একটি হৃদপিণ্ডের কাহিনি

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২২, ০৫:২০

হ্যাঁ, এটা সত্যি! আমি অসুস্হ ছিলাম, খুব অসুস্হ। কিন্তু আপনার কেন মনে হচ্ছে যে আমি আমার মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি, কেন ভাবছেন আমি একজন পাগল? আপনি কি বুঝতে পারছেন না যে আমার মনের উপর আমার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে? আসলে এই অসুস্হতা আমার মন, আমার অনুভূতি, আমার ইন্দ্রিয়গুলিকে আরো শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে, আমার শ্রবণশক্তি আরো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিল। আমি এমন সব শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম, যা আগে কখনো শুনিনি। আমি স্বর্গ থেকে শব্দ শুনেছি; আমি জাহান্নাম থেকেও শব্দ শুনেছি!

শুনুন, আমি আপনাকে বলব কীভাবে এটি ঘটেছে। শুনলেই আপনি বুঝবেন আমার মন কতটা সুস্হ। আসলে ধারণাটি কীভাবে আমার মাথায় প্রথম ঢুকেছিল, তা বলা অসম্ভব। আমি যা করেছি তার কোনো কারণ ছিল না। আমি বৃদ্ধ মানুষটিকে ঘৃণা করতাম না; বরং আমি তাকে ভালোবাসতাম। সে কখনো আমাকে আঘাত করেনি। আমি তার টাকাও চাইনি। আমার মনে হয় সমস্যা ছিল তার চোখে। তার চোখ ছিল শকুনের চোখের মতো, সেই ভয়ংকর পাখিদের চোখ—যা কোনো প্রাণী মারা যাওয়ার অপেক্ষা করে এবং অপেক্ষা করতেই থাকে। তারপর সে মৃতদেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সেটি টুকরো টুকরো করে খেয়ে ফেলে। বৃদ্ধ যখন তার শকুনি চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকাত তখন একটা ঠান্ডা অনুভূতি আমার পিঠের ওপর দিয়ে চলে যেত। তাই, অবশেষে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম বৃদ্ধকে হত্যা করতে হবে এবং সেই চোখ চিরতরে বন্ধ করতে হবে!

এখন বলেন, আপনি কি মনে করেন আমি পাগল? একজন পাগল পরিকল্পনা করতে পারে না। কিন্তু আপনার আমাকে জানা উচিত ছিল। সেই পুরো সপ্তাহজুড়ে বৃদ্ধের সঙ্গে আমার একটি বন্ধুত্বপূর্ণ, উষ্ণ এবং আবেগময় সম্পর্ক ছিল।

প্রতি রাতে প্রায় বারোটা বাজে, আমি আস্তে আস্তে বৃদ্ধের ঘরের দরজা খুলতাম। এবং যখন দরজা অনেকখানি খোলা হতো তখন আমি আমার হাত ঢুকাতাম, এবং তারপর মাথা। আমার হাতে কাপড় দিয়ে ঢাকা একটি আলো ধরা থাকত, যাতে কোনো আলো দেখা না যায়। এবং আমি সেখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতাম। তারপর, সাবধানে, সেই কাপড়টি তুলতাম, একটু, যাতে একটি ছোট আলো তার সেই চোখের ওপর পড়ে। পুরো রাত ধরে আমি এটি করতাম, সাতটি দীর্ঘ রাত। বৃদ্ধ মানুষটির চোখ সবসময় বন্ধ থাকত, কাজেই কাজটি করা আমার পক্ষে কঠিন ছিল।

অষ্টম দিন রাতে বৃদ্ধের ঘরের দরজা খোলার সময় আমি বাড়তি সতর্ক ছিলাম। কারণ ঘড়ির কাঁটা আমার হাতের চেয়েও দ্রুত চলে। এর আগে কখনো আমি আমার নিজের শক্তিকে এত গভীরভাবে অনুভব করিনি; আমি সেদিন সফলতার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম।

বৃদ্ধটি যেখানে শুয়েছিল, সেখানে সে স্বপ্নেও ভাবেনি যে আমি তার দরজায় ছিলাম। হঠাত্ সে তার বিছানার একপাশে সরে গেল। আপনি হয়তো ভাবছেন আমি ভয় পেয়ে গেছি, কিন্তু না। সে সময় তার ঘর ছিল ঘন অন্ধকার। আমি বুঝতে পারছিলাম তিনি দরজা খোলার দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন না। আমি দরজা ধাক্কা দিতে থাকলাম, আস্তে আস্তে, খুব সাবধানে। মাথাটা একটু ঢুকিয়ে দিলাম। আমি আমার হাত দিয়ে আলোটাকে একটু আড়াল করলাম। হঠাত্ বৃদ্ধ সোজা হয়ে বিছানায় বসে কাঁদতে লাগলেন, ‘কে, কে ওখানে?’

