সায়াহ্নের পদাবলি

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ২২:০৮
সতীনাথ কাশতে কাশতে বলল, কারে আর কী কব; সংসার তো আর নিজির নেই। কলি পারে শুনবিই বা কিডা? রামপদ কোনো কথা না বলে অর্থপূর্ণ মাথা নাড়ে। ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে থাকে গরুটার দিকে। কাঁঠালগাছের সঙ্গে সকাল থেকে বাঁধা আছে। গায়ের ওপর একদিকে ঝুলছে চটের বস্তা, গরুর শীতের পোশাক। সকাল থেকে গরুটির স্থান পরিবর্তন হয়েছে গোয়ালঘর থেকে কাঁঠাল তলায়। কখনো শুয়ে, কখনো দাঁড়িয়ে রোদে পিঠ দিয়ে হাম্বা রবে ডাকছে। কখনো বা নীরবে তাকিয়ে থাকে গৃহকর্তা সতীনাথের দিকে। হয়তো গৃহস্বামীর নিকটে সরবে অথবা নীরবে কোনো ফরিয়াদ জানাতে চায়। সতীনাথও গরুটার দিকে কাতর চোখে চেয়ে জানিয়ে দ্যায় তার করার নেই কিছুই। একসময় গোয়াল ভরা গরু ছিল, চাষাবাদ হতো। এখন যেটুকু জমি আছে চাষ হয় কলের লাঙলে। ছেলেদের যৌক্তিক হিসাব, অত গরু রাহে লাব কী? কৃষকের ঘরে গরু হলো লক্ষ্মী। সে লক্ষ্মী প্রসন্ন হলে কৃষকের হাঁড়ি কখনো শূন্য হয় না। সতীনাথের এ বিশ্বাস ছেলেদের যুক্তির বানে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। সতীনাথের মনে পড়ে বাবা একবার বাছুরসহ একটা গাই কিনে এনেছিলেন। সেই বছর থেকেই তাদের জমিগুলোয় মাঠের সেরা ধান হতো। কী এক অসুখে বছর তিনেক পরে গাইটা হঠাত্ ছটপট করতে করতে মারা যায়। তারপর সতীনাথদের মাঠের ফসল ওই তিনবছরের মতো ভালো আর হয়নি। গাইটার শোকে মা অনেক কান্নাকাটি করেছিল। অমন লক্ষ্মীমন্ত গরু সতীনাথ আর একটাও দেখেনি। পৌষের দুপুর। রৌদ্রের প্রখরতা নেই বরং উষ্ণতায় মিষ্টি আবেশ মেশানো। সতীনাথ ও রামপদ বাড়ির পেছনে পুকুর পাড়ে বসে আছে। প্রতিদিনই থাকে। শীতের কয়েক মাস তারা পুকুর পাড়ে বসে, সারাদিনই এখানে রোদ থাকে। গরমের দিনে বসে উঠোনের পশ্চিম পাশে আমগাছটার নিচে। বছর খানেক ধরে চলছে এই নিয়ম। পুবের আলো যখন প্রকৃতিকে জাগিয়ে দ্যায় তারও আগে জেগে ওঠে দুই অশীতিপর বন্ধু। অবশ্য সারারাত প্রায় নির্ঘুমই কাটে তাদের। শেষ রাতের দিকে তন্দ্রাচ্ছন্ন হতে হতে কেটে যায় ঘোর। বিছানায় কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে। মাঝে-মধ্যে সতীনাথ বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাঙা গলায় কীর্তন গাইতে গাইতে কাশে অথবা কাশতে কাশতে কীর্তন গায়। ভোর বেলায় ছেলে, নাতিদের যেন ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে সে দিকেও তাকে লক্ষ্য রাখতে হয়। রামপদ লাঠিতে ভর দিয়ে ঠক ঠক করতে করতে