প্রতিকৃতি অঙ্কনে সিদ্ধহস্ত শিল্পীতালিকায় প্রথম শ্রেণির একজন শিল্পী হলেন শাহজাহান আহমেদ বিকাশ। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জীবনকাল নিয়ে শিল্পীর আঁকা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ স্ক্রল পেইন্টিংয়ের পক্ষকালব্যপী প্রদর্শনী শুরু হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: মহাজীবনের মহাপট' শীর্ষক নতুন ইতিহাস তৈরি করা এ প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় জাতীয় জাদুঘরের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মিলনায়তনে। প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হন এবং শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
১৯৮৭ সাল অর্থাৎ শিল্পীর স্কুল জীবন থেকেই বঙ্গবন্ধুকে চিত্রপটে তুলে আনার অঙ্কুরিত চর্চা শুরু হয়।এরপর সেই চর্চা পরিণতি পায় অভ্যাসে।শিল্পী সহস্রাধিক বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি আঁকার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তৃপ্ত হতে পারছিল না শিল্প মন।জাতির পিতার জীবনের বিশালতা উপস্থাপনের দিকটিতে শিল্পী র আত্মতুষ্টি না মেলায় আবার চললো শিল্প অভিযান। তার ফলাফল স্বরূপ স্বাধীনতার পঁচিশ বছর পূর্তিতে অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন শিখা চিরন্তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১৭ ফুট আয়তন বিশিষ্ট বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি উপস্থাপন করেন।পরবর্তীতে চারুশিল্পী সংসদে হাতে আঁকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সর্ববৃহৎ প্রতিকৃতির মূল কাজটি করার সৌভাগ্য অর্জন করেন এই গুণী শিল্পী। যা শিল্পীর চিত্ররচনার স্পৃহাকে বাড়িয়ে তুললো। দ্বিগুণ উদ্যমে চললো পরবর্তী শিল্প প্রস্তুতির অভিযান।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্ববৃহৎ প্রতিকৃতি আঁকার অভিজ্ঞতাও শিল্পী শাহজাহান আহমেদ বিকাশের। এসব অর্জনের পরেও তিনি চিন্তা করছিলেন স্বাধীনতার একচল্লিশ বছর উদযাপনকে সামনে রেখে একচল্লিশ সংখ্যাকে কেন্দ্র করে প্রতিকৃতি করার।তাইতো ২০১২ সালে বঙ্গবন্ধুর ৪১ টি প্রতিকৃতি নিয়ে এক প্রদর্শনী করেন যে প্রদর্শনীটি ছিলো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পক্ষকালব্যপী আয়োজন। যদিও সমস্থানিক বিষয় হলো সেই সময় শিল্পীর বয়সও একচল্লিশ বছর চলছিল।পরবর্তীতে একই বছর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে একটি হলরুমকে গ্যালারি হিসেবে নিয়ে প্রদর্শনীটি দ্বিতীয়বার আয়োজন করে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত থেকে প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন যে ঘটনা ছিলো শিল্পীর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল প্রতিভাকে বিস্তৃত পটভূমিতে প্রকাশ করার সুপ্ত চিন্তার সূত্রপাত হলো এই সময় থেকেই। তারপর জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদযাপনকে স্মরণে রেখে শিল্পী তিলে তিলে সঞ্চিত স্বপ্ন গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকলেন।
জন্মশতবর্ষ থেকেই মূলত একশো ফুট দৈর্ঘ্যর স্ক্রল পেইন্টিং করার বিষয়ে মনস্থির করলেন।শিল্প ভাবনার জগতে সংযুক্ত হলো বিষয়বস্তু বঙ্গবন্ধুর জীবন প্রবাহ।শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা স্কুল জীবন পেরিয়ে ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়া,রাজনৈতিক মঞ্চে সফল পদচারণা ক্রমান্বয়ে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার সংগ্রামী ও দুঃসাহসিক জীবন এবং ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক আত্মদানের ঘটনাবলীর পর্যায়ক্রমিক পরিশীলিত রূপ ফুটিয়ে তোলাই শিল্পীর লক্ষ্য হয়ে উঠলো। অপরদিকে প্রস্থ একাত্তর ইঞ্চি রাখার পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্মসালকে কেন্দ্র করেই শিল্পীর মননে স্থান পায়।
