বাঙালির গৌরবময় অধ্যায় ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনের সূত্রপাত ১৯৪৭-এ এবং স্বীকৃতি ঘটে ১৯৭২ সালে সংবিধানে প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রভাষা বাংলা ঘোষণার মাধ্যমে। এই আন্দোলন বর্তমানে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্র‚য়ারিতে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকলেও এর রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ সালের পরিসরে। আর এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস বিস্তৃত ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত। দীর্ঘ এই ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক বিশ্বজিত্ ঘোষ ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব’ গ্রম্হে এই বিষয়গুলোকেই নির্ভরযোগ্য তথ্য, উপাত্ত ও যুক্তির সমন্বয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। বিভিন্ন গ্রম্হ, প্রবন্ধ ও তত্কালীন বিভিন্ন পত্রিকার আলোকে তিনি তথ্যগুলোর সত্যতা নিরূপণে সচেষ্ট থেকেছেন।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্র‚য়ারিতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন কারাগারে বন্দি। তাই বাহান্নোর আন্দোলনে তিনি প্রত্যক্ষভাবে উপস্হিত না থেকেও আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাহান্নোর পরবর্তী সময়ে বাংলাভাষাকে সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে গৃহীত সব আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সংশ্লিষ্টতা ছিল সরাসরি এবং প্রত্যক্ষ। আন্দোলনে নেতৃত্বদানে যাঁরা ছিলেন অগ্রগণ্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁদের একজন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ফলেই পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক সরকার তাঁকে বন্দি করেছে ১৯৪৯ সালের ২৯শে এপ্রিল। একাধিকবার গ্রেপ্তারের পর ১৯৫২ সালের ২৮শে ফেব্র‚য়ারি ফরিদপুর কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে লেখক লক্ষ করেন ১৯৪৭ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
গ্রম্হটির অবতরণিকাতে লেখক গ্রম্হের গঠন ও রূপরেখা বর্ণনার মাধ্যমে ‘মাতৃভাষা আন্দোলনে’র পরিবর্তে ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের সপক্ষে যুক্তি উপস্হাপন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভাষাশহিদরা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে আত্মত্যাগ করেন, মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য নয়। কারণ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ব্যাপক ও বিস্তৃত একটি বিষয়। একে অর্জন করতে হয়। মাতৃভাষা আমাদের জন্মসূত্রে প্রাপ্ত। এটি অর্জনে আন্দোলনের প্রয়োজন নেই। তবে মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করেই রাষ্ট্রভাষা সৃষ্টি হয়। প্রথম অধ্যায়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও পটভূমি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পৃক্ততা ও চতুর্থ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে বাঙালির ভাষা-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক পূর্ণাঙ্গ ভিত্তি রচনায় শেখ মুজিবুরের ভূমিকার বিস্তৃত আলোচনা। পাশাপাশি বাংলাভাষা ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় শেখ মুজিবুরের আমৃতু্যকৃত নানা কর্মকাণ্ডের বর্ণনা। উপসংহারে গ্রম্হের সমগ্র বিষয়ের সারসংক্ষেপ উপস্হাপন করেছেন লেখক। গ্রম্হের শেষে ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব’ শীর্ষক শিরোনামে আলোকচিত্র সংযুক্ত হয়েছে।
বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ের প্রতিটি আন্দোলনের প্রেরণা ছিল এই আন্দোলন। আর এই আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বর্তমান প্রজন্মের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানার প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে এই গ্রম্হটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বললে অতু্যক্তি হবে না।
গ্রম্হটি প্রকাশ করেছে ‘ধী প্রকাশ’, মূল্য ৫০০ টাকা।
