কে এই প্রেমে-পড়া পুরুষ? একজন মানুষ, লিপিকার একা; নাকি আমরা সবাই? যারা প্রেমে পড়ি বা পড়েছি? যারা নিজেদের, কোনো এক বিরল মুহূর্তে, জগতের একটি কণা হিসেবে ভাবতে পারি, ভাবতে পারি নিজেকে পুরো একটা পৃথিবী; সূর্যের জগত্, মহাবিশ্ব? যারা আকাশভরা সূর্যতারকার তলে, পেয়েছি প্রাণ; বিস্ময়াবিভূত, বেলুনের ভিতর বাতাসের মতো, হঠাত্ নিজেদের প্রাণ বমি করে দিয়ে, ছিঁড়ে, টুকরো-টুকরো ছড়িয়ে পড়েছি, সময়? প্রেমে-পড়া পুরুষটি কি আসলে এই পৃথিবীই নিজে? নাকি সত্যিই পৃথিবীর অতিথি বা মানুষ, একজন উন্মাদ, যে নিজের প্রাণবিদ্ধ শরীরকে, অনুভব করেছে সম্পূর্ণ পৃথিবী, মহাবিস্ফোরণের মতো মহাবিভ্রমে পড়ে ধারণ করতে চলেছে। এই প্রেমে-পড়া পুরুষ কি আসলে কেউ, নাকি মানুষের স্বপ্নের মতো সুন্দর বিভ্রম? যে-লোক লিঙ্গরহিত, একা, ইউনিক; ক্লীব? যার প্রেমিকার জন্ম অসম্ভব? কিন্তু যার হূদয়ে গান আছে এবং অনিবার্যভাবে আছে প্রেম? সে কি ধবধবে শাদা বা পবিত্র ডিমের ভেতর বাতিল, দুর্গন্ধময় কুসুমের মতো, অপাপবিদ্ধ জগতের অন্তরে টের পেয়েছে বিনষ্ট মানুষের, সময়ের, মাটি ও জীবের—আর কামনা করছে, পৃথিবী তার সমস্ত যন্ত্রণা নিয়ে, ঢুকে পড়ুক তারই একটি কণার ভেতর, লুকিয়ে ফেলুক তার সলজ্জ মুখ ও পরিচয়? এই প্রেম কি এমন, যখন আমরা ‘আমি’ হয়ে নয়, মানুষ হয়ে, ভাবতে পারি বেদনা; বেদনাবিলুপ্ত জীবউদ্ভিদের জন্য নিজের দেহকে করে তোলে আরেকটা বিকল্প বিশ্ব, নিজের প্রাণকে করে তোলে আরও একটা সময়রেখা। নিজের ভেতর ধারণ করি সমস্ত জীবনকাল বা বিশ্বসংসার? আর নিজের শরীরকে করে তোলে পৃথিবীর।
আমরা, কবিতার পাঠক, কোনোভাবে নিজেদের উদ্ধার করতে পারি না, দাঁড় করাতে পারি। কেননা, কবিতাটি পাঠের পর এমন একটি সময়কে, পৃথিবীকে আমরা জেনে উঠি, যার একটি ফোঁটা হিসেবে নিজের দেহে তীব্র রক্তপাত অনুভব করি, অনুভব করি শুধু বেদনার অনর্গল নিঃসরণ। এই নিঃসরণ কি মানুষের অবিরল প্রেমে পড়ার বিরল প্রতিভা? মানুষের হাড়ভাঙা শ্রম, সম্পর্কচ্ছেদ-অনুষ্ঠান; ক্ষোভ-বিক্ষোভ আর মানুষের খুনের জন্য উন্মত্ত মানবিক মন। রকের খিস্তিতে স্মার্ট বখাটে; নিঃসঙ্গ নগরে, নষ্ট-বীর্যের অবকাশ-সুযোগ। এবং ‘রাত্তির বারোটা বেজে গেলে / আমাকে নিষ্কল ফুঁড়ে হঠাত্ চীত্কার উঠে ডুবে যায়। / আমাকে মাড়িয়ে চলে হাজার সিঁড়িতে নামা-ওঠা।’ রাতের ঠিক যৌবনে, আমাদের স্বয়ং সম্পূর্ণতা ফুঁড়ে চিত্কার ভাসে এবং ডুবে যায়। এই চিত্কার কি তবে বাড়ির ভেঙে-পড়া মর্মন্তুদ চিত্কার? দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে-ওঠা মানুষের আর্তনাদ, প্রতিভার হাতে বিস্ফোরিত মানুষের জগদ্সম্ভার? মহিলাশূন্য শহরের বস্ত্রবিতানে মহিলাগন্ধের অট্টহাসি? শ্রমবিধ্বস্থ মানুষের ওপর ভেঙে-পড়া স্থাপনার মতো, শ্রমের ভারি, নিষ্ঠুর উল্লাস? মানুষের হাতে মানুষের প্রাণ ফেটে যাওয়ার মহা-চিত্কার।
কবি সম্পূর্ণতম একটা ধ্বংসকে মোকাবিলা করে এসে, দেখে ফেলেন সেই খোঁড়া ভিখিরি মেয়েটার, প্রেমিক ও পিতাহীন জীবন, বালিশ ও ছাদহীন আয়ু, স্নান ও সাবানবঞ্চিত শরীর, এবং সর্বোপরি অন্যায় একটা সৃষ্টি। কিন্তু সেই শাশ্বত চুল, চিরসত্য কেশদল? যারা মানুষের ক্লীবত্বের অনন্য উপমা, যারা মেয়েটির হূদয়ের অসংখ্য আবেদন, বাতাসের উদ্দামতা, মানবশরীরে সময়ের একমাত্র নিদর্শন? এই চুলে মমতার একটি ফিতার জন্য, কবির মস্তিষ্কে ক্ষরিত হয় রক্ত। ছিঁড়ে যায় তার স্নায়ু, জন্মহীন একজন প্রেমিকার জন্য কবি, নিথর একটা গান হয়ে লিপ্ত হন মৃত্যুর রেখায়! আর নতুন এক মহাপৃথিবীর ভেতর কবির হূদয়ে, সরল আহ্লাদে চুল বাঁধে ভিখিরি খোঁড়া মেয়েটি!
ক্ষমাহীন অন্ধকারে, মৃত/অক্ষম কবির শ্রুতিতে, দেহজীবী মানুষের ভাঙা গলা, শাখ বাজানোর শব্দে ঝংকৃত হয়, আত্মজার কণ্ঠের সংগীত হয়ে বেজে ওঠে, ধিক্কার দিয়ে যায়, কবি, তুমি আরও অন্ধকারে পতিত প্রেমিক পুরুষ তখন? অন্যতায়, কীভাবে অফুরান ক্ষত হবে, হবে বেদনার অপরিসীম নদী?
মানুষের সমস্ত শেষে, তোমাকে বিদ্ধ করতে আসে পশুরাও। পায়ে হেঁটে আসে, আসে বুকে হেঁটে, কুঁকড়ে বসে, বসে শরীরে শরীর লাগিয়ে। আসবেই, কেননা, তুমি বিকল্প বিশ্ব হয়ে ধারণ করতে চেয়েছ সনাতন বিশ্বকে! এমনভাবে আসে, যেন খুঁজে গেছে দাবিদারশূন্য জীবের অধিকার, (পোর্টিকো) দহলিজ। এবং তুমি নিশ্চিত ব্যর্থ হয়েছ, দিতে পারনি তাদের ভূমি, নিরাপত্তা, সঠিক আকাশ। পশুদের নিষপ্রদীপ বুদ্ধির জন্য মৌলিক বাস্তুসংস্থান করতে পারনি, বরং জেনেছ, এখনো মানুষের চাই মাটি। চাই আকাশ-পাতাল-পর্বত ও পাহাড়। কোথাও পশুদের জন্য তারা রাখতে রাজি নয় এক কণা পৃথিবী। তোমার মাংস নিয়ে পাগল কুকুরের মতো টানাটানি করে মানুষ! কীভাবে পশুরা পাবে তাদের বেওয়ারিশ মৌলিক উঠোন? তোমার ক্লান্ত এবং লজ্জিত শরীরে গাড়ি-টানা প্রকাণ্ড মহিষও তার ক্লান্তির গালিচা পেতে তৃপ্ত হয়, তুমি ব্যর্থ পিতার মতো অশ্রুপাত কর তখন, পুত্রের নিষ্পাপ আচরণে? কবির ভেতরে আসে দূরত্ব, উপত্যকা, বন, অরণ্য, মাঠের