দুটো বাড়ি পেছনে ফেলে সতীনাথের পুকুর পাড়ে আসে। সতীনাথ সকাল থেকেই অপেক্ষা করতে থাকে রামপদর জন্য। মলিন একটি খেজুরের পাটির ওপর অধিক মলিন একজোড়া তাস বিছিয়ে রাখে। রামপদ এলে শুরু হয় খেলা। এই দুই বৃদ্ধের এছাড়া আর কিছু করার নেই। আর কী বা করতে পারত? দুপুর পর্যন্ত খেলে রামপদ বাড়ি যায় খাওয়ার জন্য। খেয়ে এক দুর্নিবার টানে আবার ফিরে আসে পুকুর পাড়ে। এই প্রাত্যহিক নিয়মের আজও কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে রামপদ আজ একটু দেরিতে এসেছে। রাতে বুকের ব্যথাটা একটু বেড়েছিল। চিনচিনে একটা ব্যথা বুকের এপাশ থেকে ওপাশে ইঁদুরের মতো দৌড়ে বেড়ায়। নির্দিষ্ট করে বলা শক্ত ঠিক ব্যথাটা কোথায়। সতীনাথের কাছে আসতে না পারলে বুকের ব্যথার সঙ্গে মনের ব্যথাটাও বাড়ত। তাস খেলে, গল্প করে অন্তত বুকের ব্যথা যদি ভুলে থাকা যায় তবে মন্দ কী! ছেলেবেলা থেকেই একে অন্যের হরিহর আত্মা। আত্মার বন্ধন বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়েছে। একের ওপর অন্যের নির্ভর বেড়েছে। যখন হাতে করার মতো কোনো কাজই থাকে না, তখন রাত দিনকে বড় দীর্ঘ মনে হয়। মনে হয় অনন্তকাল ধরে সময় বয়ে চলছে—এই বয়ে চলার কোনো শেষ নেই। দুই প্রবীণের অলস সময় একে অন্যের সঙ্গ ছাড়া কাটতে চায় না। তারা তাস খেলতে খেলতে সমাজ, সংসার ভুলে যায়। কখনো বা উড়িয়ে দেয় গল্পের ফানুস। সে ফানুস উড়তে উড়তে আরও হাজারটা ফানুসের জন্ম দিয়ে দিক থেকে দিগন্তে মিলিয়ে যায়। সকাল বেলার আসরে অধিকাংশ দিন খাবার হিসাবে মুড়ির সঙ্গে কাঁচামরিচ আসে, কোনোদিন বা লাল করে ভাজা চিড়া। বয়সের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে শরীর ক্ষয়ে গেলেও তাদের দাঁতগুলো এখনো ঠিক আছে। মুড়ি বা চিড়াভাজা তারা সহজে খেতে পারে। মুড়ির সঙ্গে কাঁচামরিচে একটা কামড় দিয়ে একটু আগে রামপদ বলেছিল, সকাল থেহেই দেখতেছি গরুডা বাঁধা। কেউ একগোছ খ্যাড় পর্যন্ত দ্যায়নি। বাড়ির মদ্যে কেউ নেই নাহি? আমরা তো কয়ডা মুড়ি পাইছি, চাবাচ্ছি। কাউরে কও ওরে কিচু খাবার দেক। রামপদর এই কথা শুনে মুড়ি মুখে দিয়ে সতীনাথ কাশতে কাশতে বলেছিল, কারে আর কী কব...। রোদের তাপ বাড়তে শুরু করেছে। গায়ের চাদর আপনা আপনি খসে পড়েছে। সতীনাথ ও রামপদর শীর্ণ শরীর জানান দিচ্ছে একদা এই শরীরের ওপর দিয়ে অনেক ঝড়, জলোচ্ছ্বাস বয়ে গেছে। সতীনাথের মাথার চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে।