রাত ভ’রে বৃষ্টি জীবন ভরে বাঁচা

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ২২:০৭
ভালোবাসা। প্রেম। যাকে ভালোবাসি তাকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা করে। তাকে ধরে দেখতে ইচ্ছা করে। ভালো তো বাসিই; তবু কেন এমন ধরে দেখার ইচ্ছা? কেন এমন এই ধরে দেখার তীব্রতা? ভালোবাসতে গিয়ে এই ধরে দেখে ভালোবাসার দ্বিধায় আপনাতে-আপনি আকুল হয়নি কে? সুনীল গঙ্গোপাধায়ের যে-হাত নীরার মুখ ধরে সে-হাত কোনো পাপ করতে পারে না। পাপ করা আর না করার সঙ্গে এই নীরার মুখ ধরাধরির কী সম্পর্ক? নীরার মুখ ধরা মানে নিজের ভালোবাসার মুখ ধরা; আর নিজের ভালোবাসাকে ছুঁয়ে দেখা এক পবিত্রতম কাজ। তাই এ-পবিত্র কাজ করেছে যে-হাত সে-হাত কোনো পাপ করতে পারে না—এই তো সুনীলের বলার কথা। এই তো বলার বাংলার প্রেমিকদের। সুনীল যখন ঘুর পথে ভালোবাসাকে নিয়ে শরীরের দিকে যাচ্ছেন তখনও বেঁচে ছিলেন তাঁর অগ্রজ বুদ্ধদেব বসু। ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ উপন্যাসে সহজ ভাষায় সোজা তিনি লিখে দিলেন সেই দ্বিধা-শঙ্কার উত্তর : ‘ভালোবাসায় শরীরই আসল— আরম্ভ, শেষ, সব ঐ শরীর। ভালোবাসা জৈব, ভালোবাসা যৌন, শরীর না-থাকলে কিছুই থাকে না ভালোবাসার।’ আজ এই একুশ শতকেও, বুদ্ধ বসুর জন্মের প্রায় একশ বছর পরেও, এই কথা কেমন পীড়া দেয়! এই কথাকে মনে হয় আপাত অশ্লীল; অথচ কঠোর সত্য। ১৯৬৭ সালেও ‘রাত ভর বৃষ্টি’ উপন্যাসে লেখা বুদ্ধদেবের এই কথাগুলো সত্য ছিল। এবং সেই তখনও এই কথা (আপাত) অশ্লীলই ছিল। ১৯৭০ সালের ১০ ডিসেম্বর ‘কলকাতার এক বিচারালয়ে, বইখানা চিহ্নিত হয়েছিলো অশ্লীল বলে, সমাজের পক্ষে অনিষ্ট সাধক বলে।’ উপন্যাসটির ছাপা সব কপির পাশাপাশি পাণ্ডুলিপিটিও ধ্বংসের নির্দেশ দেয় আদালত। কিন্তু এই বইয়ের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ কেন? কারণ এই বই বিবাহিত নারী বা পুরুষের অন্য কোনো পুরুষ বা নারীকে ভালোবাসার বিষয়টিকে খারাপ মনে করে না। খারাপ মনে করে না স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে বিবাহিতের যৌন সম্পর্কের বিষয়টিকেও। এ বই ইঙ্গিত দিয়ে যায় সমাজে তরুণদের হস্তমৈথুনের অনুচ্চারিত অথচ প্রচল ঘটনারও। আর স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে ভালো না-বেসে, পরস্পরের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক না রেখে সংসার চালিয়ে যাওয়ার রূঢ় অথচ প্রবহমান সত্যটিকেও সাহিত্যের খাতায় তুলে আনে এই উপন্যাস। সমাজে টিকে থাকা অস্বাস্থ্যকর যৌনরীতিকে আক্রমণ করে এই বই। কথা বলে আধুনিক মানুষের