‘শেষের কবিতা’য় রবীন্দ্রনাথ লাবণ্যের প্রতি অবিচার করেছেন কি না—এ নিয়ে অলইন্ডিয়া রেডিওর কলকাতা কেন্দ্রে অমিয় চক্রবর্তী ও বুদ্ধদেব বসুর আলোচনা সংক্ষিপ্তভাবে প্রচারিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ আলোচনা দুটি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’র একাদশ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘শেষের কবিতার লাবণ্য’ শিরোনামে। মূল আলোচনায় আলাদা করে কোনো শিরোনাম ছিল না, এখানে বুদ্ধদেব বসুর অগ্রন্থিত আলোচনাটি ‘শেষের কবিতা : কাব্য হিসেবে অপূর্ব গল্প হিসেবে দুর্বল’ শিরোনামে এখানে প্রকাশ করা হলো। সঙ্গে রয়েছে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ
‘আমাদের ঋণ’ এবং তিন তরুণের রচনা
আমি কিছুতেই এ-কথা মনে না ক’রে পারি না যে ‘শেষের কবিতা’ কাব্য হিসেবে অপূর্ব, কিন্তু গল্প হিসেবে দুর্বল। বইখানার শোচনীয় পরিসমাপ্তিই তার কারণ। শোচনীয় কথাটা ভেবে-চিন্তেই বসালাম; অমি-লাবণ্যর আশ্চর্য সুন্দর উজ্জল প্রেম যখন আকাশের অভিসারে আপন আলোক-পুঞ্জকে বিকীর্ণ করেছিল, তখন কি আমরা স্বপ্নেও মনে করতে পেরেছিলাম যে এই জ্যোতির্লেখা আসলে বাললোভন হাউইবাজি মাত্র? আর শেষ পর্যন্ত তা-ই যখন দেখা গেল, যখন প্রেমের স্বপ্নরচনা থেকে জীবনরচনা হলো না, অনুরাগের সমস্ত আলো, সমস্ত উত্তাপ মধ্যপথে রঙিন কথার কুয়াশা হ’য়ে মিলিয়ে গেলো, সেই ব্যর্থতার চেয়ে শোচনীয় আর কী। শেষের কবিতার শেষের কবিতাটি অপরূপ, কিন্তু গল্পটি শেষের কাছাকাছি এসে একেবারে এলিয়ে পড়ল, ঐ কবিতাও বাঁচাতে পারল না তাকে।
আমি অবশ্য এ কথা বলি না যে যেহেতু দু’জন মানুষ পরস্পরকে ভালোবেসেছে সেজন্য বিয়ে তাদের হতেই হবে, নয়তো গল্প শেষ হবে না। অমিত’র সঙ্গে কেটির এবং লাবণ্যর সঙ্গে শোভনলালের বিয়ে দিয়ে এই গল্পেরই সুন্দর পরিসমাপ্তি হতে পারে—হতে পারতো—তাও আমি স্বীকার করি। এ-কথাও সত্য যে এই সমাপ্তি রবীন্দ্রনাথের মনে আকস্মিকভাবে অসতর্ক মুহূর্তে আসেনি—প্রথম থেকেই যে এটি তাঁর লক্ষ্য ছিলো গল্পের ভিতরেই তার আভাস আছে। কিন্তু এই গল্পের সুসম্পূর্ণ রূপটি প্রকাশ করতে হ’লে যতখানি বিস্তার, যতখানি বাস্তবিকতা, যতখানি ঘটনাবিন্যাস প্রয়োজন, শেষের কবিতায় তার কিছুই নেই। দু’জন দু’জনকে ভালোবাসলো, কিন্তু বিয়ে করলো অন্য দু’জনকে—এমন দু’জন, যাদের সঙ্গে পূর্বযুগে তাদের পরিচয় ছিল, এমন একরকমের পরিচয়, যাকে প্রণয় বললে