একটু দূর থেকে দেখলে মনে হয় মাথার ওপর একটা সাদা টুপি গেঁথে আছে। রামপদর মাথা চুলবিহীন তেলচিটচিটে। সতীনাথের ডানপাশে শিশুগাছের জড়ো করা শুকনো পাতার ওপর চার পা পেটের মধ্যে নিয়ে গোল হয়ে ঘুমাচ্ছিল টগর। ঘুম ভাঙার পর হাই তুলে, চার পা ওপরের দিকে ছুড়ে বার কয়েক এপাশ ওপাশ করে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে কুকুরটা। পাটির পাশে আয়েশ করে বসে তাকিয়ে থাকে সতীনাথ ও রামপদর মুখের দিকে, কখনো বা মুড়ির ডালার দিকে। সতীনাথ দুমুঠো মুড়ি নিয়ে পথের ওপর ফেলে দিলে টগর মুখ ঘুরিয়ে খেতে থাকে। রামপদ ঠাট্টা করে বলে, টগরের মুড়ি দিলে, এট্টা মরিচ দিলে না? টগর মরিচ খালি গেরস্তের এট্টা মরিচ কম পড়ত। রামপদ কথাটার ভেতরের অর্থ বুঝতে পেরে আর কোনো কথা বাড়ায় না। বাঁ হাত থেকে একখানা তাস তুলে চোখের সামনে আনে তারপর একটু শক্তি দিয়ে ছুড়ে ফেলে পাটির ওপর। সতীনাথ তাসখান দেখতে দেখতে বলে, বাদ দেও তো খেলা। এক খেলা দৈনিক দৈনিক ভালো লাগে না। তালি কী আর করা যাবি। যাই দেহি—নাইয়ে-খাইয়ে আসি। রামপদ লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। শরীরটাকে অর্ধবৃত্তাকার করে লাঠিতে ভর দিয়ে সাবধানে এক পা, এক পা করে এগিয়ে যায়। সতীনাথ চেয়ে থাকে রামপদর যাওয়ার দিকে। এই লোকটার গায়ে একসময় কী শক্তিই না ছিল। ধানের বা অন্যান্য ফসলের বোঝা তার মাথায় তুলে দেওয়ার জন্য তিন চারজন লোক লাগত! সেই বৃহত্ বোঝা মাথায় নিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে যেত বাড়ির দিকে। দূরের মাঠ থেকে অনেকেই বড় বোঝা মাথায় নিতে ভয় পেত। কিন্তু রামপদর কোনো ভয় ছিল না। শুধু ধরেটরে তার মাথায় তুলে দিতে পারলেই হলো—সে শিরদাঁড়া সোজা করে ঠিকই হেঁটে যেত ছোট আলপথ ধরে। ভরা ভাদ্রমাসে দীর্ঘসময় ধরে পানির নিচে থেকে হঠাত্ ভেসে ওঠা, এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাট কাটার কাজও তারা করেছিল যৌবনে। যৌবনের সেই পরিশ্রমের কথা ভাবলে আজও সতীনাথের গা শিরশির করতে থাকে। তখন শরীরে ছিল তাজা রক্তের ঢেউ। সময় তার খেয়ালিপনায় সব কিছুকে কেমন বদলে দ্যায়। ছয়ফুট উচ্চতার রামপদ এখন ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে গেছে। তার হাতের লাঠিটিকে মনে হয় ধনুকের ছিলা। ছিলা ছাড়া ধনুক অচল। রামপদও লাঠি ছাড়া অচল, স্থবির। দুই বন্ধু মুখোমুখি দাঁড়ালে মনে হয় দুটি অর্ধবৃত্ত মিলিত হয়ে একটা বৃত্ত তৈরি করেছে। যৌবনে দাঁড়ালে ভূমির ওপর নিশ্চয়ই দুটি লম্ব হতো। সময় তাদের নুইয়ে দিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে পূর্ণতা। তাই এখন একজন ছাড়া অন্যজন অর্ধ অথবা