প্রান্তর, পথ, পথের যান, পথের সহায়ক সেতু। আর এগুলোর সঙ্গে টেলিগ্রাফ-তার, তারে পর্বতের বিরাট বাতাসও ছন্দ তুলে বয়ে যায়। আসবেই তো, না-হলে, কীভাবে মানুষ যাবে মানুষের কাছে, কীভাবে শ্বাসের বাতাস হবে ঠিক? মানুষ দূরে কথা পাঠাবে কীভাবে? বিজ্ঞানের গৌরবহীন (?) পৃথিবী কি মানাবে? কিন্তু এরা সবাই— মানুষ, পশু, মাটি, উদ্ভিদ, বিজ্ঞান।
একজন, কবি-মানুষ, হয়ে ওঠে পৃথিবী অথবা যখন একজনের ভেতর চলে আসে আস্ত জগত্, তখন সে-তো পাবে মাতাল গতি, উন্মত্ত প্রাণের চঞ্চল! এবং তার ভিতর, স্থির থাকবে সমস্ত কুশীলব, থাকবে অটুট এবং নিশ্চিত; তাদের অনিশ্চয়তা, ধ্বসে যাওয়া, অস্থিরতার অর্থ (গ্রহের ওপর গ্রহের পতন, ধ্বংসলীলা! পৃথিবীর চিরজীবন, প্রাণ-উদ্ভিদের চলমান জগত্যাপন, জলবাতাসের প্রবাহ, অগ্নির লাল, বসন্তের জন্ম ইত্যাদি মৃত্যুহীনভাবে ধরে রাখার জন্য, মানুষের হূদবেদনার অফুরান মঞ্চায়নের জন্য, পৃথিবীকে হতে হয় গতিময়; আর গতির মানেই হচ্ছে জন্ম ও বিলীন, নবজন্মকে গ্রহণ আর সনাতনকে বিলীন করার মধুর দুঃখের জন্য, পৃথিবীকে হতে হয় অবিরল স্রাবময় একটি ক্ষত,(এই ক্ষত দিয়ে নিঃসরণ হয় ছোট ছোট মৃত্যু, দিনযাপনের তীব্র অথচ কণা কণা যন্ত্রণা, মহিলার গন্ধে ভরা বস্ত্রালায়, বেশ্যার ভাঙা গলা, ভিখিরি মেয়ের খোলা চুলের স্বাস্থ্যহীনতা। আর গতিশীল থাকেন তিনি— বিশ্ব। এই অনন্ত চলমানতাই তার প্রেমে পড়ার চিহ্ন। বিশ্বজনীন মৃত্যু মানেই গতিহীনতা, স্থির ও অপ্রাণীবাচক বিশ্ব, সময়ের থেমে যাওয়া, শেষ হয়ে যাওয়া। শেষ হতে পারে না জীবনের উত্সব, উত্সভূমি। কিন্তু কবি কেন অচিকিত্স্য সংক্রমণে রক্তিম, হা-খোলা, অফুরান? তবে কি ছোট ছোট মৃত্যু ও যন্ত্রণা এখন ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজনীন মৃত্যুরই মতো? কেননা, আমরা দেখেছি, কবির ভেতর যে-পৃথিবী ঢুকে পড়ে, তাতে কোনো ফুলের জন্ম নেই, নেই পাখির গান-গাওয়া।
বুদ্ধদেব বসুর এই আশ্চর্য, নির্লিপ্ত কবিতার সৃষ্টি আর কবিতার ভিতরের বেদনা, আমাদের এরকম এক পৃথিবীর দিকে চোখ ফেরাতে বলে, যেখানে কোনো প্রাণ নেই, প্রাণের ধারণা আছে, যেখানে কোনো সুস্থতা নেই, সুস্থতার কাঙাল আছে। সুস্থতার জন্য কাঙালপনাই তবে প্রেম? আমরা, বহুদিন ধরে যারা ভুলে গেছি কীভাবে পড়তে হয় প্রেমে, তারা কবির হূদয়ের অভিব্যক্তিকে স্পর্শ করি, স্পর্শ করি আপনার বিশুদ্ধ কষ্টের ক্ষত; আর চিকিত্সার জন্য কাঙ্ক্ষিত হই, কেননা, আমরা তো জেনেছি, আমাদের অসুখ!