আমি অনেকটা স্হির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। পুরো একটা ঘণ্টা আমি নড়লাম না। এর মধ্যে আমি তাকে বিছানায় শুয়ে পড়তে শুনিনি। সে শুধু বিছানায় বসেছিল, শুনছিল। তখন আমি একটা শব্দ শুনতে পেলাম, একটা চাপা কান্নার শব্দ। মনে হচ্ছে কান্নার শব্দটা বৃদ্ধ লোকটির কাছ থেকেই আসছে। আমি এখন নিশ্চিত যে সে বিছানায় বসে আছে, ভয়ে এবং আতঙ্কে। আমার অনুমান, আমি যে সেখানে ছিলাম তা সে বুঝতে পেরেছিল। যদিও সে আমাকে সরাসরি দেখেনি; আমার কথাও শুনতে পায়নি। সে শুধু সেখানে আমাকে অনুভব করেছিল। সে জানতে পেরেছিল, মৃতু্য সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।

আস্তে আস্তে, একটু একটু করে, আমি আলোর ওপরের কাপড়টা সরালাম, যাতে একটি ছোট, ছোট আলোর রেখা কাপড়ের ফাঁক গলে তার ওপর—তার সেই শকুনি চোখের ওপর পড়ে! চোখ দুটো খোলা ছিল। আমার রাগ আরো বেড়ে গেল, কারণ চোখদুটো সরাসরি আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমি বৃদ্ধ লোকটির মুখটা দেখতে পেলাম না—শুধু সেই চোখ, সেই শক্ত নীল চোখ! এবং আমার শরীরের সমস্ত রক্ত বরফের মতো শীতল হয়ে গেল।

আমি কি আপনাকে বলিনি যে আমার শ্রবণশক্তি অস্বাভাবিক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল? তখন আমি একটি দ্রুত, চাপা, মৃদু শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম, যেমন একটি দেয়ালের ওপাশ থেকে ঘড়ির শব্দ শোনা। আসলে এটি ছিল বৃদ্ধের হূদপিণ্ডের স্পন্দন। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আওয়াজটা আরো বেড়ে গেল। বৃদ্ধ লোকটি নিশ্চয়ই খুব ভয় পেয়েছিল। এবং আওয়াজ যতই বাড়তে থাকল আমার রাগ ততই যন্ত্রণাদায়ক হতে লাগল। নিস্তব্ধ রাতে, বেডরুমের অন্ধকার নীরবতায়, আমার রাগ ভয়ে রূপান্তরিত হলো—কারণ তার হূদপিণ্ড এত জোরে ধাক্কা দিচ্ছিল যে—আমি নিশ্চিত ছিলাম কেউ তা শুনে ফেলবে। শেষ পর্যন্ত সময় এসেছিল। আমি ছুটে তার ঘরে ঢুকলাম চিত্কার করতে করতে—‘মরো! মরো!’ যখন আমি বৃদ্ধের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বিছানার চাদরটি তার মুখের ওপর শক্ত করে বাঁধলাম তখন সে ভয়ে জোরে চিত্কার দিল। কয়েক মিনিটের জন্য তার হূদপিণ্ড স্পন্দিত হতে থাকে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বন্ধ হয়ে যায়। বৃদ্ধ লোকটি মারা যায়। আমি বিছানার চাদরটা সরিয়ে নিলাম এবং তার হূদপিণ্ডের ওপর কান পাতলাম। নাহ, কোনো শব্দ ছিল না। যাক সে মারা গেছে। এখন থেকে তার ভয়ার্ত চোখ আর আমাকে যন্ত্রণা দেবে না!

সুতরাং, আপনি বলতে চাচ্ছেন, আমি পাগল? আপনার বরং এটা খেয়াল করা উচিত যে লাশটি রাখার জন্য আমি কতটা সতর্ক ছিলাম যাতে কেউ এটি খুঁজে না পায়। প্রথমে আমি এর মাথা, তারপর হাত এবং পা কেটে ফেললাম। আমি খুব সতর্ক ছিলাম যেন এক ফোঁটা রক্তও মেঝেতে না পড়ে। এরপর আমি মেঝের ওপরে লাগানো তিনটি বোর্ড টেনে সরালাম এবং লাশের টুকরোগুলো সেখানে রাখলাম। তারপর আমি বোর্ডগুলি আবার আগের জায়গায় রেখে দিলাম, সাবধানে, এত সাবধানে যাতে কোনো মানুষের চোখ সেখানে না পড়ে ও বুঝতে না পারে যে—সেগুলি সরানো হয়েছিল।

