্ত্তত থাকার পরও আমরা পালটা ফায়ার করলাম। বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা পিছু হটতে শুরু করেছি। এর মধ্যে আমিসহ চার জন আটকে পড়লাম। কাদার মধ্যে আটকে গেলাম। মাথার ওপর কচুরিপানা নিয়ে রাত পার করলাম। এর মধ্যে ওদের গুলি আমাদের মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। ভোরের দিকে দুই দিক থেকে গুলি আসতে শুরু করল। অর্থাত্ পেছন দিক থেকে আমাদের অতিরিক্ত ফোর্স এসে কাভার দিচ্ছে। পরে গোলাগুলি বন্ধ হলো। মূলত আমাদের আগেই ওরা বর্ণী গ্রামে ক্যাম্প করে ফেলেছিল। এই যুদ্ধে আমরা জিততে না পারলেও পরদিন ওরা বর্ণী গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরের সপ্তাহেই আমরা বর্ণী গ্রাম দখল করে সেখানে ক্যাম্প স্থাপন করি।
এই মুক্তিযোদ্ধা বলছিলেন, এভাবেই একের পর এক সফল যুদ্ধে এসেছে আমাদের জয়। ১৯৮২ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর পল্লী বিদু্যত্, পেট্টোবাংলা, যমুনা ব্রিজ, এফডিসিসহ অনেক জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এই মুক্তিযোদ্ধা। তার বড় ভাই পুলিশ কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন আখনজি চট্টগ্রামে যুদ্ধ করতে গিয়ে শহিদ হয়েছেন। তার চাচা আজির উদ্দিনও একজন মুক্তিযোদ্ধা।
