টেলিভিশনের স্বর্ণযুগ সত্তর ও আশির দশকে জুটির নাম শুনে তারপর টিভি সেটের সামনে বসতেন দর্শক। ওই সময় টিভিতে আফজাল-সুবর্ণা জুটির নাটক প্রচার মানেই ছিল মহাআনন্দের ব্যাপার। ‘পারলে না রুমকি’সহ এই জুটির আরো বেশকিছু জনপ্রিয় নাটক আজও টিভি দর্শককে নষ্টালজিক করে তোলে। শুধু রোমান্টিক জুটি নয়, ঘরোয়া কাহিনীর নাটকেও তখন অনেক জুটি তৈরি হয়েছিল। আবদুল্লাহ আল মামুন-ফেরদৌসী মজুমদারের মতো জুটির বহু কাজ দশর্কের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। সম্প্রতি এই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলন ও ভিট-চ্যানেল আই সুন্দরী রওশন হাসিন প্রথমবারের মতো জুটি হয়ে নতুন একটি ধারাবাহিকে অভিনয় করছেন। এই নতুন জুটির অভিনয়ের রসায়ন নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন খালেদ আহমেদ ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত জুটি প্রথা টিভি নাটকে তার দাপট ষোল আনা প্রদর্শন করতে সমর্থ হয়। জাহিদ হাসান-শমী কায়সার, টনি ডায়েস-আফসানা মিমি, তৌকীর আহমেদ-বিপাশা হায়াত—জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিল এসব জুটি। নব্বইয়ের শেষে এসেও মাহফুজ-তারিন জুটি নিয়ে বেশ মাতামাতি ছিল। কিন্তু তারপরই ধীরে ধীরে ছোট পর্দায় জুটি প্রথা ফিকে হতে থাকে। সেই সাথে বেশি সংখ্যক দেশি স্যাটেলাইট চ্যানেলের আত্মপ্রকাশের ফলে নাটক তখন নির্মিত হতে থাকে সংখ্যাতত্ত্বকে সামনে রেখে। তাই শিল্পী সঙ্কট জুটি প্রথাকে ভেঙেচুরে একাকার করে দেয়। নামি দুজন তারকাকে এক ফ্রেমে বন্দি করার নামই তখন হয়ে দাঁড়ায় ‘জুটি’। জুটির চেয়ে নাটকের দর্শকপ্রিয়তার দিকেই এখন বেশি মনোযোগ নির্মাতাদের। কোনো এক শিল্পী কমেডি নাটক নির্মাণ করে জনপ্রিয়তা পেলেন তো সব নির্মাতা ঝাঁপিয়ে পড়লেন তাকে নিয়ে। এবার এই কমেডি অভিনেতাকে শুধু পর্দায় দেখালে দর্শক ভুলবে না। স্পন্সরদেরও খুশি করা যাবে না। অতএব কমেডি অভিনেতার বিপরীতে কাস্ট কর জনপ্রিয় মডেল অভিনেত্রীদের। জন্ম হলো নতুন ধারার এক জুটির। হালে নির্মাতারা এমন অসম জুটি নিয়ে নাটক বানাতেই বেশি আগ্রহী। দেখা যাচ্ছে রুপালি পর্দার কোনো তুমুল জনপ্রিয় নায়িকার বিপরীতে অভিনয় করছেন ছোট পর্দার একজন কমেডিয়ান অভিনেতা। হার্টথ্রব কোনো মডেলের বিপরীতেও দেখা যাচ্ছে তাকে। সুন্দরী অভিনেত্রীরা এসব অভিনেতার সঙ্গে পর্দায় রোমান্টিক সংলাপ বলছেন। কিংবা অভিনেতার মানসপটে প্রেমিকার প্রতিমূর্তি হয়ে হাজির হচ্ছেন সুন্দরী অভিনেত্রী। অভিজ্ঞ নির্মাতা-শিল্পীরা অভিমত, একটি-দুটি নাটকের জন্য এমন অসম জুটি দর্শকের কাছে আনন্দদায়ক ঠেকতেই পারে। গল্পের প্রয়োজনেও অসম জুটির চাহিদা থাকতে পারে। কিন্তু একদল নির্মাতা যখন এ অসম জুটিকেই প্রতিষ্ঠার জন্য উঠেপড়ে লাগেন, তখন তাকে স্বাভাবিক প্রবণতা বলা যায় না। দর্শক অনুভব করছেন সেই পুরোনো জুটিগুলোর জন্য বেদনা। ইদানীং জুটি প্রথা নিয়ে ভাবতে রাজি নন নির্মাতারা। তাদের গল্প অনুযায়ী তারকা নেওয়ার প্রতি ঝোঁক থাকে। তারকাদের ব্যস্ততার কারণে সেই জায়গায় সবসময় সফল না হলেও কোনো একটা জুটি নিয়ে ঠিকই কাজ বেরিয়ে আসে। ফলে জুটির জন্য দর্শকের আকুতি থেকেই যায়। এই সময়ে আশি-নব্বই দশকের মতো জনপ্রিয় জুটির কথা বলতে গেলে বলা যাবে না কোনো জুটির নামই। জুটি তৈরি হচ্ছে অনেক। কিন্তু তাতে সচেতনতার অভাব থাকছে। ফলে কালজয়ী জুটি পাওয়া যাচ্ছে না। এখনকার সবচেয়ে ব্যস্ত জুটির কথা বলতে গেলে বলতে হবে সজল-তিশার নাম। সংখ্যার দিক থেকে এই জুটির নাটক অগণিত। কিন্তু নন্দিত নাটকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। সম্প্রতি এই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলন ও ভিট-চ্যানেল আই সুন্দরী রওশন হাসিন এবারেই প্রথম জুটি হয়ে ‘দলছুট’ নামের নতুন একটি ধারাবাহিকে অভিনয় করছেন। সাইফ চন্দনের রচনা এবং জিয়াউদ্দিন আলম ও সাইফ চন্দনের পরিচালনায় এতে আরও অভিনয় করেছেন শাহেদ শরীফ খান, উর্মিলা, জয়রাজ, মিলন ভট্টাচার্য, আব্বাসউল্লাহ প্রমুখ। নাটকে নিজের চরিত্র নিয়ে মিলন বলেন, ‘এখানে আমার চরিত্রের নাম মাসুদ। আমি এলাকার রিটায়ার্ড মাস্তান। বিয়ে করার পর মাস্তানি ছেড়ে দিয়েছি। আমি কোনো কাজ করি না। সারাদিন টো টো কোম্পানি হয়ে ভেসপা নিয়ে ঘুরে বেড়াই। কাজ বলতে শুধু বউকে অফিসে নিয়ে যাওয়া-আসা।’ হাসিনের সঙ্গে প্রথম অভিনয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই নাটকে হাসিন আমার স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছে। সে অনেক ভালো অভিনয় করে। তার সাথে আমার জুটিটা আশা করি দর্শকরা ভালো ভাবেই নেবে।’ নিজের চরিত্র নিয়ে হাসিন বলেন, ‘এখানে আমার চরিত্রের নাম ঝিনুক। আমি একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করি। বাবা-মা কেউই নেই। গ্রামে ধর্ষণ হওয়ার পর বেঁচে থাকার ইচ্ছায় শহরে পাড়ি জমাই। তারপরই মাসুদের সাথে পরিচয় এবং মাসুদের ভালো লাগা, প্রেম এবং বিয়ে। সব মিলিয়ে আমার চরিত্র বেশ মজার। আমি এ রকম চরিত্রে কাজ করতে পেরে আনন্দিত।’ মিলনের সাথে প্রথম অভিনয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মিডিয়ার আসার আগে মিলন ভাই ও তারিন আপুর অভিনয় দেখে আমি সব সময়ই মুগ্ধ হতাম। তাই ইচ্ছা ছিল তার সাথে অভিনয় করার। সেটা এবার পূরণ হলো। আর কো-আর্টিস্ট হিসেবে মিলন ভাই অনেক হেল্পফুল। তিনি আমাকে অভিনয়ের অনেক কিছুই সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তার মতো গুণী অভিনেতার সাথে কাজ করে আমি অনেক হ্যাপি।