নিছক জীবনকে ধারণ করা সমাজের বোঝা। এক সময় ছেলেমেয়েদের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়ার জন্য কী পরিশ্রমই না করতে হয়েছে! দিনরাত এক করে খেটেছে। পরিবারের কর্তা হিসেবে সবাই তার কথা শুনত। এখন তাকে কেউ দেখেও দেখে না। তার কথা শোনার মতো ফালতু সময় কারুর হাতেই নেই। এই সমাজে, এই সংসারে তার দাম ফুরিয়েছে। কর্মশক্তিহীন, চলনশক্তিহীন মানুষের মূল্য সমাজে নেই। ছেলে, ছেলের বউ, নাতিদের বিভিন্ন কাজকর্ম তার প্রাচীন চোখ সহ্য করতে পারে না। কাউকে কিছু বলতেও পারে না। সবাই বলে সে নাকি বড্ড বেশি বাজে কথা বলে। তাই প্রতিদিন সকালে কারুর কাঁধে ভর দিয়ে সতীনাথ পুকুর পাড়ে বসে। মলিন তাসগুলো একা একা ওলট-পালট করতে করতে রামপদর জন্য অপেক্ষা করে। গামলায় গরম জল নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে এগিয়ে আসে ইন্দুমতি। গামলাটা রাখে পাটির কাছে। সতীনাথ গামলার জলে হাত ডুবিয়ে উষ্ণতা অনুভবের চেষ্টা করে। ইন্দুমতি বিরক্ত গলায় বলে, হাত উঁচো করো। গায়ের সোয়েটার খোলার জন্য সতীনাথ হাত উঁচু করে। ইন্দুমতি গরম জলে গামছা ডুবিয়ে স্বামীর গা মুছিয়ে দ্যায়। গরম জলের স্পর্শ পেয়ে প্রথমে ভালো লাগে পরক্ষণেই উত্তরে বাতাসে সতীনাথের শরীরে কাঁপন লাগে। সে কাঁপন তার ক্ষয়ে যাওয়া হাড়ে গিয়ে ধাক্কা মারে সজোরে। সতীনাথ একবার চেয়ে দেখে ইন্দুমতির দিকে। যে বউ সুখে-দুঃখে সহযোদ্ধার মতো এতদিন তার পাশে থেকেছে এখন সেই বউকে দূরের কেউ মনে হয়। দুটো কথা বলতে গেলে বিরক্ত হয়। সতীনাথ বুঝতে পারে ছেলে, ছেলের বউদের মতো নিজের বউটাও পর হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে সময় বড় নির্মম হয়। সময়ের সেই নির্মমতার শিকার সে। এই সংসারে সে এখন অপাংক্তেয়। সমাজে মূল্যহীন। কারণ সমাজ-সংসারকে দেওয়ার মতো কিছু আর নেই। এখানে শুধু দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক। এর বাইরের সম্পর্ক বড্ড ঠুনকো, তা ভেঙে যেতে এক মুহূর্তও লাগে না। বয়সের ভারে ন্যুব্জ সতীনাথ এখন বড় অবুঝ হয়েছে। সে বোঝে না কিছুই। গতকাল কী একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে এক নাতি বলল, দাদু, ও তুমি বুঝবা না। সতীনাথকে প্রায়ই এরকম কথা শুনতে হয়। সে অবাক হয় না, দুঃখও পায় না। নির্লিপ্ত চেয়ে থাকে শূন্যের দিকে। সে কী যে বোঝে না তা বোঝার চেষ্টা করে। যারা বোঝে তারা তাই অবুঝ সতীনাথের ধারের কাছেও ঘেষে না। ছোট নাতিটা শুধু আশেপাশে ঘুরঘুর করে। এখনো ওর বোঝার বয়স হয়নি যে, দাদু কিছুই বোঝে না। ও ছোট