ভুল হয় না—এই গল্প দাবি করে রক্তেমাংসে পরিপূর্ণ বাস্তবিক রূপ। কিন্তু শেষের কবিতা আগাগোড়াই কাব্য, যোগমায়া থেকে যতিশঙ্কর পর্যন্ত, সকলেই মোটামুটি অমিত’র মতো কথা বলে; কাব্যে, কাব্যের আলোচনায়, বাক্যের ইন্দ্রজালে সমস্ত বইটি আচ্ছন্ন, সেই পুষ্পভারে গল্পের বল্লরীটি চাপা পড়ছে প্রায়, এখানে-ওখানে একটুখানি উঁকি দিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে। তাতে আপত্তির কিছু নেই; শেষের কবিতা গল্প না কাব্য না কাব্য কাহিনী তা নিয়ে তর্ক করবো না—না হয় এ-কথাই বলবো যে এ-বইয়ে রবীন্দ্রনাথ এনেছেন নতুন একটি রূপকল্প—নতুন একটি ফরম—পুরোনো নামের লেবেলে যাকে ঠিক চেনা যায় না। আমার বক্তব্য এই যে রূপের সঙ্গে বিষয়বস্তুর সংগতিরক্ষা হয়নি, বইয়ের আরম্ভ আর বইয়ের শেষ দুটো যেন বিচ্ছিন্ন হ’য়ে গেছে। শ্রীযুক্ত অমিয় চক্রবর্তীও সে কথা স্বীকার করেন, তবে তিনি বলতে চান যে ও-রকম না-হ’য়ে উপায় ছিল না, চরিত্রগুলির মধ্যেই ছিল এই সমাপ্তির অনিবার্যতা। তা হয়তো ছিল, কিন্তু এই কাব্যোন্মাদ কাহিনীতে তা যথাযথরূপে উদঘাটিত হ’তে পারেনি, পাঠককে বিশ্বাস করাতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ যে এ-রকম হ’তেই হবে। কেন পারেননি সে-কথা পূর্বেই বলেছি। যদি গল্পটি বাস্তবের আর একটু সমীপবর্তী হতো, যদি শোভনলাল আর কেতকী রঙ্গমঞ্চে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত থাকত প্রথম থেকেই, আর এই চারজনের দ্বন্দ্ব সংঘাত দুঃখ আনন্দ ফুটিয়ে তোলা হতো বক্তৃতায় নয়, কবিতায় নয়, ঘটনার এবং আলাপের বিন্যাসে, তাহলে এই পরিশেষের অনিবার্যতা স্বতঃসিদ্ধ হতো। কিন্তু ও রকম করে লেখা হলে শেষের কবিতার এই রূপটি আর থাকত না, তাকে হতে হতো রীতিমতো একটি উপন্যাস। আসলে হয়েছে কী , শেষের কবিতা এতই রূপবান যে তার সঙ্গে কাহিনীর কোনোরকম জটিলতাকে যেন মেলানো যায় না; কাব্যের আলো এখানে এমনভাবে পড়েছে যে বইটি বাস্তব থেকে একটু যেন দূরে সরে আছে—যেমন গীতময় উচ্ছ্বাসে আরম্ভ হয়েছে তেমনি অখণ্ডভাবে চলে এসে একটি চরম সংগীতধ্বনিতে শেষ হলেই আমাদের মনের পূর্ণতম পরিতৃপ্তি হতো। অমিত-লাবণ্যর বিয়ে হলেও চলত, বিয়ে না হলেও চলত—কিন্তু অন্যদের সঙ্গে তাদের মিলন, আর তাই নিয়ে তত্ত্বের অবতারণা, তা যেন কিছুতেই সহ্য করা যায় না। দুজন ভালোবাসল, তারপর তাদের মিলন হলো কিংবা হলো না—এইরকম একটি সরল কাহিনী অবলম্বন করলে শেষের