শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইত্তেফাকের ওয়েবিনারে বক্তারা

'২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি'

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২২, ২২:২৮

শিশু সম্পর্কিত আইন ও নীতিমালার সাথে আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থার আইনে বয়সের ক্ষেত্রে অসামঞ্জসতা আছে। বিভিন্ন সংস্থা শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আইএলও কনভেশন ১৩৮ ধারা সমর্থনের তাগিদ থাকলেও তা সমর্থন করছে না সরকার।

করোনাকালে শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো বেড়েছে। বেড়েছে সবধরনের শিশুশ্রম। তাই ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসনের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পূরণে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, সমন্বয় করে সম্মিলিতভাবে কাজ করলে নতুন লক্ষ্য মাত্রা অর্জনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

বৃহস্পতিবার (১০ মার্চ) সকালে দৈনিক ইত্তেফাক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এডুকো বাংলাদেশ  আয়োজিত ‘বাংলাদেশের শিশুশ্রম: অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যত পরিকল্পনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রকাশ ওয়েবিনারে এসব কথা বলেন তারা।

অনুষ্ঠানে দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা বেগম এনডিসি। ওয়েবিনারের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন এডুকো বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুল হামিদ।

অনুষ্ঠানে শ্রম ও কর্ম সংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব খন্দকার মো. নাজমুল হুদা শামীম নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। গবেষণার উপর দুটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন শিশুশ্রম বিশেষজ্ঞ শরফুদ্দিন খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাজমুজ্জমান ভূইয়াঁ।

আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ পরিষদের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী, আইএলও’র জাতীয় পরিকল্পনা সমন্বয়ক সৈয়দা মুনিরা সুলতানা, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম-মহাপরিদর্শক  ড. মুস্তাফিজুর রহমান, ইনসিডিন বাংলাদেশের নিবার্হী পরিচালক এ কে এম মাসুদ আলী, শাপলা নীড়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর টমোকো উচিয়ামা, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের রাফিজা শাহীন প্রমুখ।

নাসিমা বেগম এনডিসি বলেন, শিশুশ্রম কেন হয় তার মূল কারণ নির্ধারণ করে কাজ করতে হবে। আমাদের দেশে দরিদ্র বাবা-মা তাদের শিশুদের শ্রমে পাঠাতে বাধ্য হয়। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের তালিকা ক্রমনুসারে নির্ধারণ করে গুরুত্বের ভিত্তিতে কাজ করার সুপারিশ করেন তিনি।

ডাস্টবিনে আবর্জনা সংগ্রহ করার মতো কাজের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব কাজে শিশুর জীবনই নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের দেশে প্রাকৃতিক দুযোর্গ শিশুশ্রম বাড়িয়ে দেয়। তবে যারা শিশু আইন ভঙ্গ করে তাদের জন্য শাস্তি বাড়ালে কোন প্রভাব পরবে না। ধষর্ণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড করার পর ধর্ষণ কমেনি। তাই শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপনের উপর জোর দেন তিনি।

ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, ২০১৩ সালের পর আমাদের শিশুশ্রম নিরসনে কোন সার্ভে নেই। কাজ করতে হলে সময়োপযোগী তথ্য প্রয়োজন। তবে আশার কথা হচ্ছে নতুন সার্ভের কথা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে করা হচ্ছে। বেশির ভাগ কাজ হয় প্রজেক্ট নির্ভর। মেয়াদ শেষ হলে কাজ শেষ হয়, কিন্তু সমস্যা পুরোপুরি শেষ হয়না। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব দেন তিনি। 

বাল্যবিয়েকে শিশুশ্রমের সাথে সম্পৃক্ত করার কথা উল্লেখ করে তাসমিমা হোসেন বলেন, আজকের আলোচনায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। শিশুশ্রম নিরসনে এগুলো ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।

অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, শিশুশ্রম বিরোধের যে মামলাগুলো হয় তার বেশির ভাগই আপোষ মিমাংসার মাধ্যমে শেষ হয়। অনেক ক্ষেত্রে আইনের র্দীঘসূত্রিতা বিচার প্রাপ্তিকে অনিশ্চিত করে।

সৈয়দা মুনিরা সুলতানা আইনের শাস্তি বাড়ানোর উপর গুরুত্বারোপ করেন। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাকে ১৪ বছর করারা কথা বলেন তিনি।

ড. মুস্তাফিজুর রহমান ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে গৃহশ্রমিকসহ নতুন ৬টি শিশুশ্রম যুক্ত করার কথা প্রস্তাব রাখেন। তিনি শিশুশ্রমিক নিবন্ধন করার কথা গুরুত্ব দিয়ে বলেন ২০২৫ এর মধ্যে শিশুশ্রম নিরসন করতে হলে এমন কিছু নির্দিষ্ট কাজ করতে হবে।

এ কে এম মাসুদ আলী বলেন,কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অর্থ আমরা পাই না। এবার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের যে পক্রিয়া চলছে তাতে সরকারের সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে অর্থ বরাদ্দ রয়েছে।

খন্দকার মো. নাজমুল হুদা শামীম জানান সরকার আইএলও কনভেনশন ১৩৮ ধারা সমর্থনের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করেছে। আবদুল হামিদ বলেন, দেশে ৩৫ লাখ শিশু নানারকম শ্রমে যুক্ত আছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত করা যাবে না। তারপরও এসব কাজে শিশুরা দৃশ্যমান। বাংলাদেশে শিশুদের শিক্ষা, সুরক্ষা ও সার্বিক উন্নয়নে সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে এডুকো বাংলাদেশ। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে দুটি গবেষণা করা হয়।

গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ সরকার শিশুশ্রম প্রতিরোধ ও নিরসনে অনেকগুলো আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করলেও নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার কারনে এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়নি। অন্যদিকে, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে গঠিত কমিটি সমূহ (যেমন: শিশুশ্রম কল্যাণ কমিটি) তাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে, শিশুশ্রম নিরসনে আইনি উদ্যোগ সফল হয়নি। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় (যেমন: পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা) শিশুশ্রমের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগটি বেশ আশাব্যঞ্জক হলেও প্রকৃত অর্থে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। শিশুশ্রম নিরসনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হলেও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি কিংবা অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অটিজম নিয়ে সায়মা ওয়াজেদের সঙ্গে আড্ডা রবিবার

‘দেশে ট্রান্সজেন্ডার বান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নেই’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে ২ মৃত নবজাতক উদ্ধার

শিশুদের উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার: তাসমিমা হোসেন 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ঢামেকে ময়লার স্তূপ থেকে ৮ মাসের শিশুর মরদেহ উদ্ধার

জাতিসংঘেরও আগে শিশু অধিকার আইন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু: এফবিসিসিআই সভাপতি