মানবতার সবচেয়ে বড় জঘন্যতম অপরাধ হলো যুদ্ধবিগ্রহ। যুদ্ধ মানেই বিভীষিকা, মৃত্যু, ধ্বংস ও অশান্তি। ইসলামে প্রাথমিকভাবে সব যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম। প্রয়োজনসাপেক্ষে ইসলাম যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়েছে কিছু শর্তারোপ করে। যা বিদ্যমান থাকলে তবেই যুদ্ধ করা যাবে। প্রথমত, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও রাষ্ট্র প্রধানের অনুমতি। রাষ্ট্র অস্তিত্ব ও রাষ্ট্র প্রধানের অনুমতি বা নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে রসুল (স.) বলেন, ‘রাষ্ট্রপ্রধান হলো ঢাল, যাকে সামনে রেখে যুদ্ধ পরিচালিত হবে’ (বুখারি- ২/৫৫৩)। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র অনিরাপদ বা হুমকির সম্মুখীন হলে। অর্থাৎ শত্রুপক্ষ আক্রমণ করবে বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হলে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধনীতির অনুমোদন দেয় ইসলাম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদেরকে, যারা আক্রান্ত হয়েছে। কারণ, তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে।’ (সুরা হজ্জ-৩৯)।
তৃতীয়ত, সন্ধি ও শান্তির সুযোগ গ্রহণ। যে কোনো ধরনের যুদ্ধই ধ্বংস ও অশান্তি সৃষ্টির পথ। মানবজাতিকে যাতে ধ্বংস ও সংকটময় পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়, সেই জন্য ইসলাম যুদ্ধপূর্বে সন্ধি বা শান্তিচুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে ও নির্দেশনা দিয়েছে। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তারা যদি সন্ধির প্রতি ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো। আর আল্লাহর ওপর নির্ভর কর। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী’ (আনফাল-৬১)। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে হুদাইবিয়ার সন্ধির ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রের স্বার্থসংরক্ষণ, দাওয়াতের প্রসার ও দিনের বিজয়ে সন্ধির অবদান ছিল অনেক বেশি। যদিও বাহ্যিক বিচারে সন্ধি ছিল একটু অপমানজনক ও শত্রু পক্ষকে ছাড় দেওয়া কিন্তু এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। ইসলামে কোনো যুদ্ধ, জিহাদ বা অভিযানকে ‘ফাতহুম মুবিন’ বা সুস্পষ্ট বিজয় বলা হয়নি। কিন্তু সন্ধি চুক্তিকে সুস্পষ্ট বিজয় বলে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চতুর্থত, যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা। অর্থাৎ যদি যুদ্ধ করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ না থাকে তাহলে যুদ্ধের ময়দানে যোদ্ধাদের সঙ্গেই-বা যারা অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে সামনে আসে তাদের সঙ্গেই যুদ্ধ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করো তাদের সঙ্গে যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করো না। আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না’ (সুরা বাকারা-১৯০)। এখানেও ইসলাম ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ করার কথা বলে। জনগণের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের নিমিত্তে মাতৃভূমিকে বহিঃশত্রু ও অভ্যন্তরীণ শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য জানমাল ও জ্ঞানবুদ্ধি দ্বারা যে সংগ্রাম করা হয় সেটাই ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো, যতক্ষণ না ফিতনা দূর হয়’ (সুরা বাকারা-১৯৩)
যুদ্ধক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে সাধারণ নাগরিক, নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা আঘাত প্রাপ্ত না হয়। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যুদ্ধে তোমরা প্রতারণা বা ধোঁকার আশ্রয় নেবে না, চুক্তিভঙ্গ করবে না, কোনো মানুষ বা প্রাণীর মৃতদেহ বিকৃত করবে না বা অসম্মান করবে না, কোনো শিশু-কিশোরকে হত্যা করবে না, কোনো মহিলাকে হত্যা করবে না, কোনো গির্জাবাসী, সন্ন্যাসী বা ধর্মযাজককে হত্যা করবে না, কোনো বৃদ্ধকে হত্যা করবে না, কোনো অসুস্থ মানুষকে হত্যা করবে না, কোনো বাড়িঘর ধ্বংস করবে না, খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া গরু, উট বা কোনো প্রাণী বধ করবে না, যুদ্ধের প্রয়োজন ছাড়া কোনো গাছ কাটবে না। তোমরা দয়া ও কল্যাণ করবে, কারণ আল্লাহ দয়াকারী- কল্যাণকারীদেরকে ভালোবাসেন’ (আসসুনানুল কুবরা- ৯/৯০)। ইসলাম সব ধরনের সামরিক আগ্রাসন, নাগরিকদের ওপর বোমা নিক্ষেপ, চরমপন্থা, গণহত্যার বিরোধী। ইসলাম প্রয়োজনসাপেক্ষ যেমন ন্যায়সংগত যুদ্ধের স্বীকৃতি দিয়েছে, তেমনি শান্তিচুক্তি বা সন্ধির বিধানের প্রতি গুরুত্বারোপ করে উত্সাহিত করা হয়েছে। যাতে যুদ্ধ নামক বিভীষিকাময় কাঁটায় মানুষ ক্ষতবিক্ষত না হয়।
ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, ইসলামের যুদ্ধনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নারী, শিশু, অযোদ্ধা, বয়োবৃদ্ধ, শ্রমিক, প্রতিবন্ধীর ওপর আক্রমণ করা যাবে না, মৃত যোদ্ধার লাশের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা যাবে না, আত্মসমপর্ণকারীদের প্রতি দয়াশীল হতে হবে, যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে সদাচরণ করতে হবে, প্রয়োজন ছাড়া বৃক্ষ কর্তন করা যাবে না, পশুপাখি হত্যা করা যাবে না, ঘরবাড়ি ধ্বংস করা যাবে না ইত্যাদি।
মোদ্দা কথা, ইসলামে সামরিক যুদ্ধনীতি আক্রমণাত্মক নয়, বরং আত্মরক্ষামূলক। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন দেশে যে যুদ্ধ হচ্ছে তার প্রায় সবগুলোই আক্রমণাত্মক যুদ্ধ। সামরিক শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থ ও আধিপত্য বিস্তারে আগ্রাসী যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আক্রান্ত রাষ্ট্রকে কোণঠাসা করে ফেলছে। এতে সাধারণ নাগরিকদের জীবন বিষণ্ণ হয়ে উঠছে, যা বড় ধরনের মানব অপরাধ। ইসলাম এমন সব কার্যক্রমকে কঠোরভাবে নিষেধ করে। যুদ্ধ যেমন জাতি গোষ্ঠীর অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করে, তেমনি প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট করে এবং পৃথিবীর অন্য ভূখণ্ডে বসবাসরত মানুষের জীবনকেও সংকটময় করে তুলে। তাই সব রাষ্ট্রকে এসব জঘন্যতম মানব অপরাধ থেকে বিরত থাকা উচিত।
লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