কবিতা কচ ও দেবযানীর মতো একটি সর্বাঙ্গসুন্দর কাব্যের গৌরব পেত— হলোই বা অংশত গদ্যে। এ ধরনের রচনায় সত্যকে পেতে হলে বাস্তবের পথ দিয়ে যেতে হয় না—বাস্তবটা এখানে অবান্তর, তাই বাস্তবাটাই অবাস্তব। শেষের কবিতার শেষের অংশে এই বাস্তব আকস্মিকরূপে আবির্ভূত হয়ে সর্বনাশ করেছে—নষ্ট হয়েছে কাব্যের পূর্ণতা, গল্প হিসেবেও বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।
অমিয়বাবু এই কথার ওপরেই জোর দিয়েছেন যে অমিত রায় আর্টিস্ট—বোহিমিয়ান আর্টিস্ট—আর লাবণ্যও বোহিমিয়ান না হলেও মন তার আর্টিস্টের, আর দাম্পত্যক্ষেত্রে দুজন আর্টিস্টের মিলন বোধহয় বাঞ্ছনীয় নয়। এ প্রসঙ্গে অনেক কথাই এসে পড়ে, আপাতত সবচেয়ে আশ্চর্য এই কথাটা না বলে পারছি না যে অমিত রায়কে একবারও আমার শিল্পী বলে মনে হয়নি, বোহিমিয়ান তো নয়ই। অমিতর মুখে যে কবিতাগুলি রবীন্দ্রনাথ বসিয়েছেন তা যদি সত্যই তার লেখা হতো তাহলে অন্য মানুষই হতো সে। কবি-চরিত্রের উদ্দামতা কি আত্মবিস্মৃতি কোনোটাই তার নেই। আর বোহিমিয়ান? বোহিমিয়ান ভাবটা তো দারিদ্র্যের শিল্প-রূপ, আর অমিত রায় যে অক্সফোর্ডের পালিশ করা ব্যারিস্টার, কে কথা সে নিজেও ভুলতে পারেনি, আমরাও পারি না। অমিতকে আমার লাগে কলকাতার উচ্চ-সমাজের শৌখিন পুরুষের প্রতিমূর্তি; কোনো কিছুতেই গভীরভাবে নিবিষ্ট হতে পারে না সে শব্দতত্ত্বের বই পড়ে জানবার জন্য নয়, জানাবার জন্য, শানিয়ে বলা কথা বানিয়ে রাখে লোককে তাক লাগাবে বলে, যা বিশ্বাস করে তাই বলে না, যা মক লাগাবে তাই বলে সামাজিক রীতি অনুসারে একটু একটু মধুর ব্যবহার করে সব মেয়ের সঙ্গেই । তার চরিত্রে গাম্ভীর্য নেই, তন্ময়তা নেই, যতই সে কবিতা বলুক আর কত্বিময় উপমা আনুক, কবির স্বভাব তার নয়। অথচ একেবারে অগভীরও তাকে বলা যায় না, দলের লোক থেকে সে স্বতন্ত্র; এলোমেলো করা মুখের মেয়ে আর ঘোড়দৌড়ের পরিভাষায় কৃতবিদ্য পুরুষ সম্পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারে না তাকে, তার মন অন্য কিছু চায়। আর সেই অন্য কিছু যখন লাবণ্যর মূর্তি নিয়ে তার সামনে এলো, সে তো ভুল করল না, ঠিক চিনে নিলো। যোগমায়া অবশ্য প্রথমেই বলেছিলেন—‘বাবা, বিবাহযোগ্য বয়সের সুর এখনও তোমার কথাবার্তায় লাগছে না, শেষে সমস্তটা বাল্যবিবাহ হয়ে না দাঁড়ায়।’ তারপর কেটিকেও দেখলাম, শোভনলালকেও বুঝলাম—কিন্তু মন থেকে কিছুতেই এ প্রশ্ন যায় না যে এই যদি হবে, তাহলে, কেন এতক্ষণ ধরে এত কবিত্ব, এত আনন্দ, সমস্ত রচনাটাই কেন বা। যদি কেটিকে বিয়ে করা হতো অমিতর দুঃখবরণ, তার চপলতার প্রায়শ্চিত্ত, তাহলে না হয় বুঝতাম, কিন্তু শেষ পরিচ্ছেদে যতিশঙ্করের কাছে যে সব তত্ত্বকথা সে বলছে—কেতকী রইলো ঘড়ায় তোলা জল আর লাবণ্য রইলো সাঁতার দেবার দিঘি—এসব নিতান্তই কাঁচা মনের কথা। কুড়ি বছরের ছেলে যতিশঙ্করও জিগেস করেছে, ‘কিন্তু বিবাহে তোমার ওই সঙ্গ আসঙ্গ কি একত্রেই মিলতে পারে না?’ এর উত্তরে অমিত যা কিছু বলছে তার যদি কোনো অর্থ হয় তা তো এই যে ভালোবাসা দৈহিক সান্নিধ্যের উত্তাপে জুঁইফুলের মতোই শুকিয়ে যায়। এরকম কথা ষোলো সতেরো বছরের প্রত্যেক ছেলেই ভাবে; কিন্তু এ কি আশা করা যায় বিদগ্ধ বয়স্ক অমিত রায়ের কাছে? অমিত নিজে নিজের কথা বিশ্বাস করে কিনা কে জানে—হয়তো সমস্তটাই তার আত্ম-প্রবঞ্চনা—লাবণ্যকে ত্যাগ করবার পর তার কথাকেও সে রকম জোর আর নেই সেরকম জৌলুশ নেই। শেষ পরিচ্ছেদে তার সমস্ত কথাই কেমন এলোমেলো, বিশৃঙ্খল, খানিকটা পরস্পর-বিরোধী। শেষ পর্যন্ত কী রকম একটা সন্দেহ জাগে যে সে কখনো ভালোইবাসেনি—না লাবণ্যকে, না কেতকীকে না অন্য কোনো মেয়েকে। এই সন্দেহ শেষের কবিতার পক্ষে মারাত্মক।
একটা কথা উঠতে পারে এই যে রবীন্দ্রনাথ অমিত-লাবণ্যর প্রেমকে মুক্তি দিয়েছেন বিরহের অসীমে, মিলনের সীমানার মধ্যে তাকে আবদ্ধ রাখেননি। এ কথা যথার্থ বলে গ্রহণ করতে পারতাম যদি বইটি সমাপ্ত হতো নির্মম বিচ্ছেদ, কারো সঙ্গেই কারো মিলন না হতো। কিন্তু এ কথাও কি বিশ্বাস করতে হবে যে নৈনিতালের সরোবরে কেটিকে নিয়ে নৌকো ভাসিয়ে জলের ছলছলানির শব্দে অমিত শুনছিলো বিরহের সুর, আর লাবণ্য তার শোভনলালের মধ্যে যে নীড় রচনা করেছিলো তা থেকে থেকে কেঁপে উঠছিল বিরহের হাওয়ায়? এ ছাড়াও অবশ্য কথা আছে। বিরহ কি শুধু বিরহেই, মিলনেও কি নয়, মিলনেই কি নয়? মিলনের মধ্যে যে বিরহ পরিব্যাপ্ত, অত্যন্ততম কাছে পেয়েও যে পাওয়া শেষ হয় না, ভালোবাসার নিগূঢ়তম সত্য নিহিত আছে তারই মধ্যে। শুধু দৈহিক বিচ্ছেদেই তো বিরহ নয়—কণ্ঠাশ্লেষে আবদ্ধ থেকেও বিরহের জোয়ার এসে দুজনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, এই কথাই মেঘদূতের কথা, এই কথাই বৈষ্ণব কবিতার। বলা বাহুল্য, রবীন্দ্রনাথের কাব্যের কথাও এই, কিন্তু দুঃখের বিষয় শেষের কবিতার নয়।
[কবি এবং বিলুপ্ত সাময়িকী শৈলী সম্পাদক কায়সুল হকের সৌজন্যে পাওয়া]