দুটি হাত দিয়ে মাঝেমধ্যে সতীনাথকে জড়িয়ে ধরে, ঝাঁপ দিয়ে কোলে আসতে চায়। তার আধো আধো কথা শোনার জন্য সতীনাথ তাকে গল্প শোনায়, কিছু জিজ্ঞেস করে। নাতি কোলের মধ্যে খেলতে খেলতে ভাঙা ভাঙা উত্তর দ্যায়। সতীনাথ খুশি হয়; এই সংসারে এমন একজন আছে, যে তার কথা বুঝতে পারে, তার কথার উত্তর দ্যায়। আর একজন সতীনাথকে ছেলেবেলা থেকেই বুঝতে পারে, সে রামপদ। সূর্য হেলে গেছে পশ্চিমদিকে। সতীনাথ কাঁপতে কাঁপতে আবার এসে বসে পাটির ওপর। এ কাঁপুনি শীতের নয়, বয়সের। বাড়ির ভেতরে যেতে হয়েছিল খাওয়ার জন্য। সতীনাথ দ্যাখে গায়ে চাঁদর জড়িয়ে অর্ধবৃত্তাকার রামপদ এগিয়ে আসছে। যেন অনন্তকাল ধরে পৃথিবীর পথ পাড়ি দিতে দিতে ক্লান্ত রামপদ সতীনাথের আশ্রয়ে আসছে। সতীনাথও এমন কোনো যাযাবরের দর্শন প্রতীক্ষায় ক্ষণ গুণে বসে আছে। এত দেরি হলো যে। দুডে মুহি দিয়েই তো চলে আলাম। খাতি তো ইচ্ছে করে না। প্রত্যেক দিন আলু-বাগুনির ঝোল...। মুহি লাতি মারে। বাঁচে থাহার জন্যি তো প্যাটে কিচু দিতি অয়। তাই দেই। কয়দিন খুব ইলশে মাচ খাতি ইচ্চে করতেচে, কাঁচকলার সাতে এট্টু বেশি ঝাল দিয়ে। মা কাঁচকলা দিয়ে ইলশে মাছ কী সুন্দর করে যে রানত। এহনো মুহি লাগে আছে। রামপদ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে অক্ষমতা, অসহায়ত্ব ঝরে পড়ে। তা সজোরে ধাক্কা খায় সতীনাথের ঘুণধরা পাঁজরে। জীবন থেকে আমরা অনেক দূরি চলি আইছি রাম। ইচ্ছে করলিই আবার গোড়ায় ফিরা যায় না। ফিরে তো যাতি চাইনে। মাজে-মদ্যে কতসব কতা মনে পড়ে। নৌকা বোঝাই করে পাট নিয়ে বাবার সাতে-আটে যাতাম। পাট বেঁচে ঘুরে ঘুরে ইলশে কিনতাম। এট্টা ডিমঅলা, আরেট্টা ডিম ছাড়া। ডিমছাড়া ইলশের গা ভত্তি ত্যাল থাকত, স্বাদই হতো অন্যরহম। বাবা ভালোবাসত ডিমছাড়া ইলিশ। ডিম ভাজা পছন্দ করতাম বলে বাবা এট্টা ডিমঅলা ইলশেও কিনত। রামপদর কথার মধ্যে দুবার খক খক করে কেশে থু করে কফ দূরে ফেলে সতীনাথ। গায়ে জড়ানো চাদরের কোনা দিয়ে মুখ মোছে। বিকেলের শীতল বাতাস বইতে শুরু করেছে। এখানে আর বেশি সময় বসে থাকা যাবে না। সতীনাথ কণ্ঠে বিষাদের সুর এনে বলে, জীবনডা কেমনে কেমনে যানি ফুরায়ে গিলো। পিছনে ফিরে দেকলি মনে অয়, প্রাপ্তি কিছুই নাই। কিডা যেন জীবনের খাতায় বড় এট্টা গোল্লা দিয়ে রাকছে। সেই গ্যান অওয়ার পর থেকে দিনরাত খাটে জীবনডারে এই পর্যন্ত আনলাম। শ্যাষ কালে আসে এর ফলডা পালাম কী? কিছুই না! আমার তো মনে অয় জীবনে আমি দিনা অইছি, ওপরঅলার কাছে। এই জগতে যাই কল্লাম, পরজগতের জন্যি তো কিছুই করা অলো না। ভগবান বিটার জিরার মুহি পড়লি জবাব দিবার কিছু থাকপি নে।’ সতীনাথ চর্মসার মুখে একটু হাসার চেষ্টায় খুক্ খুক্ করে। রামপদর দিকে তাকিয়ে বলে, ভগবান আমাগের ফাসাতি পারবিনে। কারণডা অলো, ভগবান কইছে তোমরা কম্ম করো। ফল দেব আমি। আমরা তো সারাজীবন কম্মই করে গেছি।... ভগবানের নাম নিলি, সাদুসঙ্গ করলি যেমন ধর্ম অয়, অন্যায় কাজ না করলিও তো তেমনি ধর্ম অয়। তা ও রাম, সারাজীবনে কি আমরা কোনো অন্যায় করার সুযোগ পাইছি? সকালে উঠে মাঠে গেছি, সারা দিন কাজ কাম করছি, মাঠে খাইছি, মাঠে নাইছি- রাতে ঘুমাইছি। আবার সকালে মাঠে গেছি। দিনরাত মিলে অন্যায় করার তো কোনো সুযোগই পাই নাই। তা কোন দোষে ভগবান আমাগের দুষি বানাবি? সতীনাথের এই যুক্তিতে রামপদ একটু স্বস্তি পায়। পরকালের জন্য নিয়ম-বাঁধা হয়ে কিছু করা না হলেও ইহকালের কাজ করতে করতেই পরকালের পাথেয় অর্জিত হয়েছে। রামপদ মনের গভীরে ডুব দিয়ে দ্যাখে; সত্যিই তো সারা জীবনে সে গুরুতর কোনো অন্যায় করেনি। মানুষ হিসেবে দু-একটা ভুল, দু-একটা মিথ্যে কথা যে বলেনি তা নয়। এতটুকু অপরাধের জন্য ভগবান নিশ্চয়ই বড় কোনো সাজা তাকে দেবেন না। মনের মধ্যে একটা ভালো লাগা কাজ করে। তাহলে পরকালটা একেবারে মাটি হয়ে যায়নি! রামপদ মনে একটা সুখ সুখ স্বস্তি নিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। ইন্দুমতির কাঁধে ভর দিয়ে সতীনাথও দিন শেষে ঘরে ফেরে। শীতের এই বিমর্ষ সন্ধ্যায় নাতি ছেলেমেয়েদের চেঁচামেচি, কান্নাকাটি ভালো লাগে না। তার পুরোনো মাথা এসব সহ্য করতে পারে না। তবু নিরুপায় হয়ে চুপ করে বসে থাকে। বাড়ির সবাই সতীনাথের অস্তিত্ব ভুলে যায়। ভাত খাবার পর কাশির ওষধ খেয়ে শুয়ে পরে সতীনাথ। লেপটা গায়ে জড়িয়ে ঝিম ধরে পরে থাকে। ঘুম আসে না। কোনো কিছু চিন্তা করতে না চাইলেও চিন্তার ঝোপঝাড়ে তার মাথা পূর্ণ হয়ে যায়। সতীনাথ সেই জঙ্গল পরিষ্কার করতে চায় না। ধীরে ধীরে ঝোপঝাড়কে ডিঙিয়ে সে প্রবেশ করতে চায় ঘুমের রাজ্যে। একটু ঘুমের মতো আসলে কেউ তার গলার মধ্যে সূচের খোঁচা মারে। ভীষণ কাশি পায়। গলা ফাটিয়ে কাশতে থাকে। কাশতে কাশতে মনে হয় আত্মাটা কাশির ধাক্কায় বের হয়ে ছিটকে পড়বে বিছানায়। সতীনাথ অন্ধকারে খাটের নিচে হাত দ্যায়। জলের গ্লাস খোঁজে। পেয়েও যায়। কিন্তু তীব্র কাশির ঝাকুনিতে দুর্বল হাতে গ্লাসটি ধরে রাখতে পারে না। স্টিলের গ্লাস পড়ে যাওয়ার একটা ভারি শব্দ কানে আসে। এখন ছেলেদের ডেকে কোনো লাভ হবে না। হয়তো চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা উঠবে। ওঠার পরে যে কথাগুলো শোনাবে