ভালোবাসা-বিভ্রম নিয়ে। তাই ‘রাত ভর বৃষ্টি’ একদা অশ্লীল বিবেচিত হয়। ২. অশ্লীল বলে বিবেচিত হতেই পারে; যে-উপন্যাসের শুরুটাই হয় বৈবাহিক সম্পর্কে যুক্ত নয় এমন পুরুষের সঙ্গে আর এক বিবাহিত নারীর যৌন সম্পর্ক হয়ে যাওয়ার কথা দিয়ে সেই বইকে সমাজ অশ্লীল বলতেই পারে। কিন্তু যে-ভাষায় বুদ্ধদেবের মালতী মুখোপাধ্যায় সঙ্গম হয়ে যাওয়ার কথা বলে তা আমাদের চমকিত করে। উপন্যাসটি লিখিত হওয়ার প্রায় চল্লিশ বছর পরও মালতীর ওই ভাষাটা ঠিক আজকেরই—‘হয়ে গেছে, ওটা হয়ে গেছে, এখন আর কিছু বলার নেই। আমি, মালতী মুখোপাধ্যায়, একজনের স্ত্রী আর একজনের মা, আমি ওটা করেছি। করেছি জয়ন্তর সঙ্গে, জয়ন্ত আমাকে চেয়েছে, আমিও তাকে।’ বাক্যগুলোর কোথাও কিন্তু উচ্চারিত হলো না যৌন সম্পর্ক হয়ে যাওয়ার কথা। এলো না শরীরের কোনো বর্ণনা। তবু পড়ামাত্রই পাঠক বুঝে ফেলেন কী ‘হয়ে যাওয়া’র কথা বলা হচ্ছে। বুঝেছিলেন সেকালের ভদ্রলোকেরাও। মানুষ কি তবে তার ব্যক্তিজীবনে সঙ্গমের কথা গোপনে এই ভাষায়ই বলে? সরাসরি সঙ্গম বা যৌন সংসর্গের উল্লেখ না করে মানুষ কি এভাবেই শারীরিক যোজনার কথা বলে? নইলে চল্লিশ বছর ধরে পাঠকেরা কী করে বুদ্ধদেবের এই শরীরশূন্য বিবরণ থেকে শারীরিক সম্পর্কের বয়ান পেয়ে যায়? ভালোবাসার সঙ্গে শরীর মেলানো, অথবা শরীর থেকে ভালোবাসা আলাদা করে রাখা—এইরকমের একটা টানাপড়েনে অনেক তরুণই তো পৌঁছায় একটা সময়। বয়ঃসন্ধিতে তাকে ঘিরে থাকে নারীশরীর, যদ্দিন না সে কোনো নারীরই প্রেমে পড়েছে। নারীশরীরের প্রতি বিপুল আগ্রহী তরুণ প্রেমে পড়ে দেখে তার প্রেমেরও পোশাকের নিচে সেই নারীরই শরীর। তখন প্রেমের পবিত্র স্বপ্নালুতা নিমেষে জর্জর হয়। বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’র নয়নাংশুর একটা প্রেম ছিল পাড়ার কুসুমকে নিয়ে। কিন্তু তারও একসময় মনে হয় ‘ওই সব মেয়েরই শাড়ি-জামার তলায় শরীর আছে। কুসুম—এমনকী কুসুমেরও।’ শরীর আর মনের দ্বন্দ্ব্ব মিটে গিয়ে নয়নাংশুও একদা মানুষ হয়েছিল মালতীকে পেয়ে। সে বুঝেছিল প্রেমে শরীর মিশলে তা কদর্য হয় না, বরং এতে প্রেম হয়ে ওঠে আরও গভীর। বুদ্ধদেব বসু বলে যান প্রেম-শরীরের অকাট্য নিকট সম্পর্কের কথা। সেই কথা পড়তে পড়তে আমাদের মনে পড়ে যায় যে তিনিও কবি—‘ভালোবাসা জৈব, ভালোবাসা যৌন, শরীর না-থাকলে কিছুই থাকে না ভালোবাসার। বিদ্যুতের মতো, বৈদ্যুতিক সংস্পর্শের মতো— শরীরের সঙ্গে শরীরের প্রেম। ঘরে সব সময় আলো জ্বালতে হয় না কিন্তু সুইচ টিপলেই জ্বলে ওঠে, যেহেতু তারের মধ্যে বিদ্যুত্ চলছে সব সময়। এও তেমনি। আছে শরীরে শরীরে বৈদ্যুতিক যোগ, তাই যখন প্রেম করো না তখনও থাকে প্রেম, শিরায়-শিরায় বয়ে চলে সারাক্ষণ—তাই কথা মধুর, হাসি মধুর, কাছে থাকা মধুর, দূরে যাওয়া মধুর, কলহ মধুর, কলহের পর মিলন আরও বেশি মধুর। সবই শরীর।’ ৩. উত্তম পুরুষে লেখা উপন্যাসটি মালতী আর নয়নাংশুর বয়ানেই বোনা। শরীর ছেড়ে, শরীর নিয়ে নারী-পুরুষের ভালোবাসার বিবাহিত জীবনের কারণ আর টিকে থাকাকে খুঁজে বেড়িয়েছে উপন্যাসটি। এতে ধরা আছে পড়াশোনা জানা দম্পতির স্ত্রী-পুরুষ দু জনেরই নিজস্ব গোপন আকাঙ্ক্ষা। নারীর দিক থেকে প্রেমিক-স্বামী পুরুষটির প্রতি স্বাভাবিকভাবে অপূর্ণ চাওয়ার বিবরণ আছে; যে-অপূর্ণ চাওয়া নারীকে ধীরে ধীরে দূরে ঠেলে দিতে পারে; যে-অপর্ণূতায় নারী ভেসে যেতে পারে প্রবল পূর্ণ নতুন প্রেমিক-পুরুষের দিকে—‘বিয়ের পরও তেমনি; আমার অবাক লাগছে যে-মানুষ হাতে-কলমে প্রেম করতে পারে সে প্রেমের কবিতা পড়বে বা শোনাবে কেন, বা কথা বলবে কেন তা নিয়ে।’ এ তো গেলো শরীর-মনের চাওয়া। এছাড়াও কি নেই মানুষ হিসেবে নারীর তুচ্ছ কোনও চাওয়া? ‘কোনো রোববারেও আমাকে নিয়ে সিনেমায় যায় না কেন নয়নাংশু, ওর ও-সব ভালো লাগে না বলে আমি কেন শখ মেটাতে পারব না? কেন সবই শুধু তার ইচ্ছেমতো হবে, আমি যদি হিন্দী ফিল্ম ভালোবাসি সে হিন্দী ফিল্মেই যাবে না কেন— নিজের ভালো না লাগলেও আমাকে খুশী করার জন্যই?’ দৈনন্দিন মানবিক সব চাওয়া পেরিয়েও উপন্যাসটিতে প্রেম আর শরীরেরই দ্বন্দ্ব মেটানোর আকুল চেষ্টা বুদ্ধদেব বসুর। মালতীর চাওয়ার মতো কল্পনায় শুধু তার শরীরেই আগ্রহী হতে চায় নয়নাংশু। কিন্তু এখানেও এসে বাধা দেয় নয়নাংশুর (নাকি বুদ্ধদেব বসুর?) প্রেম-শরীর দ্বন্দ্ব। ‘কেমন করে শরীরের সঙ্গে শরীরের বন্ধুতা থাকবে, মন যদি সরে দাঁড়ায়?’ শরীরের তার ছিঁড়ে গেলেও আসলে মানুষ বেঁচে থাকে। ঠিক স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই বেঁচে থাকে। সমাজের আর সমস্ত মানুষের মতো। আর এখানেই হয়তো জীবনের জয়। শরীরকে শরীর থেকে অথবা মনকে শরীর থেকে অথবা শরীর-মন দুটোকেই দূরে সরিয়ে দিয়েও মানুষকে একত্রে বাঁচতে বাধ্য করে জীবন। এই তো জীবনের বয়ে যাওয়া! যেমন বোঝে নয়নাংশু—‘তুমি আর মালতী- ধীরে-ধীরে বুড়ো হবে—যেমন চারদিকে কোটি-কোটি মানুষ—অন্ধ মূর্খ, অচেতন—তেমনি বেঁচে থাকবে বছরের পর বছর। ভালোবাসা জরুরি নয়, স্বামী-স্ত্রী জরুরি, বেঁচে থাকাটা জরুরি।’ বেঁচে থাকার এই ফিরে ফিরে বয়ে চলা কেউ থামাতে পারবে না জীবনে। এরই ফাঁকে প্রেম, এরই ফাঁকে শরীর— দ্বন্দ্ব, ছন্দ, দোলা। জীবন ভরে বেঁচে থাকা। জীবনে বেঁচে থাকাই শেষ কথা।