সবার ওপরে যুদ্ধ বড়!

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২২, ০৪:৫৯

মানব জাতির উষালগ্ন থেকেই অস্তিত্ব রক্ষা এবং ক্ষমতা বিস্তারের জন্য যুদ্ধকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যুদ্ধের নৃতাত্ত্বিক মূল্যায়নের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। যুদ্ধ শব্দটির বেশ কয়েকটি প্রতিশব্দ আছে—সংগ্রাম, রণ, সমর, লড়াই। এর মধ্যে ‘সংগ্রাম’ শব্দটি যে বোধে ব্যবহূত হয়, তা অনেকটাই সম্মানজনক। প্রকৃতিতে টিকে থাকার সংগ্রাম, উত্পীড়কের হাত থেকে বাঁচার সংগ্রাম। যুদ্ধ বা লড়াইকে একই অর্থে ব্যবহার করা হয় অবশ্যই, এবং আরো হতে থাকলে ঐ দুটি শব্দও ক্রমশ সম্মানিত হতে থাকবে। রণ—একেবারেই তীব্র যুদ্ধগন্ধী। ভীষণ রকম সভ্য নগরীয়। তাদের মানায় যারা যুদ্ধ আয়োজন করে। তুলনামূলকভাবে ইংরেজিতে ডধত্ শব্দটি অনেকটা যুক্তিপূর্ণ। প্রোটো জার্মান শব্দ ডবত্ত্ড় থেকে এর উত্পত্তি। এর অর্থ—গড়বড়, ভ্যাবাচ্যাকা বা সংশয়গ্রস্ত দশা। এই সংশয় থেকেই যুদ্ধের আয়োজন।

যুদ্ধ মূলত আয়োজিত হয় মানুষের মনে। এর প্রধান কারণ হলো—নিরাপত্তাহীনতাজনিত সংশয় ও ভীতি। সাধারণত একটি একক মানুষের মনেই যুদ্ধেচ্ছা জাগে। ক্রমে সে সেটা ছড়িয়ে দেয় তার গোষ্ঠীতে। যে নিজের ইচ্ছা বিবিধে সঞ্চারিত করতে পারে সে অবশ্যই জননেতা। অনেকের মধ্যেই এই প্রবণতা থাকা স্বাভাবিক কিন্তু গোষ্ঠিপতি হওয়ার যে প্রবল পুরুষগুণ, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এই অনর্থক যুদ্ধেচ্ছাকে কার্যকর করার ত্রুটি। যে প্রকৃতিতে প্রবল, তার এই স্বভাবের মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতাজনিত সংশয় ও ভীতির উপস্হিতিও প্রবল। মানুষ শুরুতে থাকত গুহায়। গোষ্ঠিবদ্ধভাবেই। প্রকৃতি মানুষকে বুদ্ধি যতটা দিয়েছিল সেই অনুপাতে দৈহিক শক্তি দেয়নি, অন্যান্য পশুর অনুপাতে যারা খাদ্যশৃঙ্খলে ওপরের শ্রেণিতে। বর্তমানেও তাই। একটা বাঘ এমনকি একটা নেকড়ের সঙ্গেও মানুষ অস্ত্র ছাড়া এঁটে উঠতে পারবে না। মানুষের বুদ্ধির সঙ্গে শক্তি সমানুপাতে থাকলে বিশ্বের সব প্রাণী লুপ্ত হতো অচিরেই। তাই প্রকৃতির এই ব্যবস্হা। বুদ্ধিই হলো মানুষের চরিত্রের পরিচায়ক। মানুষ বুদ্ধি খাটিয়ে সংঘবদ্ধতা অভ্যাস করল। প্রকৃতিগতভাবেই গোষ্ঠী হলেই তার নেতা প্রয়োজন। এই নেতা অবশ্যই পুরুষ, কারণ বাহ্যিকভাবে দৈহিক শক্তিই পশুবত্ তত্কালীন মানুষের সেরা স্বীকৃত গুণ ছিল। সেটি ছিল অবশ্যই রজোগুণ। যে গোষ্ঠী শান্ত, স্বাভাবিক জীবনযাপন করত, তার নেতা অবশ্যই সত্গুণ সম্পন্ন ব্যক্তি। রজোগুণের যে সমস্ত ইঙ্গিত অশান্তি ডেকে আনত তা সহজেই অনুমান করা যায়। এই অশান্তির প্রধান দুটি উপাদান হলো খাদ্য ও নারী। জীববিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মানুষের দেহের গঠন যুগ্মভাবে একগামিতা ও বহুগামিতাকে সমর্থন করে। নারীর সংখ্যা পুরুষের থেকে গুহাবাস পর্যায়ে কম ছিল এবং অন্যান্য প্রাণীর হাত থেকে বাঁচার তাগিদে পুরুষের সংখ্যা বেশি রাখতে প্রকৃতি বাধ্য ছিল। এমত অবস্হায় গোষ্ঠিপতি পুরুষটি যদি তার রজোগুণ প্রয়োগ করতে চায় তবে গোষ্ঠীর ভেতরে দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী। এমনটা সব পশুগোষ্ঠীর মধ্যেই দেখা যায়।