তা ভালো লাগবে না সতীনাথের। ইন্দুমতিকে ডাকা যেতে পারে। কিন্তু এই বয়সেও বউমাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাকে কাজ করতে হয়। সারা দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত এই ঘুমন্ত মানুষটিকে সে জাগাতে চায় না। এর চেয়ে বরং আরেক জনকে ডাকা যেতে পারে যিনি অন্তর্যামী, সর্বব্যাপী বিরাজমান! তিনি শরীরী আকার নিয়ে কাছে না এলেও ছেলেদের মতো বিরক্ত হবেন না। তাঁর উদ্দেশে কিছু বলে সান্ত্বনা পাওয়া যায় এই ভেবে যে, তিনি অন্তত সবার কথা শোনেন; অনেকেরই মনবাসনা পূরণ করেন। সতীনাথ কাশতে কাশতে সেই অদৃশ্য অন্তর্যামীকে প্রশ্ন করে, ঠাকুর, আমারে আর কতকাল ফেলায়ে রাখপা? আজকের সকালটা কেমন বিষাদময়। চারদিক কুয়াশার আবরণে ঢাকা। মাঝেমধ্যে কুয়াশার গাঢ় আস্তরণ ভেদ করে ক্ষণিকের জন্য উঁকি দিচ্ছিল সূর্য। এখন কুয়াশা কেটে যাওয়ায় শিশুর সারল্য নিয়ে হেসে উঠেছে প্রকৃতি। সতীনাথ পাটির ওপর তাসগুলো ছড়িয়ে পথের দিকে চেয়ে থাকে। রামপদ আজ কেন যে এত দেরি করছে? হঠাত্ একটা চাপা কান্নার ঢেউ ধেয়ে আসে সতীনাথের দিকে। চাপা কান্নার সুর পরক্ষণেই সম্মিলিত কান্নার রোলে পরিণত হয়। কান খাড়া করে অনুভব করার চেষ্টা করে কোন দিক থেকে এমন মরা-কান্নার সুর ভেসে আসছে! অজানা আশঙ্কায় বুক কাঁপতে থাকে। আশেপাশের সবাই দৌড়ে যায় কান্নার উেসর দিকে। একি! সবাই রামপদর বাড়ির দিকে যাচ্ছে কেন? সতীনাথের বুঝতে বাকি থাকে না, তার বন্ধু কোনো দিন আর কাছে আসবে না। ছোট ছেলেকে দেখতে পেয়ে কাছে ডাকে সতীনাথ। কী হয়েছে জানতে চায়। রাম কাকা আর নাই। আমাগের বাড়ির দিক আসতি যায়ে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। তারপর...। সতীনাথের কানে আর কিছুই ঢুকে না। নিমেষেই বুকের মধ্যে শূন্যতা নেমে আসে। রাম নেই, একথা বিশ্বাস করবে কেমন করে? নিঃশ্বাস বুকের মধ্যে আটকে যেতে থাকে। ঘন ঘন দম নিতে নিতে বলে, আমারে এট্টু রামের কাচে নিয়ে চল। আমি রামরে দেখপো। ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে ভারী পায়ে বন্ধুর বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। এতদিন রামপদ তার কাছে আসত, আজ তাকে রামপদর কাছে যেতে হচ্ছে। উঠোনে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নারীপুরুষের দল। তার ভেতর থেকে মিশ্র কান্নার রোল আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সতীনাথকে দেখে মড়ার কাছে যাওয়ার পথ ছেড়ে দ্যায় সামনের মানুষগুলো। সতীনাথ দ্যাখে তুলসী তলায় শুয়ে আছে রাম। ঠোঁট দুটো একটু ফাঁকা, চোখ বন্ধ। কতকাল এমন গভীর ঘুম ঘুমায়নি রাম! কী পরম শান্তির ঘুম! পাশের বাড়ির হরা দুটো তুলসীর পাতা এনে রামপদর চোখের পাতাদুটোকে ঢেকে দ্যায়। রামপদর বউ, বউমারা চিত্কার করে বিলাপ করছে। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না সতীনাথ। ভেতরের রুদ্ধ কান্না পাঁজরে ধাক্কা খেয়ে ঝরনায় মতো শব্দ করতে করতে বেরিয়ে আসে। তার ঘোলাটে দুচোখ জলের স্রোতে ঢেকে যায়। মুখ দিয়ে একটানা গোঁ গোঁ শব্দ বের হয়। এক সময় গলা ভেদ করে মুখে কথা আসে, আমারে একা থুয়ে চলে গেলি রাম। আমারে তুই সাতে নিলি নে। ও রাম রে ...। শীর্ণহাতে মৃত বন্ধুর মাথা, মুখ স্পর্শ করে চাপা কান্নায় বুক ভাসায় সতীনাথ। রামপদকে ছেড়ে উঠতে চায় না। সেও রামের সঙ্গে চিতায় যেতে চায়! অসুস্থ বাবা বেশিক্ষণ এই শোকের আবহে থাকলে বড় কোনো সমস্যা হতে পারে। তাই ছোট ছেলে সতীনাথকে বাড়ি নিয়ে আসে। বারান্দায় খুঁটি ধরে দাঁড়ায় সতীনাথ। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয় খুব। মাথাটা ঝিমঝিম করতে থাকে। রামপদর মুখ তার ঘোলাটে চোখের তারায় উঁকি মারে। সে মুখ মৃত রামপদর নয়, ইলিশ মাছ খেতে না পারার অতৃপ্ত রামপদর মুখ। সতীনাথ আলতো করে চোখ দুটো বন্ধ করে। সে জানে এমন কত শত অপূর্ণ বাসনা নিয়ে তাদের মতো মানুষকে শ্মশানে যেতে হয়। ছোট ছেলে গ্লাসের জলে কয়েকটা তুলসী পাতা ভিজিয়ে ‘ওঁ গঙ্গা’ বলে বাবার মাথায় ছোঁয়ায়। তারপর হাত ধরে বিছানায় শুইয়ে দ্যায়। কাথা মুড়ি দিয়ে নীরবে শুয়ে থাকে সতীনাথ। ভেতরে ভেতরে চলে তার রক্তক্ষরণ। ইচ্ছে করে না শুয়ে থাকতে। ইচ্ছে করে দৌড়ে ছুটে যায় রামের কাছে। তারপর তাকে নিয়ে ছোট বেলার মতো লাফ দিয়ে উঠে যায় নারকেল কিংবা বরই গাছে। দুপুর গড়িয়ে এখন বিকেল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই টুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসবে। তারপর প্রকৃতিকে ঢেকে দেবে অন্ধকারের কালো চাদর। কান্নার শব্দ আবার বেড়েছে। মাঝে একটু কমেছিল। শোকেরও ক্লান্তি আছে! সতীনাথ শুয়ে থেকেই শুনতে পায়—বলো হরি, হরি বোল। মৃত রামপদকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সে কোনোদিন আর পুকুর পাড়ে আসবে না, কোনোদিন সতীনাথের সঙ্গে সুখ দুঃখের গল্প করবে না। জীবনের হাজারো টুকরো টুকরো স্মৃতি সতীনাথের কাছে গচ্ছিত রেখে চলে গেল রামপদ। রামকে ছাড়া সতীনাথের চলবে কেমন করে? কাথার নিচে থেকেই রামপদর শেষ যাত্রার বিষাদ সঙ্গীত সতীনাথ শুনতে পায়— একবার হরি হরি বলে... তোমরা আমায় নিয়ে চলো রে...।