এবার বিশাল ক্যানভাস সংগ্রহের পালা সুদীর্ঘ আনকাট ক্যানভাস শিল্পীর প্রচেষ্টায় কাশ্মীর থেকে বম্বে হয়ে কলকাতা আসে নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।তবে কলকাতার উপ হাইকমিশনার তৌফিক হাসানের সহযোগিতায় বাংলাদেশে দ্রুততম সময়ে ক্যানভাসটি অক্ষত অবস্থায় শিল্পীর হাতে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি সহজ হয়।নিজস্ব স্টুডিও না থাকার দরুন নিজগৃহের ড্রইং রুমটি সতর্কতার সঙ্গে নিখুঁত নৈপুণ্যের বিশাল স্ক্রলচিত্রটির পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার স্থান। শিল্পী তার শিল্প রচনার পর কৃত অংশটি গুটিয়ে রেখে পরবর্তী অংশের কাজে হাত দিতেন।
২০২০ সালের ১৭ মার্চ অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী চিত্রপটে তুলে আনার প্রথম চেষ্টা ও শুরু হলো জাতির পিতার জন্মদিনটিকে ধরেই। কাজ চললো এক মাস।করোনা পরিস্থিতির ফলে কাজ কিছুটা বিলম্বিত হলেও ঐ বছর ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন উদ্যমে চলে শিল্পীর টানা নয় মাসের আট থেকে নয় ঘণ্টা শ্রম সংযোগ। ৭ মার্চ ২০২১ এ শিল্পী একশো ফুট ক্যানভাস সমাপ্ত করলেন কিন্তু ঘটনা প্রবাহ অসমাপ্ত রয়ে গেল। সেই মুহূর্তে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অর্থাৎ পঞ্চাশ বছরপূর্তিকে বঙ্গবন্ধুর জীবনপ্রবাহে জুড়ে দিয়ে সমন্বয় সাধন করা হলো। একশো পঞ্চাশ ফুট আয়তনে এসে ঘটনাপ্রবাহ পূর্ণতা পেল। বঙ্গবন্ধুর প্রায় আশিটি প্রতিকৃতি মেলানো সঙ্গে আনুষাঙ্গিক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রতিকৃতিতে আমরা শিল্পীর অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় পাই।শিল্পী শাহজাহান আহমেদ বিকাশ ১৪৩ ফুট পূর্ণ করলেন বাকি ৭ ফুট রেখেছেন আগামীর জন্য।
বঙ্গবন্ধুর ১৯২০ থেকে ১৯৭৫ সালের এই সফল জীবনের বিশালত্বকে তুলে ধরতে শিল্পীকে ইতিহাস নির্ভর দুর্লভ চিত্রের সহায়তা নিতে হয়েছে। এ সকল ফটোগ্রাফির হুবহু উপস্থাপন অর্থাৎ অনুকরণ না করে মূল্যবান ছবিগুলোকে চিত্রনের বিষয়ে নিজস্ব চিত্ররীতি ধরে এগিয়েছেন। ১৫ই আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ শিল্পী প্রকাশ করেছেন বঙ্গবন্ধু মলিন হলেও সেইদিন ঐ মুহূর্ত থেকে বাঙালির চেতনায় অমলিন হয়ে আছেন দৃঢ়ভাবে। তাইতো ১৯৮১ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্যদিয়ে জাতির পিতার চেতনাকে আদর্শ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সোনার বাংলাকে।
দীর্ঘ স্ক্রল পেইন্টিংটিকে দীর্ঘস্থায়ী করার নিমিত্তে শিল্পী ক্যানভাস নির্বাচনে যেমন সচেতন ছিলেন ঠিক তেমনি করনকৌশল অর্থাৎ রং নির্ধারণেও ছিলেন সতর্ক। উইনসর এন্ড নিউটন কোম্পানির তেলরঙ এবং একটি মাত্র রং ইয়োলো অকার থেকে বার্ন সায়না এরপর র সায়না পরবর্তী পর্যায় হলো নির্বাচিত রং বার্ন্ট আম্বার।এই রং মাটি পুড়ে খাটি হওয়া রং যা দীর্ঘস্থায়ী।
শিল্পী রং প্রয়োগেও স্থায়িত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন।তাইতো তেল রংকে ফাঙ্গাস থেকে রক্ষার্থে ড্রাই ব্রাশ প্রয়োগের দিকে এগিয়েছেন।যদিও এই পদ্ধতি প্রয়োগে বিচক্ষণতার প্রয়োজন যা শিল্পীর দীর্ঘদিনের শ্রমে প্রতিটি ক্যানভাসে পরিলক্ষিত হতে দেখেছি। বার্ন্ট আম্বারের মতো দীর্ঘস্থায়ী রং ঠিক যেন বঙ্গবন্ধুর ন্যায় পুড়ে পুড়ে খাটি হওয়া মানুষ বাঙালির মনে মননে চিরস্থায়ী হয়ে থাকার অনুরূপ।
লেখক আত্মজীবনী রচনা করেন বইয়ের পাতায় আর শিল্পী শাহজাহান আহমেদ বিকাশ জাতির পিতার আত্মজীবনী এঁকেছেন একশো পঞ্চাশ ফুট দৈর্ঘ্যের সরল পটভূমিকায়। শিল্পীর চমৎকার চিন্তা শৈলীর অনুপম উপস্থাপন সত্যিই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের জানার পথকে চেতনার পরিধিকে প্রশস্থ করবে।