এটা তো আদি মানুষের যুদ্ধ। কিন্তু মানুষ যখন ক্রমশ সভ্য হতে থাকে তখন যুদ্ধের ভূগোল ও উপকরণ পরিবর্তিত হতে থাকে। সভ্যতা নামক এক ফানুসে চেপে যুদ্ধে সম্পৃক্ত হতে হতে সমাজ অগ্রসর হচ্ছিল। মূলত কৃষিজমির সংকুলতা ভৌগোলিক স্হান নির্বাচন ছিল যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিজ্ঞানের সঙ্গে যুদ্ধের এক সমানুপাতিক সম্পর্ক। প্রযুক্তির যত উন্নয়ন যুদ্ধের ক্রমবিকাশ তত দ্রুত। সব সমাজ অবশ্যই একরকম ছিল না। প্রায় সাত হাজার বছর আগে তামা এলো মানুষের হাতে। মধ্য ইউরোপে সবার আগে। এবং অব্যবহিত পরেই পশ্চিম এশিয়ায় ও তার শ পাঁচেক বছরের মধ্যেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। এবং মিশর ব্যতিরেকে আফ্রিকায় বহু শতাব্দী পরে। অস্ট্রেলিয়াতেও তাই।

যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বখ্যাত অনেক চিত্রকর্ম আছে। ১৯৩৭ সালের মে মাসে ফ্রান্সের প্যারিসে পাবলো পিকাসো আঁকতে শুরু করেন তাঁর জগত্খ্যাত চিত্রকর্ম ‘গোয়ের্নিকা’। ১৯৩৭ সালের ২৬ এপ্রিল স্পেনের স্বৈরাচার ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর অনুরোধে জার্মানি ও ইতালি যৌথভাবে আক্রমণ চালায় স্পেনের প্রত্যন্ত গের্নিকা গ্রামে। নিজের স্বদেশিদের ওপর নিষ্ঠুর এই আক্রমণের পরপরই পাবলো পিকাসো এঁকেছিলেন জগত্খ্যাত ছবি—‘গোয়ের্নিকা’। কী আছে যুদ্ধবিরোধী এই চিত্রকলায়? গোয়ের্নিকা কোনো ঘর সাজানোর জন্য চিত্রকলা নয়, শত্রুর বিরুদ্ধে এবং নিজেকে রক্ষার অস্ত্র হলো চিত্রকলা। পিকাসো চেয়েছেন, ছবিকে ছুঁতে গেলে দর্শককে রক্তাক্ত যেন হতে হয়। যেন হাজার ব্লেড পোঁতা আছে ছবির জমিনে, কাছে গিয়ে ছুঁতে গেলেই আঙুলে রক্ত ঝরবে।

পিকাসো এটা এঁকেছিলেন বিহ্বল হয়ে। তাঁর সঙ্গে সমস্ত ইউরোপও ছিল বিহ্বল। কারণ, সেসময় এমন পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক মানুষের ওপর গণহত্যা ও অস্ত্রশস্ত্রের পরীক্ষা তারা এর আগে দেখেনি।

যুদ্ধ আজ যেন সবার ওপরে সবচেয়ে বড় সত্য! সভ্যতার শিরায় শিরায় বইছে নতুন নতুন যুদ্ধ, শত-সহস্র গোয়ের্নিকা।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি