সম্প্রতি ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০২০’ ঘোষণা করা হয়েছে। ২৭ ক্যাটাগরির পুরস্কারে ‘শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা’ হিসেবে কাউকে পুরস্কৃত করা হয়নি। অর্থাৎ কৌতুক অভিনেতা হিসেবে কাউকে পাওয়া যায়নি। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ২০১২ থেকে ২০২০—এই ৯ বছরের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকায় দেখা যায়—২০১২, ২০১৩, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৯ সালেও কৌতুক অভিনেতা পাওয়া যায়নি। মাঝে ২০১৪ সালে ‘অল্প অল্প প্রেমের গল্প’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা’ চরিত্রে মিশা সওদাগর পুরস্কৃত হন (মূলত তিনি খল চরিত্রের অভিনেতা)।
২০১৭ সালে ‘গহীন বালুচর’-এ অভিনয়ের জন্য ফজলুর রহমান বাবু এবং ২০১৮ সালে ‘কমলা রকেট’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য মোশাররফ করিম ও ‘পবিত্র ভালোবাসা’য় আফজাল শরীফ কৌতুক অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। উল্লিখিত অভিনেতাদের মধ্যে কেবল আফজাল শরীফই কৌতুক অভিনেতা হিসেবে স্বীকৃত।
প্রসঙ্গত, ‘কমলা রকেট’-এ কৌতুক অভিনেতা হিসেবে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ার পর মোশাররফ করিম জুরি বোর্ডের কাছে পুরস্কার গ্রহণ করবেন না বলে জানান। গত শতাব্দের ৫০ দশক থেকে টানা প্রায় অর্ধ শত বছর বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে কৌতুক অভিনেতাদের উপস্হিতি ছিল লক্ষণীয়। এ সময় রবিউল (প্রকৌশলী রবিউল আলম), সাইফুদ্দিন আহমেদ (প্রথম সবাক বাংলা ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’-এর অভিনেতা), খান জয়নুল, আনিস, টেলি সামাদ, হাসমত, আশীষ কুমার লোহ (নাট্যকর্মী ও চিত্রনাট্যকার) এবং দিলদার কৌতুক অভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। চলচ্চিত্রে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে আরো দর্শক মাতিয়েছেন বেবী জামান, ব্ল্যাক আনোয়ার, ফরিদ আলী, মতি, সুরুজ বাঙালি, শেখর আহমেদ, জ্যাকি আলমগীর, কাজল প্রমুখ।
চলচ্চিত্রে কোনো ভিলেনও যে হাস্যরস দিয়ে দর্শকের মন জয় করতে পারেন তার অন্যতম উদাহরণ এ টি এম শামসুজ্জামান ও হুমায়ুন ফরীদি। একটা সময় ছিল যখন খল অভিনেতা হিসেবে পর্দায় উপস্থিত হতেন এ টি এম শামসুজ্জামান। কিন্তু পরে কৌতুক চরিত্রটিকেই তিনি বেছে নেন। দর্শকদের নির্মল বিনোদন এই চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমেই দেওয়া সম্ভব। সেই পথ ধরে আসেন আরেক খ্যাতিমান অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি। যাঁর খল চরিত্রে অভিনয়ের সূচনা হয়েছিল বিটিভির দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটক শহীদুল্লা কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে ‘সংশপ্তক’-এর ‘কান কাটা রমজান’-এর মাধ্যমে।
চলচ্চিত্র থেকে কৌতুক অভিনয় একসময় কমতে শুরু করে। এ নিয়ে জীবদ্দশায় প্রায়ই আক্ষেপ করতে দেখা যেত আমাদের চলচ্চিত্রের সুবর্ণ সময়ের কৌতুক অভিনেতাদের। বর্তমান সময়ে কৌতুকের নামে ভাঁড়ামো হয় বলে অনেকের অভিযোগ। কৌতুকাংশ যে চলচ্চিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেটা যেন বর্তমান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনেকেই মানতে চান না। স্বভাবতই ‘শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা’র পুরস্কার দেওয়ার জন্য এখন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের হিন্দি, তেলেগু ও বাংলা ছবির অন্যতম উপভোগ্য বিষয় হলো কৌতুক। সেখানকার নির্মিত চলচ্চিত্রের বেশির ভাগই কমেডিনির্ভর কাহিনি। আর এই কারণেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের একজন কৌতুক অভিনেতার পারিশ্রমিক নায়কের চেয়েও বেশি। তেলেগু অভিনেতা ব্রহ্মানন্দমকে ছোটখাটো পার্শ্বচরিত্রে রাখার জন্য প্রযোজকদের দুই কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হয়। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ছবিতে অভিনয়ের রেকর্ড গড়েছেন তিনি। তাঁকে দেখা গিয়েছে প্রায় ১২০০ ছবিতে।
ভারতের কৌতুক অভিনেতা জনি ওয়াকার, জগদীপ, আসরানি, জনি লিভার, কাদের খান, পরেশ রাওয়ালকে কে না চেনে! আবার হলিউড মাতানো হংকংয়ের অভিনেতা জ্যাকি চ্যান ও আমেরিকান অভিনেতা ক্রিস টাকার মূলত রঙ্গ অভিনেতা। জ্যাকি চ্যান শারীরিক কসরতপূর্ণ মারামারির দৃশ্য, হাস্যরসাত্মক ভঙ্গি, অপ্রচলিত অস্ত্রের ব্যবহার ও স্টান্ট দৃশ্যের জন্য সুপরিচিত। ক্রিস টাকার একজন স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান, যিনি তাঁর কমেডি অভিনয়ের মাধ্যমে লাইমলাইটে এসেছিলেন ঐইঙ টিভি সিরিজ ডিফ কমেডি জ্যামে ১৯৯০ সালে। ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমি জেলেনস্কিও ছিলেন একজন কৌতুক অভিনেতা।
২০১০ সালে ‘সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল’ নামে টিভি সিরিজে অভিনয় করে ইউক্রেনে অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন। সময় পরিবর্তনশীল। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেই হবে। তবে সেই চলায় যেন ঐতিহ্যকে আমরা না হারিয়ে ফেলি। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। চলচ্চিত্র নির্মাণে কৌতুককে প্রাধান্য দিয়েই কাহিনি তৈরি করা উচিত। অনেক গভীর ভাবনাও হাস্যরসের মাধ্যমে উপস্হাপন করা সম্ভব।
অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক মামুনুর রশীদের রচনা ও নিদের্শনায় আরণ্যক নাট্যদল মঞ্চে ‘রাঢ়াঙ’ নাটকটি হাস্যরসের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে উপস্হাপন করলেও এর পেছনে রয়েছে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ভূমির মালিকানা না-পাওয়ার নির্মম বাস্তবতা। নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে সময় নিয়ে হলে গিয়ে দর্শক নিশ্চয়ই কাঠখোট্টা কোনো মুভি দেখতে চাইবেন না!