যখনই আমি কাজটি শেষ করলাম তখনই যেন শুনতে পেলাম কেউ একজন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। এখন ভোর চারটা বাজে, কিন্তু ঘোর অন্ধকার। দরজা খোলার জন্য আমি স্বাভাবিকভাবেই নিচে নামলাম। দরজায় তিনজন লোক দাঁড়ানো ছিল, তিনজন পুলিশ অফিসার। কোনো একজন প্রতিবেশী বৃদ্ধের কান্না শুনে পুলিশকে ফোন করেছিল; পুলিশ অফিসার তিনজন এসেছেন জিজ্ঞাসাবাদ করতে এবং বাড়ি তল্লাশি করতে।

আমি পুলিশ অফিসারদের ভেতরে আসতে বললাম। কান্নার কথা জিজ্ঞেস করতেই বললাম, আমি নিজেই কেঁদেছিলাম, স্বপ্নে। বৃদ্ধ লোকটির কথা জিজ্ঞেস করাতে বললাম, তিনি এখানে নেই; দেশে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। আমি তাদের পুরো বাড়ি দেখাতে নিয়ে গেলাম, তাদের বললাম আপনারা চাইলে সব দেখতে পারেন, ভালোভাবে তল্লাশি করতে পারেন। সবশেষে আমি তাদের বৃদ্ধের শোবার ঘরে নিয়ে গেলাম। আমি কিছুক্ষণ কথা বলার জন্য তাদের বসতে বললাম, যেন তাদের সঙ্গে আমি একটি খেলা খেলছি।

আমার সহজ, শান্ত আচরণে পুলিশ অফিসাররা আমার কথা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিল। তাই তারা আমার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে কথা বলার জন্য বসল। যদিও আমি তাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছিলাম, কিন্তু মনে মনে চাচ্ছিলাম তারা যাতে দ্রুতই চলে যায়। আমার মাথাব্যথা করছিল এবং কানে একটি অদ্ভুত শব্দ আসছিল। আমি দ্রুত এবং জোরে কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু সেই আওয়াজটি আরো স্পষ্ট হতে লাগল। এদিকে তারা তখনো বসে গল্প করছিল।

হঠাত্ আমার মনে হলো শব্দটি শুধু আমার কানে বা আমার মাথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সেই মুহূর্তে ভয়ে আমার মুখ থেকে রক্ত সরে গিয়েছিল। আমি আরো দ্রুত এবং জোরে কথা বলতে থাকলাম। এদিকে শব্দটিও জোরালো হতে থাকল। একটি দ্রুত, নিচু, মৃদু শব্দ, যেমন একটি দেয়ালের ওপাশ থেকে শোনা ঘড়ির শব্দ। যেই শব্দটা আমি খুব ভালোভাবেই চিনি। শব্দটি এখন আরো জোরালো, আরো জোরালো হতে থাকল। মানুষগুলো যাচ্ছে না কেন? এদিকে শব্দটি জোরালো, আরো জোরালো হতে থাকল। আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং দ্রুত ঘরের মধ্যে হাঁটতে থাকলাম। আমি আমার চেয়ারটি জোরে শব্দ করে মেঝের ওপরে ঠেলে দিলাম, সেই ভয়ংকর শব্দকে আড়াল করতে। আমি আরো জোরে কথা বলতে থাকলাম। পুলিশের লোকগুলো তখনো বসে কথা বলছিল, এবং হাসাহাসি করছিল। এটা কী করে সম্ভব যে তারা সেই ভয়ংকর শব্দ শুনতে পায়নি?

না! তারা শুনেছিল! আমি নিশ্চিত ছিলাম। তারা জানত! আসলে তারাই আমার সঙ্গে খেলা খেলছিল। আমি আমার সহ্যশক্তির চেয়ে বেশি যন্ত্রণা পাচ্ছিলাম, তাদের হাসি এবং সেই ভয়ংকর শব্দ থেকে। জোরে, জোরে, শব্দটা আরো জোরে হচ্ছিল! হঠাত্ আমি আর সেটা সহ্য করতে পারলাম না। আমি মেঝের বোর্ডের দিকে ইঙ্গিত করে চিত্কার করে বললাম, ‘হ্যাঁ! হ্যাঁ, আমিই তাকে হত্যা করেছি। বোর্ডগুলি সরান এবং আপনারা নিজের চোখেই দেখতে পাবেন! আমি তাকে খুন করেছি। কিন্তু তার হূদপিণ্ডের স্পন্দন বন্ধ হচ্ছে না কেন? এটা থামছে না কেন!’

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি